নূর হোসেন চেয়ারম্যানের কব্জায় রয়েছে এক ডজন অস্ত্র। এসব অস্ত্র নানা
তুচ্ছ ঘটনায় ব্যবহার হয়েছে। প্রভাব-প্রতিপত্তি আর তার দুর্দান্ত প্রতাপ
তাকে খ্যাতি এনে দেয় সন্ত্রাসের গডফাদার হিসাবে। সামান্য ট্রাক হেলপার থেকে
আজ কোটিপতি নূর। চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে সন্ত্রাসের সব পথেই পা মাড়িয়েছেন
তিনি। তার এসব কাজে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন নারায়ণগঞ্জের ডিসি-এসপি। তারা
নূরকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজেরা হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এক কথায় সাবেক
জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়াল ও পুলিশ সুপার নুরুল ইসলামের টাকার মেশিন
ছিল আলোচিত নুর হোসেন।

যাত্রা,
মাদক, জুয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যবসার মাসিক মাসোহারা পেতেন স্থানীয়
প্রশাসনের এই দুই কর্তাব্যক্তি। নুর হোসেনের বেশ কয়েকটি ব্যবসার গোপন
পার্টনারও ছিলেন তারা। এ সবের বিনিময়ে সরাসরি প্রশাসনিক সহায়তা পেতেন নুর
হোসেন। প্রশাসনের অন্যান্য স্তরের কর্মকর্তাদের স্যার সম্বোধন করলেও
ডিসি-এসপিকে ভাই বলে ডাকতেন কয়েকবার দল বদল করা পলাতক এই নেতা। নুর হোসেন ও
তার সহযোগীদের এক ডজন অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। ২ বছর ৪ মাস ক্ষমতায় থাকার
সময়ে ৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছেন সাবেক জেলা প্রশাসক। নিয়ম অনুযায়ী
শটগানের লাইসেন্স দেয়ার এখতিয়ার রয়েছে ডিসির। তবে পিস্তলের লাইসেন্স পেতে
হলে ডিসির অনুমোদন লাগে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নুর
হোসেন সে অনুমোদনও পেয়েছেন এই ডিসির কাছ থেকে। এ সবের বিনিময়ে উৎকোচ
হিসেবে পেয়েছেন প্রায় কোটি টাকা। স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা
মানবজমিনকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, মাত্র দুই বছরে প্রায় শত কোটি টাকার
মালিক হয়েছেন সাবেক ওই ডিসি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে
অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। তাই সহজেই প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা ও তার কার্যালয়ের নাম ভাঙাতেন। অপহরণ ঘটনার পর গত বুধবার জেলা
প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়ালকে প্রত্যাহার করা হয়। তাকে দেয়া হয় নৌপরিবহন
মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদ। একই দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোর কমিটির
বৈঠকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার, র্যাব ১১-এর সিও এবং ফতুল্লা থানার
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৫ জনকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয়
প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ ট্রাক স্ট্যান্ডে সারা বছর
যাত্রা, জুয়া পরিচালনা করতেন নুর হোসেন। এ থেকে প্রতিদিন দুই লাখ টাকা দিতে
হতো ডিসিকে। সকাল ১০টার মধ্যে ডিসির বাসা অথবা অফিসে এ টাকা লোক মারফত
পৌঁছে দিতেন নুর হোসেন। এ হিসেবে মাদক ব্যবসার জন্য আলাদা একটি অঙ্ক নিয়মিত
পেতেন মনোজ কান্তি বড়াল। তিনি বলেন, রাজস্ব প্রশাসন ছিল ডিসির আয়ের আরেকটি
আয়ের সোর্স। এখানকার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়মিত বদলির মাধ্যমে হাতিয়ে
নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। আড়াই বছরে প্রায় ২শ’ কর্মচারীকে বদলি করেছেন
তিনি। এ খাত থেকে তার আয় হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানান, নুর
হোসেন ছিলেন রাজনৈতিক নেতা। আর জেলা প্রশাসক ছিলেন জেলার অভিভাবক। মূলত
ডিসির প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও আশকারায় নুর হোসেন ছিলেন বেপরোয়া। তার কাছ থেকে
ডিসি মাসোহারা নিলেও এর কোন প্রমাণ রাখেননি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা
বলেন, গোপনে বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন মনোজ কান্তি
বড়াল। নুর হোসেন এসব ব্যবসায় সরাসরি সহযোগিতা করতেন। ডিসি বড়াল উত্তরা ৩য়
পর্যায়ের প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোটায় একটি তিন কাঠা আয়তনের
প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন। ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তিনি প্লটটি ৫ কাঠায় রূপান্তর
করেন। এদিকে শনিবার নারায়ণগঞ্জ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন আলোচিত ওই
ডিসি। রেওয়াজ অনুযায়ী বিদায়বেলায় স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগ থেকে
গিফট দেয়া হয়। সে প্রস্তুতি নেয়াও হয়েছিল। তবে সাবেক ওই ডিসি ব্যক্তিগত
সহকারীর মাধ্যমে কোন ধরনের গিফট না দেয়ার অনুরোধ জানান। গিফটের পরিবর্তে
তিনি মোটা খামের টাকা দাবি করেন। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন,
ডিসির এ অনুরোধের কারণে জেলার ৫ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ২০ হাজার করে এক
লাখ টাকা দেন। অপরদিকে ভূমি অফিস থেকে ৩০ হাজার করে দেড় লাখ টাকা দেন। এসব
প্রসঙ্গে মনোজ কান্তি বড়াল গতকাল টেলিফোনে মানবজমিনকে বলেন, নুর হোসেন
ছিলেন নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর। সব কাউন্সিলরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল, আছে
থাকবে। ঠিক আছে, ভাল থাকবেন। একথা বলেই তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন। প্রায়
একই অভিযোগ রয়েছে জেলার সাবেক পুলিশ সুপার নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। জেলা
প্রশাসকের পাশাপাশি তিনিও নুর হোসেনের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেতেন।
বিনিময়ে প্রশাসনিক সহায়তা দেয়া হতো তাকে। প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা বলেন,
পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রায় সব শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছ
থেকে চাঁদা তুলেছেন। এ খাতে তিনি আয় করেছেন প্রায় কোটি টাকা।
নূরের ক্বজায় এক ডজন অস্ত্র
সামান্য ট্রাক হেলপার থেকে চালক হয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীকালে ইউপি চেয়ারম্যান থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর। জাতীয় পার্টি ও বিএনপি করে একযুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি। কর্মময় আর রাজনৈতিক জীবন বাদ দিলে বর্তমানে তার পরিচয় ভয়ঙ্কর প্রভাশালী ‘এক কর্তা’ হিসেবে। পূর্বাঞ্চলের ৩৪টি জেলার যানবাহন রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো শিমরাইল মোড়। এজন্য তার গুরুত্বও অনেক। রয়েছে বিশাল এক বাহিনী। যাদের কাছে লাইসেন্স করা অস্ত্রই আছে ১১টি। যেদিকে যান অস্ত্রধারী ওই বাহিনী তাকে আগে পিছে গার্ড দেয়। গাড়ি-বাড়ি অর্থবিত্তে ফুলে ফেঁফে ওঠা নুর হোসেন নিয়মিত মাসোহারা দিতেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের। বাদ যেতেন না রাজনৈতিক নেতারাও। সুবিধাভোগী ওই রাজনৈতিক নেতাদের শেল্টার ও আর্শীবাদ নূর হোসেনকে বেপোয়ারা করে তুলেছে। ফলে গত দুই বছর কাউকেই পরোয়া করেননি শিমরাইল মোড়ের ‘কর্তা’ হোসেন চেয়ারম্যান। র্যাব সদস্য, ট্রাফিক পুলিশ, ইন্ড্রাস্ট্র্রিয়াল পুলিশ পর্যন্ত তার বাহিনীর হাতে পিটুনি খেয়েছেন। বাদ যায়নি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাকর্মী। ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২২টি। এরমধ্যে একটি হত্যা মামলাও আছে।
অস্ত্রের লাইসেন্স যাদের নামে
হাজী নূর হোসেনের নিজের নামে দুটি অস্ত্র একটি বাইশ বোর রাইফেল ও একটি এনপিবি পিস্তল রয়েছে (২২ বোর রাইফেল, লাইসেন্স নং ১২২/১২, এনপিবি পিস্তল, লাইসেন্স নং ২৮৫/১৩-তারিখ-৫ই মার্চ ২০১৩)। ভাতিজা শাহজালাল বাদল (৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর) এর নামে একটি শর্টগান ও একটি এনপিবি পিস্তল (শটগান নং-৬০৩২৫৫৯/৩০৩৬২৫২, এনপিবি পিস্তল, লাইসেন্স নম্বর ৩০০/১৩)। ছোট ভাই নূরুদ্দিন মিয়ার (লাইসেন্স নম্বর ৫২৮/১৩) নামে একটি শর্টগান, বডিগার্ড শাহাজান (লাইসেন্স নম্বর ৫১৭/১৩-তারিখ ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৩), আলী মোহাম্মদ (লাইসেন্স নম্বর ৫৩২/১৩), ছানা উল্লা (লাইসেন্স নম্বর ৫৩৩/), জামাল উদ্দিনের (লাইসেন্স নম্বর ৫১৮/১৩-৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০১৩) নামে একটি করে ৪টি শর্টগান আছে। এছাড়া শিমরাইল পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আরিফুল হক হাসানের নামে রয়েছে একটি শর্টগান ও একটি পিস্তল (লাইসেন্স নম্বর ১৬৬/১৩ (তারিখ ২৬শে নভেম্বর ২০১৩), ৫১১/১৩ (তারিখ ২৭শে নভেম্বর ২০১৩)।
কে এই নূর
সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল টেশপাড়া এলাকার হাজী বদর উদ্দিনের ৬ ছেলের মধ্যে নূর হোসেন তৃতীয়। ৮০ দশকে সিদ্ধিরগঞ্জের ইকবাল গ্রুপের ট্রাকের হেলপার পরে চালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন নূর হোসেন। দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাক চালাতে গিয়ে ট্রাক শ্রমিকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ’৮৭ সালের দিকে বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাক চালক শ্রমিক ইউনিয়ন শিমরাইল শাখার কার্যক্রম শুরু করে দাইমুদ্দিন নামে এক ট্রাক চালক। পরবর্তীতে দাইমুদ্দিনকে সরিয়ে শিমরাইল ট্রাক চালক শ্রমিক ইউনিয়নের দায়িত্ব নেয় নূর হোসেন। ওই সময় সে জাতীয় পার্টির রাজনীতি শুরু করে। ১৯৯২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শহীদুল ইসলাম কন্ট্রাক্টর (প্যানেল মেয়র নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর) এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নূর হোসেন। নির্বাচনে নূর হোসেন বিজীয় হন। ১৯৯৮ সালের ১০ই জুন বিরোধী দলীয় নেত্রীর লংমার্চ কাঁচপুরে আটকে দেয়ার পেছনে শামীম ওসমানের নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নুর হোসেন। রাতের বেলা ট্রাক বাস এলোপাথাড়িভাবে সড়কের ওপর ফেলে রেখে চাকা পাংচার করে দেয়া হয়। একই বছর তথা ৯৮-এর বন্যায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সিদ্ধিরগঞ্জের কাঁচপুরে অস্থায়ী লঞ্চঘাট করা হয়। ওই ঘাটে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে নূর হোসেন বাহিনী।
শিমরাইল ট্রাক চালক মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নূর হোসেনের দোদ- প্রতাপে পরিবহন মালিকরা ভীত হয়ে উঠেন। শুরু হয় পরিবহন সেক্টরে নিয়মিত চাঁদাবাজি। এবং পরিবহন সেক্টরে নূর হোসেন চেয়ারম্যান তার একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেন। অনেককে চাঁদা লাগলেও নূর হোসেন কোন প্রকার চাঁদা ছাড়াই সায়েদাবাদ থেকে একাধিক রুটে তার দূরপাল্লার বাস সার্ভিস চালু করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর দেশ ছেড়ে পালান হোসেন চেয়ারম্যান ও তার বাহিনী। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে আসেন নুর হোসেন। বাহিনী সুসংগঠিত করে গোপনে সোনারগাঁও থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালামের মাধ্যমে ওই সময়ের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি কায়সার হাসনাতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন নূর হোসেন। বিনিময়ে নূর হোসেন তার অবৈধ আয়ের উৎস প্রসারিত করেন। এমপির সরাসরি শেল্টার থাকায় স্থানীয় প্রশাসন নূর হোসেনকে কিছু বলত না। বরং সিদ্ধিরগঞ্জ থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীর তালিকা থেকে নূর হোসেন তার নাম বাদ করিয়ে নিয়েছেন।
২০১০ সালে একটি হরতালে বাধা দিতে গেলে ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই) এর নেতাকর্মীরা শিমরাইল ট্রাক স্ট্যান্ডে হামলা চালায়। নূর হোসেন হামলার শিকার হন। ভাঙচুর করা হয় তার কার্যালয়। এ ঘটনায় শিমরাইল ট্রাক স্ট্যান্ডে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন নূর হোসেন। বর্তমান নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানসহ একাধিক মন্ত্রী ওই প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে নূর হোসেনের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানান। এ ঘটনার স্থানীয় প্রশাসনের নেক নজরে আসেন নূর হোসেন। দলীয় কোন পদপদবি না থাকলেও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা টাকার জন্য বসে থাকতেন নূর হোসেনের কাছে।
২০১১ সালের ৩০শে অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে কয়েক গুণ শক্তিশালী হয়ে উঠেন নূর হোসেন। তার ক্ষমতার পরিধি বেড়ে যায়। দুই হাতে টাকা উপার্জন করেন নূর হোসেন। নাসিকের ১নং প্যানেল মেয়র পদের জন্য কোটি টাকা খরচ করেন নূর হোসেন। যদিও এক ভোটে হেরে যান তিনি। কিন্তু তার প্রভাব এক ইঞ্চিও কমেনি। বরং বেড়েছে। ধীরে ধীরে তিনি পুরো শিমরাইল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। ফুটপাট থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টরে তার বাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। শিমরাইল ট্রাক টার্মিনালে চালু করা যাত্রার নামে নগ্ন নৃত্য, হাউজি, জুয়া, নিরাপদে মাদক বিক্রি ও সেবনের নিরাপদ আখড়া। প্রকাশ্যে কাউন্টার বসিয়ে ফেনডিল ও ইয়াবা বিক্রি করা হতো। প্রতিদিন মাদক বিক্রি ও জুয়া, হাউজি থেকে তার আয় ছিল প্রায় ১০ লাখ টাকা। এই টাকার ভাগ পেতেন জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তারা। গত বছর আড়াই হাজারে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় লোক সমাগম ঘটনোর জন্য ওই এলাকার এমপি নূর হোসেনের দারস্থ হন। শোনা যায়, ওই এমপিকে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়ার পাশাপাশি নূর হোসেন কয়েক হাজার লোক সাপ্লাই দেন। বিনিময়ে নূর হোসেন প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে নূর হোসেনকে দেখার পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চাউর হয় নূর হোসেনের ক্ষমতা নিয়ে। ফলে উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনও কখনও নুর হোসেনের বিরুদ্ধে কথা বলেনি।
নূর হোসেন সর্বশেষ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন। এখন তিনি বিশাল আওয়ামী লীগ নেতা। থানার শীর্ষ নেতারা তার পিছনে ঘুরেন। শুধু টাকার জন্য। ফলে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে তারা কখনো প্রতিবাদ করেননি। নূরের বাহিনীতে শাহাজাহান ওরফে কালা শাহাজাহান ওরফে বরিশাইল্লা শাজান, আলী মোহাম্মদ, ছানা উল্লাহ ছানা, তারছিল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল, সালাউদ্দিন, জামাল উদ্দিন, আজাহার, নাছির ওরফে কালা নাছির, আক্কেল আলী, আসাবউদ্দিন, সালাউদ্দিন ওরফে লাদেন, সেলিম, আমান প্রমুখ ক্যাডাররা রয়েছে। এরমধ্যে শাহাজাহান ওরফে কালা শাহাজাহান ওরফে বরিশাইল্লা শাজান, আলী মোহাম্মদ, ছানা উল্লাহ ছানা, তারছিল, জামাল উদ্দিন নূর হোসেনের বডিগার্ড হিসেবে কাজ করে। তাদের নেতৃত্বে রয়েছে ২ শতাধিক ছোট বড় সন্ত্রাসী। নূর হোসেনের ৭-৮টি গাড়ি দিয়ে এই ক্যাডার বাহিনী চলাচল করতো। এবং নুর হোসেন যেখানে যেতো তারা সার্বক্ষণিক তার সঙ্গে থাকতো।
নূরের ক্বজায় এক ডজন অস্ত্র
সামান্য ট্রাক হেলপার থেকে চালক হয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীকালে ইউপি চেয়ারম্যান থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর। জাতীয় পার্টি ও বিএনপি করে একযুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি। কর্মময় আর রাজনৈতিক জীবন বাদ দিলে বর্তমানে তার পরিচয় ভয়ঙ্কর প্রভাশালী ‘এক কর্তা’ হিসেবে। পূর্বাঞ্চলের ৩৪টি জেলার যানবাহন রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো শিমরাইল মোড়। এজন্য তার গুরুত্বও অনেক। রয়েছে বিশাল এক বাহিনী। যাদের কাছে লাইসেন্স করা অস্ত্রই আছে ১১টি। যেদিকে যান অস্ত্রধারী ওই বাহিনী তাকে আগে পিছে গার্ড দেয়। গাড়ি-বাড়ি অর্থবিত্তে ফুলে ফেঁফে ওঠা নুর হোসেন নিয়মিত মাসোহারা দিতেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের। বাদ যেতেন না রাজনৈতিক নেতারাও। সুবিধাভোগী ওই রাজনৈতিক নেতাদের শেল্টার ও আর্শীবাদ নূর হোসেনকে বেপোয়ারা করে তুলেছে। ফলে গত দুই বছর কাউকেই পরোয়া করেননি শিমরাইল মোড়ের ‘কর্তা’ হোসেন চেয়ারম্যান। র্যাব সদস্য, ট্রাফিক পুলিশ, ইন্ড্রাস্ট্র্রিয়াল পুলিশ পর্যন্ত তার বাহিনীর হাতে পিটুনি খেয়েছেন। বাদ যায়নি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাকর্মী। ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২২টি। এরমধ্যে একটি হত্যা মামলাও আছে।
অস্ত্রের লাইসেন্স যাদের নামে
হাজী নূর হোসেনের নিজের নামে দুটি অস্ত্র একটি বাইশ বোর রাইফেল ও একটি এনপিবি পিস্তল রয়েছে (২২ বোর রাইফেল, লাইসেন্স নং ১২২/১২, এনপিবি পিস্তল, লাইসেন্স নং ২৮৫/১৩-তারিখ-৫ই মার্চ ২০১৩)। ভাতিজা শাহজালাল বাদল (৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর) এর নামে একটি শর্টগান ও একটি এনপিবি পিস্তল (শটগান নং-৬০৩২৫৫৯/৩০৩৬২৫২, এনপিবি পিস্তল, লাইসেন্স নম্বর ৩০০/১৩)। ছোট ভাই নূরুদ্দিন মিয়ার (লাইসেন্স নম্বর ৫২৮/১৩) নামে একটি শর্টগান, বডিগার্ড শাহাজান (লাইসেন্স নম্বর ৫১৭/১৩-তারিখ ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৩), আলী মোহাম্মদ (লাইসেন্স নম্বর ৫৩২/১৩), ছানা উল্লা (লাইসেন্স নম্বর ৫৩৩/), জামাল উদ্দিনের (লাইসেন্স নম্বর ৫১৮/১৩-৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০১৩) নামে একটি করে ৪টি শর্টগান আছে। এছাড়া শিমরাইল পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আরিফুল হক হাসানের নামে রয়েছে একটি শর্টগান ও একটি পিস্তল (লাইসেন্স নম্বর ১৬৬/১৩ (তারিখ ২৬শে নভেম্বর ২০১৩), ৫১১/১৩ (তারিখ ২৭শে নভেম্বর ২০১৩)।
কে এই নূর
সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল টেশপাড়া এলাকার হাজী বদর উদ্দিনের ৬ ছেলের মধ্যে নূর হোসেন তৃতীয়। ৮০ দশকে সিদ্ধিরগঞ্জের ইকবাল গ্রুপের ট্রাকের হেলপার পরে চালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন নূর হোসেন। দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাক চালাতে গিয়ে ট্রাক শ্রমিকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ’৮৭ সালের দিকে বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাক চালক শ্রমিক ইউনিয়ন শিমরাইল শাখার কার্যক্রম শুরু করে দাইমুদ্দিন নামে এক ট্রাক চালক। পরবর্তীতে দাইমুদ্দিনকে সরিয়ে শিমরাইল ট্রাক চালক শ্রমিক ইউনিয়নের দায়িত্ব নেয় নূর হোসেন। ওই সময় সে জাতীয় পার্টির রাজনীতি শুরু করে। ১৯৯২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শহীদুল ইসলাম কন্ট্রাক্টর (প্যানেল মেয়র নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর) এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নূর হোসেন। নির্বাচনে নূর হোসেন বিজীয় হন। ১৯৯৮ সালের ১০ই জুন বিরোধী দলীয় নেত্রীর লংমার্চ কাঁচপুরে আটকে দেয়ার পেছনে শামীম ওসমানের নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নুর হোসেন। রাতের বেলা ট্রাক বাস এলোপাথাড়িভাবে সড়কের ওপর ফেলে রেখে চাকা পাংচার করে দেয়া হয়। একই বছর তথা ৯৮-এর বন্যায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সিদ্ধিরগঞ্জের কাঁচপুরে অস্থায়ী লঞ্চঘাট করা হয়। ওই ঘাটে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে নূর হোসেন বাহিনী।
শিমরাইল ট্রাক চালক মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নূর হোসেনের দোদ- প্রতাপে পরিবহন মালিকরা ভীত হয়ে উঠেন। শুরু হয় পরিবহন সেক্টরে নিয়মিত চাঁদাবাজি। এবং পরিবহন সেক্টরে নূর হোসেন চেয়ারম্যান তার একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেন। অনেককে চাঁদা লাগলেও নূর হোসেন কোন প্রকার চাঁদা ছাড়াই সায়েদাবাদ থেকে একাধিক রুটে তার দূরপাল্লার বাস সার্ভিস চালু করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর দেশ ছেড়ে পালান হোসেন চেয়ারম্যান ও তার বাহিনী। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে আসেন নুর হোসেন। বাহিনী সুসংগঠিত করে গোপনে সোনারগাঁও থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালামের মাধ্যমে ওই সময়ের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি কায়সার হাসনাতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন নূর হোসেন। বিনিময়ে নূর হোসেন তার অবৈধ আয়ের উৎস প্রসারিত করেন। এমপির সরাসরি শেল্টার থাকায় স্থানীয় প্রশাসন নূর হোসেনকে কিছু বলত না। বরং সিদ্ধিরগঞ্জ থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীর তালিকা থেকে নূর হোসেন তার নাম বাদ করিয়ে নিয়েছেন।
২০১০ সালে একটি হরতালে বাধা দিতে গেলে ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই) এর নেতাকর্মীরা শিমরাইল ট্রাক স্ট্যান্ডে হামলা চালায়। নূর হোসেন হামলার শিকার হন। ভাঙচুর করা হয় তার কার্যালয়। এ ঘটনায় শিমরাইল ট্রাক স্ট্যান্ডে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন নূর হোসেন। বর্তমান নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানসহ একাধিক মন্ত্রী ওই প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে নূর হোসেনের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানান। এ ঘটনার স্থানীয় প্রশাসনের নেক নজরে আসেন নূর হোসেন। দলীয় কোন পদপদবি না থাকলেও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা টাকার জন্য বসে থাকতেন নূর হোসেনের কাছে।
২০১১ সালের ৩০শে অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে কয়েক গুণ শক্তিশালী হয়ে উঠেন নূর হোসেন। তার ক্ষমতার পরিধি বেড়ে যায়। দুই হাতে টাকা উপার্জন করেন নূর হোসেন। নাসিকের ১নং প্যানেল মেয়র পদের জন্য কোটি টাকা খরচ করেন নূর হোসেন। যদিও এক ভোটে হেরে যান তিনি। কিন্তু তার প্রভাব এক ইঞ্চিও কমেনি। বরং বেড়েছে। ধীরে ধীরে তিনি পুরো শিমরাইল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। ফুটপাট থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টরে তার বাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। শিমরাইল ট্রাক টার্মিনালে চালু করা যাত্রার নামে নগ্ন নৃত্য, হাউজি, জুয়া, নিরাপদে মাদক বিক্রি ও সেবনের নিরাপদ আখড়া। প্রকাশ্যে কাউন্টার বসিয়ে ফেনডিল ও ইয়াবা বিক্রি করা হতো। প্রতিদিন মাদক বিক্রি ও জুয়া, হাউজি থেকে তার আয় ছিল প্রায় ১০ লাখ টাকা। এই টাকার ভাগ পেতেন জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তারা। গত বছর আড়াই হাজারে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় লোক সমাগম ঘটনোর জন্য ওই এলাকার এমপি নূর হোসেনের দারস্থ হন। শোনা যায়, ওই এমপিকে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়ার পাশাপাশি নূর হোসেন কয়েক হাজার লোক সাপ্লাই দেন। বিনিময়ে নূর হোসেন প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে নূর হোসেনকে দেখার পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চাউর হয় নূর হোসেনের ক্ষমতা নিয়ে। ফলে উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনও কখনও নুর হোসেনের বিরুদ্ধে কথা বলেনি।
নূর হোসেন সর্বশেষ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন। এখন তিনি বিশাল আওয়ামী লীগ নেতা। থানার শীর্ষ নেতারা তার পিছনে ঘুরেন। শুধু টাকার জন্য। ফলে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে তারা কখনো প্রতিবাদ করেননি। নূরের বাহিনীতে শাহাজাহান ওরফে কালা শাহাজাহান ওরফে বরিশাইল্লা শাজান, আলী মোহাম্মদ, ছানা উল্লাহ ছানা, তারছিল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল, সালাউদ্দিন, জামাল উদ্দিন, আজাহার, নাছির ওরফে কালা নাছির, আক্কেল আলী, আসাবউদ্দিন, সালাউদ্দিন ওরফে লাদেন, সেলিম, আমান প্রমুখ ক্যাডাররা রয়েছে। এরমধ্যে শাহাজাহান ওরফে কালা শাহাজাহান ওরফে বরিশাইল্লা শাজান, আলী মোহাম্মদ, ছানা উল্লাহ ছানা, তারছিল, জামাল উদ্দিন নূর হোসেনের বডিগার্ড হিসেবে কাজ করে। তাদের নেতৃত্বে রয়েছে ২ শতাধিক ছোট বড় সন্ত্রাসী। নূর হোসেনের ৭-৮টি গাড়ি দিয়ে এই ক্যাডার বাহিনী চলাচল করতো। এবং নুর হোসেন যেখানে যেতো তারা সার্বক্ষণিক তার সঙ্গে থাকতো।
No comments:
Post a Comment