Monday, November 23, 2015

বাংলাদেশ এখন সমৃদ্ধ গণতন্ত্রের দেশ by প্রণব মুখার্জি

ক্যাভালরি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ক্যাভালরি স্মারক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেয়ে আমি ভীষণ  আনন্দিত। ভারতীয় আর্মাড কোরের বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের সংগঠন এটি। তারাই এই কোরের বিশেষ কোন সেনার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বার্ষিক এই বক্তৃতার আয়োজন করে থাকেন।
এ বছর সম্মানিত করা হচ্ছে মেজর ডি এস নারাগকে। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের কারণে মহাবীর চক্র খেতাব পেয়েছেন। তার ওপর স্মারক বক্তব্য দিতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। মেজর নারাগ ও ভারতীয় অন্য সেনা সদস্য যারা যুদ্ধে তাদের জীবন দিয়েছেন তাদের প্রতি সম্মান জানানোর এই সুযোগটি আমি ব্যবহার করছি। গরিবপুর যুদ্ধে জাতির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেন মেজর নারাগ। এই স্মারক বক্তব্যে আমাকে অনুরোধ করা হয়েছে বাংলাদেশ সৃষ্টি নিয়ে আমার ধারণা ভাগাভাগি করতে। একটি ব্যাখ্যা দিয়ে তা শুরু করা যাক।
আপনারা হয়তো প্রশংসা করবেন যে, উপলব্ধি সব সময়ই আত্মোপলব্ধিমূলক হয়, ইতিহাসে তা আরও বেশি। ১৯৭১ সালে কি ঘটেছিল তা সমসাময়িক ইতিহাসে রেকর্ড হয়ে আছে।
বিশ্ব গণতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার সম্পর্ক অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্র ছিল ইউরোপ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ইউরোপের বড় বড় দেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। যাহোক, বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধেকে এসে তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন এক হয়ে কাজ করার। তারা একটি অভিন্ন বাজার ও অভিন্ন মুদ্রা সৃষ্টি করলেন। তারা একটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং একটি ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট সৃষ্টি করলেন। বিশ্বকে পালটে দেয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো ইন্টারনেট। এটা শান্তিময় ইউরোপের একটি আবিষ্কার।
একইভাবে, বাংলাদেশের একটি উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশ একত্রিত হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক সংস্থা সার্ক গঠনে। এর উদ্দেশ্য আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও গভীর করা। শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য একীভূত হওয়া। গত ৩০ বছরে আমরা অনেক কৌশল ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছি। এটা বেশির ভাগ মানুষ মেনে নেন যে, সার্কের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনা অনুধাবন করতে হবে। আমি মাঝে মাঝে যেমনটা বলি, আমরা আমাদের বন্ধুত্বের সংজ্ঞা পালটে ফেলতে পারি। কিন্তু প্রতিবেশীকে নয়। আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি চিরস্থায়ী উত্তেজনা (টেনশন) চাই নাকি শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশে একত্রিত হতে চাই। অতীত নিয়ে বিভাজনকে পেছনে ফেলে আমাদেরকে অভিন্ন ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে।
অভিন্ন ভবিষ্যতের অগ্রগতির জন্য ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি ভাল উদাহরণ। ১৯৭৪ সালের পর এখন আমাদের সম্পর্ক সবচেয়ে ভাল অবস্থায় আছে। এ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে পারস্পরিক সুযোগ, সমতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় ভারত। সব সময়ই আমাদের স্বার্থের জন্য শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ একটি প্রতিবেশীতে বিশ্বাসী আমরা। ভারত ও বাংলাদেশ শুধুই প্রতিবেশী নয়। এই দুটি দেশ ইতিহাসের সূত্রে, ধর্মীয়, সংস্কৃতি, ভাষা ও আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা। প্রতিবেশীদের মধ্যে অভিন্ন সমৃদ্ধির একটি চিত্র হলো আমাদের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা। বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের উদ্যাম নতুন করে ধারণ করা প্রয়োজন এখন।
সাম্প্রতিক সময়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিস্ময়কর সফলতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এখন একটি সমৃদ্ধ গণতন্ত্রের দেশ। ১৯৭১ সালের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে এ দেশটি এখন খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখানে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য হয়। গত ১৫ বছরে এ দেশের প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৬ ভাগের ওপরে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ২৪০০ কোটি ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ। নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু স্বাস্থ্য, নারীর স্বাস্থ্য সেবা ও টিকা দেয়ার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্জন করেছে এ দেশ। এর মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলনে বাংলাদেশ অগ্রগামী। ভারতের মতো, এই তরুণ দেশটিতে ২৪ বছরের কম বয়সী মানুষ মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি। আরও একবার বলি, আমাদের মতো বাংলাদেশও তথ্য প্রযুক্তি ও সার্ভিস সেক্টরের উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে।
দু’দেশের মধ্যে যেসব ইস্যুতে উদ্বেগ ছিল তা পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সমাধান করা হয়েছে। গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ বছরের ৬ থেকে ৭ই জুলাই অত্যন্ত সফল একটি সফর সম্পন্ন করেন বাংলাদেশে। সীমান্ত চুক্তি সহ অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তখন। বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন সীমান্ত নিয়ে যে সমস্যা ছিল তা চূড়ান্তভাবে এ বছর সম্পন্ন হয়েছে ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে। গত বছর আমরা নৌ-সীমানা নিয়ে বিরোধের মীমাংসা করেছি।
২৫টি পণ্য বাদে বাংলাদেশের সব পণ্যের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে ভারত। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের ওপরে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে আমাদের দ্বিতীয় বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার।  ২০১৩ সালের অক্টোবরে ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী দু’বছরের মধ্যে তা ৫০০ মেগাওয়াট থেকে ১১০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।
বন্ধুরা,
সম্পর্ক আরও গভীর করার ক্ষেত্রে সংযুক্তি বা কানেকটিভিটি একটি অনুঘটক। আমরা তিনটি বাস সার্ভিস চালু করেছি। এর মাধ্যমে আমাদের নাগরিকদের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি, সড়ক, রেল, নদীপথ, সমুদ্রপথ, ট্রান্সমিশন লাইন, পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন, ডিজিটাল লিংক অবশ্যই বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে আঞ্চলিক সংযুক্তি ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে হবে। ভারতের ভেতর দিয়ে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশী পণ্যের চলাচল অনুমোদন নিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তির ওপরে আমরা কাজ করেছি। এতে ভারতের মূল ভূখণ্ডের পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দু’দেশের সিনিয়র কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও ঘন ঘন আলাপ-আলোচনার কারণে উল্লেখযোগ্য এই অগ্রগতি হয়েছে।
মানব পাচার, নকল মুদ্রা, নৌ-সীমানায় সহযোগিতা ও আমাদের কোস্টগার্ডদের মধ্যে সহযোগিতাবিষয়ক সম্প্রতি যে তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তাতে ভারত-বাংলাদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমরা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিয়েছি। অবৈধ প্রবেশ, পাচার ও অবৈধ চলাচল প্রতিরোধে সমন্বয়ের দিকেও নজর দেয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশকে অংশীদার করতে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত। আমাদের দু’দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সদিচ্ছা বৃদ্ধিতে নিয়মিত মতবিনিময় ও বিস্তৃত পরিসরে সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদেরকে অবশ্যই বৃহত্তর অর্থনৈতিক অর্জনের (ইন্টিগ্রেশন) দিকে ধাবিত হতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া একটি একীভূত বাজার হওয়া উচিত। বৈশ্বিক বাজারের জন্য আঞ্চলিক ভ্যালু চেইনের পাশাপাশি একটি সিমলেস অ্যাসেম্বলি লাইন সৃষ্টি করা উচিত। তৈরী পোশাক, বস্ত্রশিল্প, চামড়া ও ওষুধ শিল্পের মতো ক্ষেত্রে এরই মধ্যে ভারতীয় ও বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা সহযোগিতা করছেন। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, জাহাজ তৈরি ও অটো সামগ্রীর ক্ষেত্রেও একই রকম পদক্ষেপ নেয়ার প্রভূত সুযোগ বিদ্যমান।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি আধুনিকায়নকে সহযোগিতা করবে ভারতীয় বিনিয়োগ। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং বাড়বে রপ্তানি। এ কারণে, দু’দেশের সরকার বাংলাদেশে একটি ইন্ডিয়ান স্পেশাল ইকোনমিক জোন স্থাপনে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে। আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐতিহাসিক যোগাযোগ (কানেকশন) পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে এটা আরেকটি বড় পদক্ষেপ। এতে দু’পক্ষই সুবিধা পাবে।
যেহেতু বিপুল সংখ্যক ভোক্তা সস্তায় ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি চান তাই বাংলাদেশ ও ভারতকে এক হতে হবে। সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য শক্তির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
আমাদের অর্থনীতি যতই সংহত হবে আমাদের নাগরিকরা তত বেশি সংযুক্ত হবেন। এতে আমাদের জাতি আরও সমৃদ্ধ হবে। এতে ভারতের উত্তর-পূর্বের জন্য খুলে যাবে অর্থনীতির নতুন দুয়ার। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়াকে সহায়তা করতে পারবে আমাদের দু’দেশ। এর সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে গতিশীল পূর্বাঞ্চলকে।
বন্ধুরা,
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক সব সময় বিশেষ ও ব্যতিক্রম থাকবে- এটা আমার আস্থা। আমি আবারও মেজর ডি এস নারাগ ও অন্য সব ভারতীয় সেনা, যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সাহসিকতা দেখিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
আমি শ্রদ্ধা জানাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি একজন অসাধারণ (আউটস্ট্যান্ডিং) নেতা। বিশ্ব তাকে এভাবেই দেখে। তার নেতৃত্ব ও ত্যাগ জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ। এখন তার মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশকে আরও আরও মহিমাময় স্থানে নিয়ে যেতে।
এখন আমাদের সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময়। আমি আস্থাশীল যে, আগামী দিনগুলোতে আমরা দেখতে পাবো দারিদ্র্য নিরসন, প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, বাণিজ্য উন্নীতকরণ, সন্ত্রাস-কট্টরপন্থি-মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাশাপাশি বিনিয়োগে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে উল্লেখযোগ্যভাবে।
এই স্মারক বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়ার জন্য এবং আমার হৃদয়ের কথা বলার সুযোগ দেয়ার জন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। আমি প্রত্যাশা করি, আপনাদের প্রচেষ্টায় মঙ্গল হোক।
ধন্যবাদ
জয় হিন্দ 
প্রণব মুখার্জি
(সম্প্রতি ক্যাভালরি অফিসার্স এসোসিয়েশন আয়োজিত ক্যাভালরি স্মারক বক্তব্য রাখেন ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি। উপরের লেখাটি তার সেই বক্তব্যের অনুবাদ)

No comments:

Post a Comment