জামায়াতে
ইসলামীর নায়েবে আমির মুহাম্মদ আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী
অপরাধের মামলায় আজ বুধবার জবানবন্দি দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্থ সাক্ষী
রুস্তম আলী (৬৫)। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, একাত্তরের সুবহান তাঁকে হাতে
থাকা পিস্তল দিয়ে দুটি গুলি করেন। একটি তাঁর বুকে ও অপরটি বাম হাতে লাগে।
বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ
ট্রাইব্যুনাল-২-এ রুস্তম আলীর জবানবন্দি নেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি রেজিয়া
সুলতানা। এ সময় আসামির কাঠগড়ায় সুবহান হাজির ছিলেন। জবানবন্দিতে রুস্তম আলী
বলেন, তাঁর বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদীর পাকশী যুক্তিতলা গ্রামে। একাত্তরে তাঁর
বয়স ছিল ২৪ বা ২৫ বছর। তিনি পাকশী বাজারে জয়নউদ্দিনের দোকানে কাজ করতেন।

তিনি
জয়নউদ্দিন ও তাঁর জামাইকে নিয়ে ১৩ এপ্রিল সকালে সারাঘাটে গেলে যুক্তিতলা
গ্রামে আগুনের শিখা দেখেন ও গুলির শব্দ শোনেন। এ সময় তাঁরা প্রাণভয়ে
যুক্তিতলা গ্রামের মইজউদ্দিনের বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়ে লুকান। তখন সুবহান
তাঁদের দেখে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে তাঁদের আটক করে যুক্তিতলা
গ্রামের জামে মসজিদের সামনে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তিনি একটি গাড়ির ওপর
ইসরাইল, ইসরাইলের মা ও চাচাকে দেখেন। পরে পাকিস্তানি সেনাদের একটি গাড়িতে
করে তাঁদের যুক্তিতলা স্কুলের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সুবহানও ওই গাড়িতে
ছিলেন। গাড়ি থেকে তাঁদের নামানোর পর তিনি দেখেন, পাকিস্তানি সেনা ও
বিহারিরা আরও কয়েকজনকে সেখানে নিয়ে এসেছে। তাঁদের মধ্যে তিনি হারেস উদ্দিন ও
ইসমাইলকে চিনতে পারেন। রাষ্ট্রপক্ষের এ সাক্ষী বলেন, একপর্যায়ে তাঁদের
সবাইকে স্কুলের সামনে লাইন ধরে দাঁড় করানো হয়। এ সময় সুবহান জয়নউদ্দিনের
জামাইয়ের হাতে থাকা একটি রেডিও কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেন। লাইনে দাঁড়ানো
অবস্থায় হারিস উদ্দিন ও ইসমাইল দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে সুবহান তাঁর হাতে
থাকা পিস্তল দিয়ে তাঁদের গুলি করেন। গুলিতে ইসমাইল ঘটনাস্থলেই নিহত হন ও
হারিস গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দৌড়ে একটি সাঁকোর কাছে পড়ে যান। এ অবস্থায়
সুবহানের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনা ও বিহারিরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।
জবানবন্দিতে রুস্তম আলী বলেন, এই ঘটনার পর তাঁদের আবার লাইন ধরে দাঁড় করানো
হয়। একপর্যায়ে সুবহান তাঁর হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে তাঁকে দুইবার গুলি করেন।
একটি গুলি তাঁর বাম হাতে ও অপরটি বুকে বিদ্ধ হয়। এতে তাঁর বুকের তিনটি হাড়
ভেঙে যায়। এ সময় সুবহানের নির্দেশে সেনারা বাম চোয়ালে আঘাত করলে তিনি
মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারান। জবানবন্দির এ পর্যায়ে সাক্ষী কান্নাজড়িত
কণ্ঠে ট্রাইব্যুনালকে ক্ষতচিহ্ন দেখান। রুস্তম আলী জানান, পরে বিকেল
চারটা-সাড়ে চারটার দিকে তাঁর জ্ঞান ফেরে। এ সময় তাঁদের গ্রামের কোরবান আলী ও
তাঁর সঙ্গের লোকজন তাঁকে, ইসরাইল এবং তাঁর মা টুলুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায়
রূপপুরের চিকিত্সক তরিকুলের কাছে নিয়ে আসেন। কোরবান তাঁকে জানান, জয়নউদ্দিন
ও তাঁর জামাইসহ ওখানে যাঁরা ছিলেন সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। চিকিত্সা
নেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হলে তিনি জয়নউদ্দিনের ভাইয়ের বাড়িতে থাকতে শুরু
করেন। আবার অসুস্থ হলে তাঁর ভাতিজা হালিম তাঁকে কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে
ভারতের বরাতপুরে নিয়ে যান। তিন মাস চিকিত্সা শেষে দেশে ফেরেন। যুক্তি
উপস্থাপন শেষে এ মামলার কার্যক্রম সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করেন
ট্রাইব্যুনাল।
No comments:
Post a Comment