গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশের পোশাক শিল্পে। ফলে
প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের পোশাকের মূল্য সক্ষমতা আগের চেয়ে
কমেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতারা তৈরী পোশাকের
মূল্যও আগের চেয়ে কমিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন পোশাক মালিকরা। গত
সেপ্টেম্বর মাস থেকে সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য কার্যকর করেছে।
তৈরী পোশাক মালিকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই ডলারের বিপরীতে অন্যদেশের
মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলেও টাকাকে শক্তিশালী করে রাখা হয়েছে। তা ছাড়া,
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমায় প্রতিযোগী দেশগুলো সেটি সমন্বয় করেছে।
বাংলাদেশে সেটি তো হয়নি, উল্টো গ্যাস-বিদ্যুতের দাম এক দফা বৃদ্ধি করা
হয়েছে। এতে করে বিদেশী ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকবে। বাংলাদেশ
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশের শিল্প খাতে
নিজস্ব ব্যবস্থায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাসভিত্তিক
ক্যাপটিভ জেনারেটর দিয়ে। ১ থেকে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার এসব
জেনারেটর দিয়ে কম খরচে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যায়। সে জন্য
শিল্পমালিকেরা এই দিকে ঝুঁকেছিলেন। তবে সরকার এখন ক্যাপটিভ জেনারেটরে গ্যাস
দেয়া বন্ধ রেখেছে। গত আগস্ট মাসে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি
ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪ টাকা ১৮ পয়সা থেকে বৃদ্ধি করে ৮ টাকা ৩৬ পয়সা করেছে
সরকার। আর শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের প্রতি ইউনিটের দাম ৫ টাকা ৮৪ পয়সা থেকে
বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬ টাকা ৭৪ পয়সা। অন্যদিকে প্রতি ইউনিট (এক কিলোওয়াট
ঘণ্টা) বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে গয়ে ২.৯৩ শতাংশ। গত ১লা সেপ্টেম্বর থেকে
এই বর্ধিত দর কার্যকর হয়েছে। বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ
সদস্যভুক্ত একটি কারখানা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ কত বাড়ছে, তার
একটি হিসাব কষেছে। সে অনুযায়ী, প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে আগে ৮ টাকা বা ১০
সেন্টের গ্যাস লাগতো। এখন সেটি বেড়ে হয়েছে ২০ সেন্ট। কাপড় উৎপাদনে ক্যাপটিভ
জেনারেটরের বিদ্যুতের পাশাপাশি বয়লারের জন্য গ্যাস লাগে। আগে এক কেজি কাপড়
তৈরি করতে ১৪.৯ সেন্টের গ্যাস লাগত। এখন সেটি বেড়ে হয়েছে ২৭.১৭ সেন্ট।
গ্যাসের দাম বাড়ায় সার্বিকভাবে এখন প্রতি ডজন পোশাকে ৯৫ সেন্ট বাড়তি খরচ
লাগছে। তৈরী পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র এক নেতা বলেন,
ক্যাপটিভ জেনারেটর বস্ত্র খাতের কারখানাগুলোই বেশি ব্যবহার করে। তবে তাদের
কাপড়ের ক্রেতা হচ্ছে তৈরী পোশাক কারখানা। তাই বর্ধিত দাম পোশাক কারখানার
ওপরই এসে পড়বে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়বে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব
কমার্সের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) হিসাব অনুযায়ী, গত
জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বাংলাদেশ
থেকে আমদানি করা পোশাকের মূল্য গড়ে ২.৪৫ শতাংশ কম দিয়েছেন। আর
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ইউরোপীয়
ইউনিয়নভুক্ত দেশের ক্রেতারা ১.৪১ শতাংশ মূল্য কম দিয়েছেন। অন্যদিকে,
সমপ্রতি প্রকাশিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বৈশ্বিক সক্ষমতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সব
সূচকেই ভিয়েতনামের চেয়ে সক্ষমতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিদ্যুতের সরবরাহ মানের
দিক থেকে বাংলাদেশের স্কোর যেখানে ২.৭০, সেখানে ভিয়েতনামের ৪.১। বিজিএমইএ
এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে শিল্পের
উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমেছে। ক্যাপটিভ জেনারেটরে
ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ধাপে ধাপে বাড়ানোর দাবি করেছে বিজিএমইএ। তার আগে
বিটিএমএ-এর নেতারা বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গ্যাসের দাম
যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার দাবি জানান। সংগঠনটির নেতারা প্রতি দুই বছর অনতর
২৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির পরামর্শ দেন। বিজিএমইএ জানায়, গত দু’-তিন বছরে
১২ শতাংশ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বায়ায় সেটি আরও ৩-৪ শতাংশ
বেড়ে যাবে। অথচ গত বছরের চেয়ে ইউরোপের ক্রেতারা এবার কম মূল্য দিচ্ছেন।
কারণ, ডলারের বিপরীতে ইউরোর অবমূল্যায়ন। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০
শতাংশের ওপরই আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment