মুনাফার লোভে কপাল পুড়েছে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার গাংধর
কান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫৫৬ শিক্ষার্থীর।দ্বিতল একটি ভবন থাকার
পরও তাদের খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করতে হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট একটি
রেইনট্রিগাছের নিচে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর পাঠদান চলছে।পাশেই
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয়ে
নির্মিত দ্বিতল বিদ্যালয় ভবনটি।

এর
নিচতলা ১৯৯৮-৯৯ অর্থ বছরে এবং দ্বিতীয় তলা ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে নির্মাণ করা
হয়।নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে এর মধ্যেই ভবনটির বিভিন্ন
অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।নিচতলার বিম, মেঝে ও ছাদ নষ্ট হয়ে গেছে।ছাদের
বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে আহত হয়েছে শিক্ষার্থীরাও।প্রায় ছয় মাস আগে ভবনটি
ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।এ অবস্থায় তিন মাস ধরে কয়েকটি শ্রেণীর পাঠদান
চলছে মাঠে।একপর্যায়ে গত ২৩ এপ্রিল ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানায়, শিক্ষার্থীরা সকাল সাতটা থেকে
দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ের মাঠে ক্লাস করে।বিদ্যালয়টি ১৯৬৮ সালে
প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে সরকারি হয়।বর্তমানে স্কুলের মোট শিক্ষার্থী
৫৫৬ জন। গত ১২ এপ্রিল ভবনের ছাদ ধসে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রোকেয়া, আঁখি
ও নাজিম উদ্দিন আহত হয়।রোকেয়া এখনো চিকিত্সাধীন।এর আগেও ছাদ ধসে পাঁচ-ছয়
শিক্ষার্থী আহত হয়। চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মহর আলী বলে, ‘ছাদ ভাইঙ্গা
ভাইঙ্গা পড়ে, বেঞ্চ নাই, বসতে পারি না।ভয়ে ইস্কুলের ভিতর যাই না।এখন বাইরে
ক্লাস অয়।এইজন্য স্কুলে আই।’ পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী শামীম বলে,
‘মেঘ-বৃষ্টি আইলে পড়বাম কেমনে? আমার বন্ধুরা দুখকু পাওনের পর থাইক্যা ঘরে
ঢুকি না।’ ওই শ্রেণীরই আরেক শিক্ষার্থী সুবর্ণা বলল, ‘আমরার সামনে চাইরবার
ছাদ ভাইঙ্গা পড়ছে।নতুন বিল্ডিংও কেন ভাইঙ্গা পড়ে বুঝি না।আমরার পড়ার খুব
অসুবিধা।মাঠে বসতাম মন লয় না।’ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. মানিক
মিয়া বলেন, ‘অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ অইছে।নির্মাণের সময়ই বাধা দেওয়া
অইছিল।কিন্তু ঠিকাদার তা আমলে নেয়নি।সরকারি লোকজনদের মেনেজ করে কোনোক্রমে
কাজ দেখাইয়া চলে গেছে।না অইলে এত অল্প দিনে ভবন কীভাবে পরিত্যক্ত হয়? ছনের
ঘরও তো ১২-১৩ বছর যায়।’ একাধিক এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যালয় ভবনের একটি অংশের
ঠিকাদার ছিলেন আবুল কালাম।যোগাযোগ করা হলে ঠিকাদার মোবাইল ফোনে প্রথম
আলোকে বলেন, ‘আমি ঠিকাদার ছিলাম কি না, আমার মনে পড়ছে না।আপনি অফিস
ডকুমেন্ট দেখেন, কে ঠিকাদার ছিলেন।’ অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাজের
মান খারাপ হলেই ভবন পরিত্যক্ত হয়।আমি কাজটি করে থাকলে আমার দ্বারাও হতে
পারে অথবা অন্যের দ্বারাও হতে পারে।’ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জয়নাল
আবেদিন বললেন, ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার আগে থেকেই বাইরে ক্লাস নেওয়া
হচ্ছে।ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পাশে কোনো ঘর ভাড়া নিয়ে ক্লাস চালাতে
বলেছে।কিন্তু এত শিক্ষার্থী ধরে এমন ঘর আশপাশে নেই।সামনের দিনগুলো নিয়ে
তিনি দুশ্চিন্তা প্রকাশ করলেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মালবিকা
ভৌমিক বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে।ওপরের নির্দেশ
পেলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)
তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে প্রকৌশলীর মতামতের ভিত্তিতে
পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।পাঠদানে যাতে বিঘ্ন না ঘটে সে ব্যাপারে পরিচালনা
কমিটি ও প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছি।’
No comments:
Post a Comment