আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এককভাবে অংশ নেয়ার ঘোষণায় হতাশ ১৪
দলের শরিকরা। দেশের চলমান পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অবস্থার দাবি অনুযায়ী
আওয়ামী লীগের এমন সিদ্ধান্তকে ‘অসঙ্গতি’ হিসেবে দেখছেন তারা। একই সঙ্গে
নির্বাচন নিয়ে ১৪ দলের শরিকদের মূল্যায়ন না করায় জোটে দেখা দিয়েছে
অস্বস্তি। জোটের শীর্ষ নেতারা বলছেন, অতীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সিটি
করপোরেশন, উপজেলা নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন
১৪ দলীয় জোট। কিন্তু ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে
আওয়ামী লীগের এককভাবে অংশ নেয়ার ঘোষণায় হতাশ তারা। জোটের শীর্ষ নেতাদের
যুক্তি, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অংশ নেবে। জামায়াত
সরাসরি অংশ না নিলেও বিভিন্নভাবে তৎপর থাকবে। তাই, নির্বাচন সামনে রেখে
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও অসামপ্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক
দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচনের
সিদ্ধান্ত নেয়ায় বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী পক্ষ নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী
সময়ে সুবিধা নেবে বলে মনে করেন ১৪ দলের শরিক নেতারা। এদিকে জোটের শরিকদের
বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা আলাপকালে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, জোটের
শীর্ষ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যেহেতু এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে,
তাই জোটের অন্য শরিকরাও এককভাবে যার যার অবস্থান থেকে পৌরসভা নির্বাচনে অংশ
নেবে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় প্রার্থী বাছাইসহ এ সংক্রান্ত
বার্তাও পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এতে করে বিভিন্ন পৌরসভায় ১৪ দলের প্রার্থীরাই
একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা। গত বৃহস্পতিবার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের
কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩০শে
ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য পৌরসভা নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে
১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ দল আওয়ামী লীগ। ইতিমধ্যে দলটি তৃণমূলের নেতাদের
মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে। তবে, পৌরসভা নির্বাচন
জোটগত নাকি একক, গত কয়েকদিন ধরে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী
লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, এ বিষয়ে পরবর্তীতে আলাপ আলোচনার
ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। জানতে চাইলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের
(জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া মানবজমিনকে বলেন, জোটগতভাবে
নির্বাচনের জন্য এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর
আওয়ামী লীগ তো বলেছে সব দলের অংশগ্রহণে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই
আমরাও সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি। এককভাবে নির্বাচনের লক্ষ্যে সারাদেশের
জেলা, উপজেলায় নেতাদের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এককভাবে
নির্বাচনের জন্য আমাদের পূর্ব প্রস্তুতিও ছিল। এখন যার যার অবস্থান থেকে
দলগতভাবেই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। অবশ্য আওয়ামী লীগের এমন
সিদ্ধান্তে জোটে অস্বস্তি ও টানাপোড়েন আছে কিনা- এ বিষয়ে কোন মন্তব্য
করেননি তিনি। ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা
মানবজমিনকে বলেন, এর আগে আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সিটি করপোরেশন, উপজেলা
নির্বাচন ১৪ দলীয় জোটের ব্যানারে করেছি। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন যদি
জোটগতভাবে না হয়ে এককভাবে হয় সেটি হবে একটি ‘অসঙ্গতি’। কিন্তু বর্তমান
পরিস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে অসঙ্গতি কারও কাম্য নয়। তিনি বলেন, আমাদের
রাজনৈতিক কাজ তো শেষ হয়ে যায়নি। এখন আওয়ামী লীগ যদি এককভাবে পৌরসভা
নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে আমাদের কিছুই বলার নেই। সেক্ষেত্রে আমরাও
এককভাবেই নির্বাচনে অংশ নেবো। আজ (শনিবার) আমাদের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত
নেয়া হবে। ১৪ দলীয় জোটের শরিক একটি দলের একজন শীর্ষ নেতা আলাপকালে
মানবজমিনকে বলেন, সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি
ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন ছিল।
বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। সে বিবেচনায় পৌরসভা নির্বাচন ছিল ১৪ দলের
ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি সুযোগ। কিন্তু আওয়ামী লীগ কেন এককভাবে নির্বাচনের
সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটি বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের এ ধরনের ঘোষণায়
আমাদের ক্ষোভ থাকতেই পারে। আর এই ক্ষোভ দুটো কারণে। প্রথমত, তাদের একক
নির্বাচনের ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন না করলে বিভিন্ন
পৌরসভায় জামায়াত-বিএনপির প্রার্থীর জয়লাভ। আর যদি এরকম হয় তাহলে বর্তমান
রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী যেমন এটি ভালো হবে না, তেমনি ভবিষ্যতের জন্যও
তা শুভ হবে না। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির যুগ্ম সম্পাদক ইসমাইল হোসেন এ
বিষয়ে বলেন, তারা (আওয়ামী লীগ) মুখে শুধু বলছে পৌরসভায় একক নাকি জোটবদ্ধ
নির্বাচন তা আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু নির্বাচন
কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছে। প্রার্থী বাছাইও শুরু হয়েছে। এখন জোটবদ্ধ
নির্বাচনের আলাপ আলোচনা হবে কখন? এদিকে, ১৪ দলের একাধিক শীর্ষ নেতা
বলেছেন, আওয়ামী লীগ এককভাবে পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে- এ বিষয়টি তারা
আগেই আঁচ করতে পেরে তারাও এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু
করেছিলেন। এমনকি বিভিন্ন পৌরসভায় সম্ভাব্য প্রার্থীও নির্ধারণ করে ফেলেছেন
তারা। এমন পরিস্থিতিতে নেতারা বলছেন, বেশকিছু পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের
শরিক দলের প্রার্থীরা নিজেরাই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন।
ফলে যেসব পৌরসভায় এমন পরিস্থিতি থাকবে সেখানে প্রতিপক্ষ নির্বাচনী সুবিধা
আদায় করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ১৪ দলের নেতারা। জাতীয় পার্টির (জেপি)
মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগের একক নির্বাচনের
ঘোষণায় আমরাও এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছি। ইতিমধ্যে আমাদের বর্ধিত
সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তে কোনো কোনো পৌরসভায় ১৪
দলের প্রার্থীরাই একে অপরের প্রতিপক্ষ হতে পারে কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে
তিনি বলেন, তা তো হতেই পারে। তিনি বলেন, কিছু শর্ত থাকলেও বিএনপি
আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এখন ভিন্ন পরিস্থিতিতে
নির্বাচন হবে। তাই জোটগত নাকি দলীয়ভাবে অংশ নেয়া হবে তা চূড়ান্তভাবে জানার
জন্য হয়তো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে, সরকার বা
আওয়ামী লীগ যদি এক্ষেত্রে কোনো কৌশল অবলম্বন করে থাকে তবে সেটি উচিত হবে
না।জোটের অন্যতম শরিক গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুর রহমান
সেলিম মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগের একক নির্বাচনের ঘোষণায় আমরাও এককভাবে
নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছি। ইতিমধ্যে কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নোয়াখালীসহ
বিভিন্ন পৌরসভায় সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু একক
নির্বাচনের ফলে বিভিন্ন পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের প্রার্থীরা নিজেরাই
নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জোটগত না হোক সমঝোতার
ভিত্তিতে নির্বাচনের জন্য জোটের শীর্ষ দল আওয়ামী লীগ উদ্যোগ নিতে পারে।জানতে
চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র
মোহাম্মদ নাসিম মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন
পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে, এটি এখনও
নিশ্চিত নয়। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একটা পর্যায়ে শরিকদের সঙ্গে আলোচনা
হবে। আলোচনা করেই পৌর নির্বাচনে জোটগত নাকি দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ, সে বিষয়ে
সিদ্ধান্ত হবে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment