Sunday, May 18, 2014

বিশ্বকাপের দলগুলো "ছোঁ মারতে প্রস্তুত সুপার ইগল"

১৯৯৪ সাল। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ‘সুপার ইগল’ নাইজেরিয়া। শুরুটা হলো দুর্দান্ত। বুলগেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে উড়ন্ত সূচনা। পরের ম্যাচে আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তির সঙ্গে জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দলটি হেরে গেল ২-১ ব্যবধানে। বাঁচা-মরার লড়াইয়ে গ্রিসকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে আসা দলটি উঠে গেল দ্বিতীয় রাউন্ডে, তাও কিনা গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবে! চমকটা দীর্ঘায়িত করার পথ থেকে মাত্র এক মিনিট দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিল দলটি। দ্বিতীয় রাউন্ডের বৈতরণীও পার করে ফেলেছিল প্রায়।
কিন্তু প্রতিপক্ষের আনন্দ ভন্ডুল করার জন্য ইতালির যে জুড়ি নেই! ম্যাচের ৮৯ মিনিটে রবার্তো ব্যাজ্জিও গোল শোধ করে ম্যাচটি নিয়ে যান অতিরিক্ত সময়ে। আর কুলিয়ে উঠতে পারেনি নবিস নাইজেরিয়া। হেরে যায় প্রতাপশালী ইতালির কাছে। হেরেও জয় হলো সুপার ইগলদের। জয় হলো ফুটবলপ্রেমীদের মনে। সেই প্রথমবারের মতো ফুটবল-বিশ্ব দেখল এক দুর্দমনীয় দলের আবির্ভাব, যারা ফুটবল মাঠে নিংড়ে দেয় নিজেদের সবটুকু।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল তাদের সেই দাপুটে ঐতিহ্য। বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে দলটি ২০১২ সালের আফ্রিকান নেশনস কাপে অংশই নিতে পারেনি। অবশেষে সাফল্যের ধারায় ফিরেছে নাইজেরিয়া। ২০১৩ আফ্রিকান নেশনস কাপে জিতেছে শিরোপা। বিশ্বকাপকে তাই নাইজেরিয়া বানাতে চাইছে হারানো সুদিন ফিরিয়ে আনার মঞ্চ।

নিঃসন্দেহে দলের সবচেয়ে বড় তারকা ওবি মিকেল। ২৭ বছর বয়সী এই তারকা মিডফিল্ডার চেলসির হয়ে কার্যকরী সব পাস, দুর্দান্ত সব ক্রসে প্রতিপক্ষের সীমানায় ত্রাস ছড়িয়েছেন প্রতিনিয়ত। এই মৌসুমে বেশির ভাগ সময় সাইড লাইনে বসে কাটালেও বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে তাঁর অভিজ্ঞতাই হবে নাইজেরিয়ার সাফল্যের মূল শর্ত। চোখ রাখতে হবে ইমানুয়েল এমেনিকের ওপরও। তুরস্কের ক্লাব ফেনেরবাচের হয়ে খেলা এই ফরোয়ার্ড এ মৌসুমে ইনজুরির জন্য অনেকটা সময়ই খেলতে পারেননি। তবে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ৩ ম্যাচে ৩ গোল করে ইমানুয়েল জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি প্রস্তুত।

নাইজেরিয়ার হয়ে বছরের পর বছর ধরে গোলবার সামলে যাচ্ছেন ফ্রেঞ্চ ক্লাব লিলের হয়ে খেলা ভিনসেন্ট এনইয়ামা। এ মৌসুমে লিলের হয়ে গোলশূন্য থেকেছেন ১০৬২ মিনিট, অল্পের জন্য গড়তে পারেননি সবচেয়ে বেশি সময় গোলবার আগলে রাখার ফরাসি রেকর্ড! প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের শক্ত পরীক্ষাই নেবেন এই পরীক্ষিত সৈনিক। চোখ থাকবে আগ্রাসী মিডফিল্ডার ভিক্টর মোসেসের ওপরও। চেলসির এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার এই মৌসুমে ধারে খেলেছেন লিভারপুলের হয়ে, যদিও মূল একাদশে খুব কমই সুযোগ পেয়েছেন নিজেকে প্রমাণের জন্য। তবে নাইজেরিয়ার হয়ে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন এই তারকা। বড় মঞ্চে ঝলসে উঠতে পারেন সিএসকে মস্কোর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার আহমেদ মুসা।

নাইজেরিয়া দলটির কোচ স্টিফেন কেশি। সাবেক এই অধিনায়কের আছে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে আফ্রিকান নেশনস কাপ জেতার অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে কোচ হিসেবে এবারই প্রথম পা রাখছেন। দলটিকে সন্তানের মতোই আগলে রেখেছেন শত ঝড়-ঝাপটায়। নাইজেরিয়াকে নেশনস কাপ জেতানোর পরপরই পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে সেটা প্রত্যাহার করে নিলেও এক সাক্ষাত্কারে স্বাধীনভাবে কাজ না করতে পারা নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন কেশি। ২০১০ বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের পর সব ধরনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে নাইজেরিয়ার অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন দেশটির তখনকার প্রেসিডেন্ট। সে সময় ফিফাকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল নাইজেরিয়ার ফুটবলে। সব সময় কোচকে ত্যক্তবিরক্ত হয়েই থাকতে হয় সব ব্যাপারে সরকার বা ফুটবল ফেডারেশনের হস্তক্ষেপের কারণে। 
বিশ্বকাপ ইতিহাস: ১৯৯৪ এর বিশ্বকাপ সাফল্যের পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও দলটি ধরে রাখে সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা। রাঘব বোয়াল স্পেনকে হারিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা অঘটনের জন্ম দেয় নাইজেরিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলেও ডেনমার্কের সঙ্গে হেরে বিদায় নেয় নাইজেরিয়া। এরপর অবশ্য ২০০২ ও ২০১০ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে খালি হাতেই ফিরতে হয় দলটিকে। তবে এবার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের মিশনেই বিশ্বকাপে যাচ্ছে দলটি। ১৬ জুন ইরানের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে নাইজেরিয়ার বিশ্বকাপ পর্ব। গ্রুপে অন্য দুই প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনা।

শক্তি: চিত্তাকর্ষক ফুটবল। আগ্রাসী মনোভাব। উপভোগের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত এই দলটির রয়েছে শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা। সর্বশেষ আফ্রিকার নেশনস কাপে জয়ে দলের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে থাকবে।

দুর্বলতা: ফুটবল মাঠে পারফরম্যান্সের চেয়ে অফুটবলীয় ইস্যুতেই যেন বেশি সরগরম নাইজেরিয়ান ফুটবল। এই তো কিছুদিন আগে বেতন-বোনাসের দাবিতে ধর্মঘট ডেকে চারদিকে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন নাইজেরিয়ার ফুটবলাররা। ফেডারেশনের সঙ্গে সব সময়ই সাংঘর্ষিক অবস্থানে থাকায় বিশ্বকাপের আগের প্রস্তুতিটা ঠিকমতো হয়নি বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট সবাই। এসবের প্রভাব বিশ্বকাপে পড়লে তা দলের জন্য ক্ষতিই বয়ে আনবে। বরাবরের মতো রক্ষণ ভাগের দুর্বলতাই নাইজেরিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক।

নাইজেরিয়া শব্দটি শুনলেই পাঠকের মানসপটে ভেসে আসে তেল, দুর্নীতি, জলদস্যু, সামরিক অভ্যুত্থান আর সীমাহীন দারিদ্র্যের কথা। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটির মানুষ প্রচণ্ড রকম উদ্যমী এবং আত্মবিশ্বাসী। নাইজেরিয়া দলটি যদি সেই উদ্যম ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে ব্রাজিল পৌঁছাতে পারে, তবে কোনো চমক যে ঘটবে না সেই নিশ্চয়তা কে দিতে পারে!

No comments:

Post a Comment