Saturday, February 27, 2016

চাপে বিএনপির প্রার্থীরা

৪১ ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ ১ জন করে প্রার্থী * জয় পেতে প্রতিপক্ষকে ভয়-ভীতি ও প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য ক্ষমতাসীনদের চাপের মুখে আছেন বিএনপির কিছু প্রার্থী। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও এ চাপ মোকাবেলা করছেন। নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করতে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এ অভিনব কৌশল অবলম্বন করছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মনোনয়পত্র জমা দেয়ার সময় এক দফা বাধার পর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও বিএনপি প্রার্থীদের অনেকেই এখন নতুন ধরনের চাপ মোকাবেলা করছেন।
জানা গেছে, প্রথম ধাপে ৪১টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপক্ষে একজন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এদের মধ্যে ২৮ ইউপিতে বিএনপি এবং ১৩টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীসহ স্বতন্ত্ররা আছেন। এসব ইউনিয়ন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সরিয়ে দিতে পারলে নৌকা প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত হয়। কাজেই এ ধরনের বেশিরভাগ ইউনিয়নে প্রতিপক্ষকে সরে দাঁড়ানোর জন্য নানাভাবে ভয়-ভীতি, হুমকি এবং প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রার্থিতা প্রত্যাহারে চাপ দেয়া অপরাধ। এ ঘটনায় আইনের আশ্রয় নিতে পারেন সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত করতে দলটির বিদ্রোহীদের বসিয়ে দেয়ার চেষ্ঠা চালাচ্ছেন বিএনপির হাইকমান্ড।
বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, ‘বাধা’ উপেক্ষা করে বিএনপির যেসব নেতা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন, এখন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে তাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে জানানোর পরও আমরা প্রতিকার পাইনি। নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারা সরকারের ছকে কাজ করছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, প্রধম ধাপের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২ মার্চ। ২২ মার্চ এসব ইউপিতে ভোট হবে। ইতিমধ্যে ২৫ ইউপিতে অন্য কেউ মনোনয়নপত্র দাখিল না করায় সেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। এছাড়া যাচাই-বাছাইয়ে প্রতিপক্ষের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় আরও ২৫টি ইউপিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা ভোট ছাড়াই জয় পেতে যাচ্ছেন। এখন যে কোনোভাবে এ ৪১ ইউপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সরিয়ে দিতে পারলে বিনা ভোটে ক্ষমতাসীনদের বিজয়ী চেয়ারম্যানের সংখ্যা একশ’র কাছাকাছি পৌঁছাবে। বিএনপি দাবি করেছে, মনোনয়নপত্র জমা দিতে সরকারি দলের বাধা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা যাচাই-বাছাইয়ে বাদ দেয়ায় ৭৩৮টির মধ্যে ১১৪টিতে দলটির কোনো প্রার্থী নেই। ওই সব ইউপিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
মনোনয়নপত্র জমা দেয়ায় বাধা ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারে চাপ দেয়া অপরাধ বলে উল্লেখ করে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি। কে, কোথায় ও কখন এমন করেছে তা জানিয়ে অভিযোগ এলে খতিয়ে দেখা যাবে। এছাড়া নির্বাচনে বাধা বা চাপ দিলে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছেও এ নিয়ে অভিযোগ দিতে পারেন। তারা বিষয়টি দেখবে।
২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপে অনুষ্ঠেয় ৭৩৮ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ৩৯ হাজার ৪৩০ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। তাদের মধ্যে ১৬টি রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছেন ১ হাজার ৯০০। এছাড়া ১ হাজার ৬৬৮ জন স্বতন্ত্র হিসেবে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, যাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী। ২৩ ও ২৪ ফেব্র“য়ারি এসব মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর এখন আপিল আবেদন চলছে।
সাতক্ষীরার দেবহাটার সখিপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ আবু হাসান সাঈদ অভিযোগ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ফারুক হোসেন রতন মনোনয়ন তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, চাইলে কিছু টাকাও দেয়া হবে। কিন্তু প্রার্থী থাকা যাবে না। অন্যথায় দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।’ কলারোয়ার কয়লা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ ইমরান হোসেন জানান, আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি ফিরোজ আহমেদ স্বপন দলের কয়েকজন নেতাকর্মীকে নিয়ে একটি টিম গঠন করে দিয়েছেন। ওই টিমের মাধ্যমে আমাকে চাপ প্রয়োগ করে বলা হচ্ছে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিতে। অন্যথায় জিততে তো দেবই না, অবস্থা খারাপ করে দেয়া হবে। এ উপজেলার লাঙ্গলঝাড়া ইউনিয়নে বিএনপি দলীয় প্রার্থী মাস্টার জাহাঙ্গীর অভিযোগ করেছেন, তার মনোনয়ন তুলে নেয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী। যদিও স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২৮টি ইউপিতে আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীরা। ইউপিগুলো হচ্ছে- ঢাকার দোহারের মোকসেদপুর, সাতক্ষীরার ঝাউডাঙ্গা, শ্যামনগরের পদ্মপুকুর, খুলনার ডুমুরিয়া রঘুনাথপুর, যশোরের মনিরামপুরের খানপুর, মনোহরপুর, বেড়ার কৈটোলা, পিরোজপুরের নেছারাবাদের বলদিয়া, সোহাগদল, স্বরূপকাঠি, মঠবাড়িয়ার বেতমোররা, মংলার মিঠাখালী, সুন্দরবন, রামপালের ভুজপাটিয়া, পেড়িখালী, বাগেরহাটের রাখালগাছি, মোড়েলগঞ্জ, রামচন্দ্রপুর, স্মরণখোলার সাউথখালী, আশুগঞ্জের পশ্চিমতালশহর, বাঞ্ছারামপুরের ছয়ফুল্লাকান্দি, রূপসদী, পাথরঘাটা, বানারীপাড়ার সালিয়াবাকপু, দৌলতখান চরখলিফা, মাদারীপুরের শিবচরের শিবচর, সিরাজদীখানের বালুচর, শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মরিচপুরান। এছাড়া ১১টিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে লড়ছেন একই দলের বিদ্রোহী, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ওই ইউনিয়ন পরিষদগুলো হচ্ছে- কুমিল্লার দেবিদ্বার বড়শালঘর, দাকোপ লাউডোব, তেরখাদা, গোপালপুর, নেত্রকোনার খালিয়াজুরীরর গাজীপুর, মংলার বুড়ির ডাঙ্গা, কচুয়ার ধোপাখালী, গজালিয়া, কচুয়া, রাড়ীপাড়া, বরগুনার বদরখালী, কলারোয়ার জুগীখালী। এছাড়া টুঙ্গীপাড়া কুশলী ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী। খুলনার পাইকগাছা লস্কর ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী।
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার রাড়ীপাড়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী তসলিমা বেগম। একই ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তার ছেলে মেহেদী হাসান। স্বতন্ত্র প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা গেলেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন মা তসলিমা বেগম। এরই মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য বাবা-মা চাপ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন ছেলে মেহেদী হাসান। কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. ইউনুছ মিয়া মাস্টার অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর লোকজন ছোটশালঘর ও ভবানীপুর গ্রামে আমার কর্মীদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে। বিষয়টি আমি পর্যবেক্ষণ করছি। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। উল্টো আমার কর্মীদের হুমকি দেয়া হয়েছে। ওই ঘটনায় থানায় জিডি করেছি।
খুলনার দাকোপের বাজুয়া ইউপিতে তিনজন প্রার্থী। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের রঘুনাথ রায়, বিএনপির মনিরুল ইসলাম খান ও বর্তমান চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র দেবপ্রসাদ গাইন। দেবপ্রসাদ গাইন অভিযোগ করেছেন, তার সমর্থকদের ভয়-ভীতি ও বিভিন্ন মামলায় আসামি করে গ্রেফতারের হুমকি দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। তবে ওই অভিযোগ অস্বীকার করে রঘুনাথ রায় বলেছেন, আওয়ামী লীগের জোয়ার উঠেছে। সুষ্ঠু নির্বাচনে আমি বিজয় হব। এজন্য কোনো প্রার্থীকে ভয়-ভীতি ও হুমকি দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। দাকোপ সদর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সঞ্জয় মোড়ল অভিযোগ করে বলেন, আমার কর্মীদের ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমার পক্ষে প্রচার চালালে কর্মীদের ভিজিপি ও ভিজিএফ কার্ড থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনয় কৃষ্ণ রায় বলেন, এসব অভিযোগ অপপ্রচার। নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

No comments:

Post a Comment