Saturday, August 22, 2015

রাজধানীজুড়ে ব্যাপক জলাবদ্ধতা- ওয়াসা বলছে, পানি দ্রুত নেমে গেছে by অরূপ দত্ত

বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা থেকে গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানীতে কখনো মাঝারি, কখনো হালকা বৃষ্টি। পরিমাণ ৮৮ মিলিমিটার। ফলাফল পুরোনো। বেশির ভাগ এলাকা জলমগ্ন। গতকাল দুপুরের পর বৃষ্টি ধরে এলেও শান্তিনগর ও আশপাশের এলাকা এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সন্ধ্যায়ও পানি আটকে ছিল।
তবে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত ঢাকা ওয়াসা বলছে, অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে নগরের কিছু স্থানে জলাবদ্ধতা হলেও বেশির ভাগ এলাকা থেকে অল্প সময়ে পানি নেমে যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো রাজধানীতেও বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় বিক্ষিপ্তভাবে এবং রাতের বেশির ভাগ সময় মাঝারি ও হালকা ধরনের বৃষ্টি হয়। আজ শনিবার বৃষ্টিও হবে বলে অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়।
গতকাল ছুটির দিন হওয়ায় এবং অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় জলাবদ্ধতায় স্বাভাবিকভাবেই জনদুর্ভোগ কিছুটা কম হয়েছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষজন, বিশেষ করে রিকশা, অটোরিকশাচালকদের মতো শ্রমজীবীরা জীবিকার তাগিদে বা অনিবার্য প্রয়োজনে যাঁরা পথে নেমেছেন, তাঁদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। অনেক এলাকায় খোলা ছিল দোকানপাট। কাঁচাবাজারও। জলাবদ্ধতার কারণে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকেই পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। এ ছাড়া কিছু কোচিং সেন্টার এবং সংগীত ও অঙ্কনের প্রতিষ্ঠানে আসা শিক্ষার্থীরাও সমস্যায় পড়ে।
রামকৃষ্ণ মিশন রোডের জিয়া মাঠ-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ঝুমুর দেবনাথ বলেন, পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থিত ভোলানন্দগিরি আশ্রমে সংগীত ও অঙ্কনের ক্লাস ছিল তাঁর ছেলে রণবীর দেবনাথের। কিন্তু গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় বাসা থেকে বেরোনোর চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। কারণ, রাস্তায় তখন হাঁটুপানি। ওই সময়ে কোনো রিকশাও পাওয়া যায়নি।
রাজারবাগ: প্রবল বৃষ্টিতে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। রাজারবাগের সামনে জলাবদ্ধ সড়কে ইঞ্জিনে পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সটি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন চালক l প্রথম আলো
শুধু রামকৃষ্ণ মিশন রোড নয়, সকাল আটটার দিকে পুরান ঢাকার অভয় দাস লেন, কামরুন্নেসা স্কুল মোড় থেকে হাটখোলা আনসার ক্যাম্প হয়ে পেয়াদাপাড়া, গোপীবাগ, স্বামীবাগ, কে এম দাস লেন, ওয়ারীর লারমিনি স্ট্রিট (সানাই কমিউনিটি সেন্টার এলাকা)—এসব এলাকা তলিয়ে ছিল পানিতে। মতিঝিল শাপলা চত্বর ছাড়িয়ে কাকরাইল মোড় পর্যন্ত শুধু পানি আর পানি। কোথাও পানি হাঁটুর ওপরে। শান্তিনগর, রাজারবাগ, সার্কিট হাউস রোড, বেইলি রোডের মোড়, মৌচাক ও আশপাশের এলাকায় সকালে ছিল হাঁটুর ওপর পানি। শান্তিনগরের বাসিন্দা মো. ফিরোজ বলেন, সকালে শান্তিনগর বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে তিনি নোংরা পানিতে পড়েন। তাঁর পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। ঘড়ি ও মুঠোফোন ভিজে অকেজো হয়ে যায়।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নিউমার্কেট এলাকায় জলাবদ্ধতার সঙ্গে ছিল যানজট। মৌচাক মার্কেট, আনারকলি মার্কেট এলাকা ছিল পানিতে থইথই। বিশেষ কেনাকাটা থাকায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেয়েকে নিয়ে গ্রিন রোড থেকে নিউমার্কেটে যেতে হয়েছিল বেসরকারি ব্যাংকে চাকরিরত আফরোজা বানুকে। কিন্তু জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে পুরো কেনাকাটা না করেই ফিরে আসতে হয় তাঁদের।
জলাবদ্ধতা ছিল ঢাকার প্রায় সব এলাকায়। পুরান ঢাকার বকশীবাজার, নাজিমুদ্দিন রোড, আজিমপুর কবরস্থান এলাকা, আগামসি লেন, আগা সাদেক রোড, চকবাজারসহ আশপাশের সব গলি ছিল পানিতে তলিয়ে। মিরপুরের গোলচত্বর থেকে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, রোকেয়া সরণি, শেরেবাংলা নগর, শ্যামলী, মণিপুরীপাড়া ও বিজয় সরণি, তেজগাঁও লিংক রোড ও আশপাশের এলাকায় সকালে জলাবদ্ধতা ছিল। তবে ঘণ্টা দুয়েক পরে পানি নেমে যায়। তবে ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ নম্বর সেকশনসহ মিরপুরে যেসব রাস্তায় ঢাকা ওয়াসা পানির লাইনের গর্ত করে মাটি ও বালু ফেলেছিল, সেসব এলাকার কাদায় ভরে যায়।
গার্ডেন রোড: ঘরের দুয়ারে নোংরা পানি। তা এড়িয়ে চলতে শিশুদের কসরত। দৃশ্যটি বসুন্ধরা সিটির পেছনে গার্ডেন রোডের l প্রথম আলো
ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল বাস, অটোরিকশা, প্রাইভেট কারসহ তিন শতাধিক মোটরযান রাস্তায় বিকল হয়ে যায়। দুপুরে আরামবাগ ও রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সামনে অন্তত সাতটি অটোরিকশা ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা যায় চালকদের।
জলাবদ্ধতা কমাতে ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের কর্মীরা রাস্তায় নেমে পড়েন। তাঁদের প্রধান কাজ ছিল ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে দিয়ে পানি নামার ব্যবস্থা করা।
ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এ ডি এম কামরুল আলম চৌধুরী বলেন, গত দুই দিনে অস্বাভাবিক ও টানা বৃষ্টির তুলনায় রাজধানীতে জলাবদ্ধতা কম হয়েছে। গোপীবাগে (জনপথ সড়ক) ২৫টি অস্থায়ী পানিনিষ্কাশন পাম্প সক্রিয় ছিল। রামপুরায় সম্প্রতি চালু হওয়া স্থায়ী পাম্পও কাজ করেছে।
ডিএমডি বলেন, রাজারবাগ এলাকায় উড়ালসড়ক নির্মাণকাজের কারণে অনেক ড্রেনেজ লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য সেখানে ও আশপাশের এলাকায় পানি নামতে সময় নেয়। এ ছাড়া ঢাকার চারপাশের নদীগুলো ভরে থাকায় পানি নামতে কিছু সময় নিতেই পারে। মিরপুরসহ অন্য এলাকাগুলো থেকে অল্প সময়ে পানি নেমে যায়।
তবে নগরের অভয় দাস লেন, পেয়াদাপাড়া, শান্তিনগর, সার্কিট হাউস রোডসহ নগরের বেশ কিছু স্থানে গতকাল সন্ধ্যায়ও পানি জমে ছিল বলে খবর পাওয়া যায়।
তল্লাবাগ: হাঁটুপানিতে ডুবে আছে সড়ক। জীবিকার দায়ে মাথায় পসরা নিয়ে নামতে হয়েছে সেই পথে। ছবিটি তল্লাবাগ এলাকা থেকে তোলা l প্রথম আলো

No comments:

Post a Comment