Tuesday, February 9, 2016

সম্পদ দুটি মোবাইল, নেপাল শাসন করেন স্বশিক্ষায়

নানা রঙের গোলাপ। লাল, সাদা, কালো, নীল। একটি দেশে নানান ধর্ম, আদিবাসী আর জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। গোলাপ যখন একই, তখন রঙ মূখ্য নয়। তেমনি সব পরিচয় ছাপিয়ে আমরা সর্বপ্রথম মানুষ। নেপালবাসীকে এই দর্শনে গাঁথতে চেয়েছিলেন ভারতে জন্ম নেয়া নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা। তিনি মঙ্গলবার সকালে নেপালের নিজ বাসভবনে মারা গেছেন। মৃত্যুকালে সুশীল কৈরালার বয়স হয়েছিল ৭৮। তিনি নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। এছাড়া ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা করিয়েছেন সুশীল কৈরালা।
চিরকুমার সুশীল কৈরালা বিশ্বাস করতেন সততাই একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি দেশটির সবচেয়ে পুরাতন দল নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন, অথচ তার নেই কোনো একাডেমিক শিক্ষা। স্বশিক্ষায় (সেলফ-এডুকেশন) শিক্ষিত হয়ে হিমালয় কন্যা নেপালকে শাসন করেছেন তিনি।
শুধু তাই নয়, দক্ষ সাংবাদিক ছিলেন সুশীল কৈরালা। দলের মুখপাত্র 'তরুণ'র সম্পাদক ছিলেন। দেশটির গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র নিয়ে বেশ কিছু কলামও লিখেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপালের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে চেষ্টা করেছে পৃথিবীর অনেক দেশ। তবে নেপালের জনগণ গর্বিত তাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালাকে নিয়ে। তিনিই সম্ভবত পৃথিবীর দরিদ্রতম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
সম্পদ বলতে ছিল মাত্র দুটি মোবাইল ফোন। দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত বাসভবনে ওঠার আগে পর্যন্ত তিনি থাকতেন রাজধানী কাঠমান্ডুর এক প্রান্তে একটি ভাড়া বাসায়। তাও আবার তার দল নেপালি কংগ্রেস সে ভাড়া মেটাত।
সাদামাটা জীবন যাপনের জন্য পরিচিত সুশীল কৈরালার ব্যক্তিগত কোনো বাড়ি-ঘর নেই, নেই কোনো জমি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ফরম পূরণে গিয়ে বাধে বিপত্তি। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কৈরালার নিজের কোনো সম্পদ নেই। কোথাও কোনো কোম্পানিতে তার বিনিয়োগও নেই। না আছে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।
স্বর্ণ, রুপা অথবা ব্রৌঞ্জ নেই। নেই অন্যান্য কোনো সম্পদ। বাধ্য হয়ে কৈরালার প্রধান সচিব বসন্ত গৌতম সে সময়ে কোনো সম্পদ নেই বলেই প্রধানমন্ত্রীর দফতরে ফাইল সাবমিট করেন।
বাবা বোধ প্রসাদ কৈরালা ও মা কুমুদিনী দেবী কৈরালার ঘরে ১৯৩৯ সালের ১২ আগস্ট জন্ম নেন সুশীল কৈরালা। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত কৈরালার স্বজনেরাও দেশটিতে বিখ্যাত। মাতৃকা প্রসাদ কৈরালা, গিরিজা প্রসাদ কৈরালা ও বিশ্বেশ্বর প্রসাদ কৈরালার মতো প্রধানমন্ত্রীরাও তার আত্মীয়।
সুশীল কৈরালা ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ভারতের ব্যানারাসে জন্মগ্রহণ করা সুশীল কৈরালা ১৯৫৪ সালে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬০ সাল থেকে ১৬ বছর ভারতে নির্বাসিত ছিলেন তিনি। সেখানে বিমান ছিনতাই মামলায় ১৯৭৩ সালে তিন বছর জেলও খেটেছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাসিত থাকার সময় কৈরালা পার্টির প্রকাশনা ‘তরুণ’-এর সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৯ সালে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন তিনি।
১৯৯৬ সালে পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৯৮ সালে সহ-সভাপতি হন সুশীল কৈরালা। ২০০৮ সালে কংগ্রেসের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন তিনি। ২০১০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নেপালি কংগ্রেসের ১২তম বার্ষিক সম্মেলনে দলটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয় তাকে।
কৈরালার নেতৃত্বে ২০১৩ সালে নেপালের আইনসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয় নেপালি কংগ্রেস। পরে কংগ্রেসের সংসদীয় দলের প্রধান নির্বাচিত হন তিনি।

No comments:

Post a Comment