রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে একই স্কুলের চাকরিচ্যুত শিক্ষক পরিমল জয়ধরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক সালেহ উদ্দিন আহমেদ গতকাল জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পাশাপশি সাজাপ্রাপ্ত পরিমলকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও তা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। গত ১০ই নভেম্বর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আলোচিত এই মামলার রায় ২৫শে নভেম্বর ঘোষণা করা হবে মর্মে অপেক্ষমাণ রাখা হয়। ঘোষিত রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্ত পরিমল জয়ধর আদালতের রায় মেনে নিয়ে বলেছেন তার আইনজীবীদের সঙ্গে উচ্চ আদালতে আপিলের সিদ্ধান্ত নেবেন। পরিমলেরআইনজীবীরা দাবি করেছেন এ রায়ে তারা ন্যায়বিচার পাননি। তাই ন্যায়বিচার পেতে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।রায় ঘোষণাকারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সালেহ উদ্দিন আহমদ রায়ের পর্যবেক্ষণে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতির পরিচয় দিয়েছেন বলে উষ্মা প্রকাশ করেন। দু’জন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার তদন্তে এরূপ গাফিলতি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে রায়ে বিচারক বলেন, সঠিকভাবে তদন্ত করলে ভিকটিমের অভিযোগ সমর্থনের জন্য তা অধিকতর সহায়ক হতো। রায় ঘোষণা শেষে সাজা পরোয়ানা দিয়ে পরিমলকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। ২০১১ সালের ২৮শে মে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রীকে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে শিক্ষক পরিমল। ওই সময় ছাত্রীর নগ্ন ভিডিও চিত্র মোবাইলে ধারণ করা হয়। পরে তাকে জিম্মি করে ১৭ই জুন আবারও ধর্ষণ করে আসামি পরিমল। বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। দেশজুড়ে ওঠে নিন্দার ঝড়। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তখন পরিমল জয়ধরকে বরখাস্ত করে। এরপর ৫ই জুলাই ধর্ষিতা ছাত্রীর পিতা বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পরিমল জয়ধর, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বসুন্ধরা শাখার প্রধান লুৎফর রহমান ও অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগমকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের একদিন পরেই ঢাকার কেরানীগঞ্জে পরিমলের স্ত্রীর বড় বোনের বাসা থেকে পরিমলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সম্পূরক চার্জশিটে শুধু পরিমল জয়ধরকে অভিযুক্ত করে অন্য দু’জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এই মামলায় ৪০ জন সাক্ষীর মধ্যে ভিকটিমসহ ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। তবে, পরিমলের পক্ষে কোন সাফাই সাক্ষী ছিল না। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার লাটেংগা গ্রামের পরিমল জয়ধর ২০১০ সালে ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখায় বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।আলোচিত এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে গতকাল পুরনো ঢাকার জনসন রোডের আদালতপাড়ায় ছিল চাঞ্চল্য। গণমাধ্যম কর্মী ও উৎসুক জনতা রায় শোনার জন্য সকাল থেকেই আদালতে এসে ভিড় করতে থাকেন। এর মধ্যে সাধারণ মানুষ অনেকেই আসেন ধর্ষক পরিমলকে একনজর দেখার আশায়। সকাল সাড়ে দশটায় আসামি পরিমল জয়ধরকে পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যানে করে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। তাকে রাখা হয় আদালতের হাজতখানায়। দুপুর ২টায় রায় ঘোষণার কিছু সময় আগে তাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর আদালতে হাজির করা হয়।বিচারের রায়ে তিনি খালাস পাবেন এমন বাসনাও ব্যক্ত করেন পরিমল। দুপুর ২টায় ট্রাইব্যুনালের বিচারক সালেহ উদ্দিন আহমেদ এজলাসে তার আসন গ্রহণ করেন। আদালতে তখন পিনপতন নীরবতা। মাত্র ৪ মিনিটে বিচারক রায় পড়া শেষ করেন। রায়ে তিনি উল্লেখ করেন, পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে আসামি পরিমল জয়ধরের বিরুদ্ধে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার দশম শ্রেণীর ছাত্রীকে ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থানে ভয়-ভীতি দেখিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এতে করে আসামি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০-এর ৯(১) ধারায় অপরাধ করেছে মর্মে তাকে উক্ত অপরাধের একমাত্র সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। একই সঙ্গে আসামিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়া হলো। জরিমানার অর্থ ভিকটিমকে দেয়ার নির্দেশ দেন তিনি। তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতিরায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক এসএম শাহাদাৎ হোসেন এবং পুলিশ পরিদর্শক মাহবুবে খোদা মামলার তদন্তে চরম অদক্ষতা ও গাফিলতির পরিচয় দিয়েছেন। পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার দু’জন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার তদন্তে এরূপ গাফিলতি কোনভাবেই কাম্য নয়। এটা ঠিক হয়নি। তারা যদি সঠিকভাবে তদন্ত করতেন তাহলে ভিকটিমের অভিযোগ সমর্থনের জন্য তা অধিকতর সহায়ক হতো। তবে তাদের তদন্তের দুর্বলতার কারণে এ মামলার আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি এটা বলা যায় না। বিচারক বলেন, কয়েকজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পেরেছি ভিকটিমের পরিবার একটি শিক্ষিত পরিবার এবং ভিকটিমের বাবা একজন শিল্পপতি। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আসামি পরিমল জয়ধরকে ম্যানেজিং কমিটির দ্বন্দ্বের শিকারে পরিণত করার জন্য ভিকটিমকে ব্যবহারের কোন সঙ্গত কারণ যেমন নেই, তেমনি আসামিপক্ষের জেরা থেকেও এমন কিছু উদঘাটিত হয়নি। স্কুল কমিটির দ্বন্দ্বের শিকার ১৪ বছরের বালিকা কেন হবে? বিচারক বলেন, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্র্রেটের নিকট এবং পরবর্তীকালে অত্র ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদানকালে তার জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ভিকটিম ধারাবহিকভাবে তার প্রতি তার শিক্ষকের চরম নিষ্ঠুরতার সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছে।রায়ে সন্তুষ্টরাষ্ট্র পক্ষ, আসামি পক্ষ আপিল করবেআসামি পরিমল জয়ধরের বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিশেষ পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) মোহাম্মাদ ফোরকান মিয়া বলেন, এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। তবে, আদালত বলেছেন, মামলার তদন্তে তদন্ত কর্মকর্তার গাফিলতি ছিল। আসামি পরিমল জয়ধরের আইনজীবী মো. মাহফুজ মিয়া বলেন, আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এটি কোন ধর্ষণের ঘটনা নয়। সাক্ষ্য ও তথ্য প্রমাণে ধর্ষণের বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি। দেড় মাস পরে ভিকটিমের মেডিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে ভিকটিমকে ধর্ষণের কোন আলামতও পাওয়া যায়নি। আমরা ন্যায়বিচার পেতে উচ্চ আদালতে আপিল করবো।আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল: পরিমলধর্ষণের অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পরিমল জয়ধর রায় ঘোষণার আগে ও পরের পুরোটা সময় জুড়েই ছিলেন বেশ হাস্যোজ্জ্বল। বেলা ২টায় তাকে যখন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারকের আদালতে নিয়ে আসা হয় তখন কাঠগড়ায় উঠেই তিনি উপস্থিত আইনজীবী, গণমাধ্যম কর্মী ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সাবলীলভাবে হাসিমুখে কথা বলেন। তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। রায় শোনার পর কিছুক্ষণ বিমর্ষ থাকলেও পরোক্ষণেই তিনি আবারও স্বাভাবিক হয়ে যান। পরিমল জয়ধর দাবি করেন, আমি নির্দোষ। আমিতো জানি আমি কোন দোষ করিনি। এই রায়ে আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল। তিনি বলেন, এই মামলায় কোন জব্দ তালিকা ছিল না। এমনকি মেডিক্যাল রিপোর্টও দেয়া হয়েছে দু’মাস পরে। তবে, আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মহামান্য একজন বিচারক রায় দিয়েছেন আমাকে তা মানতেই হবে। আমি এ বিষয়ে কী-ইবা বলতে পারি। আমার হাত-পা বাঁধা। উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্দেশ্যে পরিমল জয়ধর বলেন, আমার স্ত্রী আছে। একটি ছেলে আছে। আপনারা এমন কিছু লিখবেন না যাতে তাদের সম্মানহানি হয়। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন কি-না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তার আইনজীবীকে দেখিয়ে তিনি বলেন, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। নিজেকে অসুস্থ দাবি করে কারাগারে তাকে সুচিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেন পরিমল জয়ধর।
Thursday, November 26, 2015
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment