বাংলাদেশের
অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর কোন অধিকার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
চৌধুরী নিসার আলির নেই। বাংলাদেশের আইনি মানদণ্ড নিয়ে মন্তব্য করার কাজ এ
বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক সংস্থার। গতকাল পাকিস্তানের দ্য ডেইলি টাইমস
পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘টর্চারড রিলেশনশিপ’ শীর্ষক এক
সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালে আমাদের রক্তাক্ত
ইতিহাসের কথা বিবেচনায় নিলে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চেঁচামেচি করার
অবস্থানে পাকিস্তান নেই। চৌধুরী নিসার আলি বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে যে
অভিযোগ উঠিয়েছেন তার চেয়ে বরং তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন, তা-ই বাঙালি
জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলবে ও দুই দেশের ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ সমপর্ককে ঝুঁকিতে ফেলবে।
আবারও এ ঘটনাপ্রবাহ নির্দেশ করছে যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা ও
বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কথা চিন্তা করতে নিদারুণভাবে
ব্যর্থ হয়েছে পাকিস্তান। গত রোববার যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিএনপি নেতা
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের
ফাঁসি কার্যকর হয়। এর পর পাকিস্তানে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারই
প্রেক্ষিতে গতকাল ওই সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, পাকিস্তান
রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার ও জোর করে একীভূত করার খায়েশ পূর্ণ করতে
চেয়েছিল শাসকরা। তা করতে গিয়ে তখনকার পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় অর্ধেকটা
অংশ, যা এখন বাংলাদেশ, সেখানে নৃশংসতা সংঘটিত করে। এর মাধ্যমে যে পাপ
পাকিস্তান করেছে তা সবচেয়ে ঘৃণ্য। এ নিয়ে এখন কমই কথা বলা হয়। বাংলাদেশ
সৃষ্টি হয়েছে কয়েক দশকের অর্থনৈতিকভাবে শোষণের কারণে, পশ্চিম পাকিস্তানের
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শ্রেণীগত বৈষম্যের ফলে। যখন বৈধ একটি
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় এবং তা বাতিল করে দেয়া হয় তখন ক্ষমতায়
যাওয়ার আশায় থাকা বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এতে বাংলাদেশ সৃষ্টির
আন্দোলন পূর্ণ গতি পায়। আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার
করার মধ্য দিয়ে অসৎ পরামর্শে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর নৃশংস সামরিক
অভিযান শুরু হয়। এ সময় সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে ‘অনুগতরা’। এর মধ্যে রয়েছে
পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামী। তারা তাদের নিজেদের মতো করে মিলিশিয়া
গঠন করে। তাদের শিকারে পরিণত হন বাঙালি বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা।
কয়েক মাসের প্রতিরোধ আন্দোলনের দিকে বেশি নজর পড়ে। পশ্চিম পাকিস্তানের
ভয়াবহ হামলার মুখে তা ছিল সংঘটিত। এতে সহায়তা করে ভারত। এর ফলে পাকিস্তানি
বাহিনী পরাজিত হয়। কিন্তু আত্মসমর্পণের আগে যতদূর সম্ভব নির্যাতন করা হয়।
সব মিলে কয়েক লাখ বাঙালিকে হত্যা করা হয়। দুই লাখের বেশি নারীকে ধর্ষণ করা
হয়। সংক্ষেপে এক রক্তপাতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামের দেশটির জন্ম হয়। পরের
বছরগুলোতে নির্যাতনের এই ধারা রাজনীতিতে বেশ ছায়াপাত করেছে। ইতিহাসের ক্ষত
নিয়ে ভুগতে থাকে বাংলাদেশ। তখন ভূপ্রাকৃতিকভাবে আলাদা হওয়া পাকিস্তান
অনেকদূর এগিয়ে যায়। এতে আরও বলা হয়, আমাদের সাবেক স্বদেশীদের ওপর যে ভয়াবহ
নির্যাতন করা হয়েছে তার স্বীকারোক্তিই এখন পর্যন্ত দেখা তো যায়ই নি, দূরে
থাক ক্ষমা প্রার্থনা।এ ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন, বিশেষ করে
বাংলাদেশের সামপ্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে। ২০১০ সাল থেকেই শেখ মুজিবুর
রহমানের বড় কন্যা শেখ হাসিনার সরকার ‘বিচারে’র প্রচারণায় আছেন। যার চূড়ান্ত
উদ্দেশ্য ১৯৭১ সালের অনুগতরা যারা মুক্তিযুদ্ধে স্বদেশীদের বিরুদ্ধেই
যুদ্ধাপরাধ সংঘটন করেছে ও স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, তাদের শাস্তি দেয়া।
বাংলাদেশী জনগণের ক্ষতে জ্বালা দিয়ে, ওই অনুগতদের বেশির ভাগকেই ক্ষমা ও
সরকার কাঠামোয় যুক্ত করেছিল সামরিক সরকার, যারা ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর
রহমান ও তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হত্যার
পর ক্ষমতা হস্তগত করেছে। গত পাঁচ বছরে এরকম প্রায় ১৫ ব্যক্তি, যারা
জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি সদস্য, তাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা
হয়েছে। এদের চার জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। সর্বশেষ যে দু’জনের ফাঁসি
কার্যকর করা হয়েছে, তারা হলেন বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। এদের বিরুদ্ধে
যথাক্রমে নির্যাতন, ধর্ষণ, গণহত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার চক্রান্ত,
নির্যাতন ও অপহরণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। ফাঁসি কার্যকরের এ দুটি ঘটনা
পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয় নিজেদের প্রতিক্রিয়াকে ‘উদ্বেগপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছে। এছাড়া
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলি স্বভাবগতভাবেই আন্তর্জাতিক বিষয়ে
মন্তব্য করছেন তার ট্রেডমার্ক যুদ্ধংদেহি মনোভাব নিয়ে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন
যে, ‘একটি গোষ্ঠী’ ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভ্রাতৃপ্রতিম সমপর্কে’র
বিরুদ্ধে। তিনি ‘বিচারের অপমৃত্যুর’ও নিন্দা জানান।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ
ঘটনাগুলোকে ১৯৭৪ সালে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত
চুক্তির লঙ্ঘন বলে বিবেচনা করে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অনুধাবন করা প্রয়োজন,
যে চুক্তির ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, সে চুক্তিটি
মুজিব নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। ওই চুক্তির কোন ধারাই
এরপর কোন দেশ মেনে চলেনি। এটা সত্য, যে বিচার প্রক্রিয়ায় এ মানুষগুলোকে
অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে ঘাটতি রয়েছে।
এছাড়া হাসিনা কি বিচারের রাজনীতি অনুসরণ করছেন, না প্রতিশোধের, এ প্রশ্ন
করা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এরপরও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর কোন
অধিকার চৌধুরী নিসারের নেই।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment