Tuesday, January 12, 2016

‘ফাঁসির আসামি’ বলে ধরল র‌্যাব, নির্দোষ বলে ছাড়ল পুলিশ by গাজী ফিরোজ

‘ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি’ হিসেবে প্রবাসী এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশে সোপর্দ করেছিল র‌্যাব। যাচাই-বাছাই করে পুলিশ জানাল, প্রকৃত আসামি বিদেশে পলাতক রয়েছেন। র‌্যাব যাঁকে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁর নামে কোনো মামলাই নেই। এ কারণে পুলিশ ওই ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দিয়েছে।
পুলিশ ছেড়ে দেওয়ার পর এখন র‌্যাব বলছে, তিনি (ব্যবসায়ী) যে ফাঁসির আসামি নন, সেটা গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবকে বলেননি। আর ঘটনার শিকার ব্যবসায়ী আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরীর দাবি, তাঁকে হয়রানি করতে র‌্যাবকে দিয়ে কেউ এ কাজ করিয়েছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বিমা কর্মকর্তা নুর খালেক হত্যা মামলায় ‘ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি’ হিসেবে আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরীকে গত রোববার সকালে নগরের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৭। ওই দিন সন্ধ্যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো র‌্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, নুর খালেক হত্যা মামলার পলাতক আসামি আশরাফ হোসেন গ্রেপ্তার এড়াতে আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরী নাম ব্যবহার করে পলাতক ছিলেন। রাত ১২টার দিকে তাঁকে ফটিকছড়ি থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করে র‌্যাব।
কিন্তু আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরী দণ্ডপ্রাপ্ত প্রকৃত আসামি না হওয়ায় গতকাল রোববার বিকেলে ফটিকছড়ি থানা থেকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। দুবাইপ্রবাসী আনোয়ারুল কার্গো বিমানে করে পণ্য পরিবহনের ব্যবসা করেন।
ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মফিজ উদ্দিন গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, নুর খালেক হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া গোলাম মোস্তফা, এই মামলার সাক্ষী মো. নুরু, প্রকৃত আসামি আশরাফ হোসেনের বাড়ির লোকজন, গ্রেপ্তার করা আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরীর পরিবারের সদস্য, ফটিকছড়ি উপজেলার চেয়ারম্যান এম তৌহিদুল আলমের বক্তব্য ও আনোয়ারুলের পাসপোর্ট, বিদ্যালয়ের সনদ, জমির দলিলসহ সাক্ষ্য-প্রমাণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বিদেশে পলাতক রয়েছেন। র‌্যাব আশরাফ হোসেন হিসেবে যাঁকে গ্রেপ্তার করেছে, তিনি ওই আশরাফ নন। তিনি প্রবাসী ব্যবসায়ী আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরী। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এ জন্য তাঁকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তাহলে র‌্যাব কীভাবে গ্রেপ্তার করল, এই প্রশ্নে ওসি মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘র‌্যাবকে সে প্রশ্ন করেন। পুলিশ কীভাবে উত্তর দেবে?’
এ বিষয়ে হাটহাজারী অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মশিউদ্দৌলা রেজা প্রথম আলোকে বলেন, ফটিকছড়ির আজিমপুর এলাকার এম এ কাশেম চৌধুরীর ছেলে আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরী। একই উপজেলার পশ্চিম হাইদ চকিয়া এলাকার আহমদ হোসেন সরকারের ছেলে আশরাফ হোসেন। প্রকৃত আসামি আশরাফ বিদেশে পলাতক রয়েছেন।
ফটিকছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান এম তৌহিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল ফটিকছড়ির কারবালা টিলা এলাকায় নুর খালেককে হত্যা করা হয়। ওই সময় গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তিনি। নুর খালেক ও প্রকৃত আসামি আশরাফ দুজনই একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। দুজনকে চিনতেন জানিয়ে তিনি বলেন, র‌্যাব আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরী নামে যাঁকে গ্রেপ্তার করেছে, তিনি দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আশরাফ নন।
প্রকৃত আসামি আশরাফ হোসেনের বোন শাহিন আক্তার জানান, ২০০৫ সাল থেকে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু র‌্যাব যাঁকে গ্রেপ্তার করেছে, সেই ব্যক্তি তাঁর ভাই নন। শাহিন আক্তারের সহপাঠী ছিলেন ব্যবসায়ী আনোয়ারুল আশরাফ।
থানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরী গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তারের পর ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নয়, র‌্যাবকে বারবার বলা হলেও তারা শোনেনি।
আনোয়ারুল আশরাফের বড় ভাই নুরুল আজিম বলেন, ‘র‌্যাব ভাইকে গ্রেপ্তারের পর ভয়ে র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। রাতে ফটিকছড়ি থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলে পুলিশকে জানাই, আমার ভাই ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নন। পরে পুলিশ যাচাই-বাছাই করে ভাইকে ছেড়ে দেয়।’ তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় তাঁরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। ভবিষ্যতে যাতে কেউ আর এ ধরনের ঘটনার সম্মুখীন না হন, সে দাবি জানান সরকারের কাছে।
ভুল লোককে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-৭-এর উপ-অধিনায়ক শাফায়াত জামিল ফাহিম বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের সামনে থেকে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু আসামি কখনো র‌্যাবকে বলেননি তিনি প্রকৃত আসামি নন। সঠিক নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আনোয়ারুল আশরাফ চৌধুরীর এক আত্মীয় র‌্যাবকে নিশ্চিত করেছিলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
আদালত সূত্র জানায়, শিক্ষকতার চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর নুর খালেক গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের ফটিকছড়ি কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। তাঁর অধীনে চাকরি করতেন আশরাফ। দুর্নীতির দায়ে আশরাফকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এর জের ধরে খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। ২০১৪ সালের ১৯ আগস্ট জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল আসামি আশরাফ হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেন। রায় ঘোষণার এক বছর আগে জামিনে গিয়ে পালিয়ে যান আশরাফ।

No comments:

Post a Comment