Friday, February 26, 2016

১/১১’র কুশীলবদের বিচার কমিশন গঠন নিয়ে ভাবছে সরকার

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ওয়ান-ইলেভেনে জড়িত সবার ভূমিকা খতিয়ে দেখতে কমিশন গঠন করা হবে কিনা সরকার তা ভেবে দেখবে। বিভিন্ন মহল থেকে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়টি ভেবে দেখা হবে। গতকাল সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘সমসাময়িক গণমাধ্যম’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে যে কমিশনের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে, এটা সরকার শুনেছে, সরকার পরে এটা ভেবেচিন্তে দেখবে। ’৭৫ থেকে ’৮২, জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্যান্টনমেন্টে কসাইখানা বানানোর ঘটনা, এখানেও কমিশনের ব্যাপার রয়েছে। কমিশন করলে একটি কমিশন হতে পারে, সেটা সরকার বিবেচনা করবে। এর ব্যাখ্যায় ইনু বলেন, ’৭৫ থেকে বিভিন্ন সামরিক শাসনকালে যে বিভিন্ন দুষ্কর্ম, মানবাধিকারের লঙ্ঘন, নির্যাতন, অত্যাচার-নির্যাতন, দুর্বৃত্তির ঘটনা ঘটছে তা নিয়ে সামগ্রিক বিবেচনায় শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি রাখে। ওয়ান ইলেভেনে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের ভূমিকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর সমালোচনা সম্পর্কে হাসানুল হক ইনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী অক্ষরে অক্ষরে সত্য কথা বলেছেন। যারা প্রধানমন্ত্রীকে সমালোচনা করছেন তাদের আমি বলবো, প্রধানমন্ত্রী ১/১১ কথা স্মরণ করিয়ে বরং ভালো করেছেন। বাংলাদেশে যাতে কোনো দিন ১/১১ না ঘটে কোনো সম্পাদক যাতে সামরিক কর্তৃপক্ষের গোপন নির্দেশে মিথ্যাচার না করে সেটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। এর মাধ্যমে আমাদের গণমাধ্যমও উপকৃত হবে, রাজনৈতিক অঙ্গনও উপকৃত হবে। তিনি বলেন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ১/১১ সময়কালের ঘটনার বিবরণ মাত্র। এখানে কোনো অত্যুক্তি নেই, বিষোদগার নেই। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা সেই সময়ে সেনাসমর্থিত সরকার কর্তৃক রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী এমনকি গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর যে নির্যাতন হয়রানি হয়েছিল, তারই পরিষ্কার চিত্রটি দেখতে পাই। এখানে কোনো হিংসা-প্রতিহিংসার বিষয় নেই। তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রে একটি সংবাদপত্র বা একজন সম্পাদক বা সাংবাদিক রাজনীতিকদের সমালোচনা করতে পারেন। একজন রাজনীতিক কি সংবাদপত্র বা কোনো সাংবাদিক বা সম্পাদকের  যৌক্তিক সমালোচনা করার অধিকারও রাখেন না? কোনো সম্পাদকের পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ নয়। গণমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার অভিপ্রায় সরকারের নেই। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আইএফজে বা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে সঠিক চিত্র আসেনি মন্তব্য করে হাসানুল হক ইনু বলেন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আইএফজে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে যতটা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন ১৯৭১ সালে যখন সমগ্র বাঙালি জাতির ওপর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা-গণধর্ষণ-যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল, খুনি মোশতাক-জিয়ার সামরিক শাসনামলে যেভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে কবর দেয়া হয়েছিল, ২০০৪ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য জনসভা মঞ্চে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল, ১/১১ পরবর্তীকালে যেভাবে গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পদদলিত করা হয়েছিল তখন তারা ঠিক ততটাই নীরব ছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মানবাধিকারবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ বিজ্ঞাপন না দিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের সতর্ক করা প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার বিজ্ঞাপন দেয়া বা না দেয়ার নির্দেশ দিতে পারে না। এমন কোনো নির্দেশ দেয়াও হয়নি। তবে যদি কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এ কথা সরকারকে জানায় যে তাদের বিজ্ঞাপন দিতে নিষেধ করা হয়েছে তাহলে সেটা আমরা দেখব। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গোয়েন্দাদের সিদ্ধান্ত হতে পারে। এটা কোনো চাপ বলা যাবে না। অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢুকতে পারেন না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক মন্তব্য প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা যা ইচ্ছা বলতে পারে না। অ্যামনেস্টি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অপরাধীদের পক্ষে ওকালতি করছে। টিআইবি প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সংস্থাটি গর্হিত অন্যায় করেছে। টিআইবি সংসদ সম্পর্কে যে ন্যক্কারজনক তথ্য দিয়েছে এবং এর ভিত্তিতে সংসদীয় কমিটি সংস্থাটির নিবন্ধন বাতিলের যে প্রস্তাব করেছে, সরকার তা খতিয়ে দেখছে। অ্যামনেস্টি বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাত, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগগুলোকে বরাবরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসবের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে স্বাধীন গণমাধ্যমকে চাপে রেখে মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত করার ঘটনাগুলো। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গণমাধ্যম নিয়ে মায়াকান্না করছে, এটি একচোখা সংস্থা। যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা খণ্ডিত, বিকৃত এবং সত্যের অপলাপ। সরকার ডেইলি স্টার বা প্রথম আলোর সঙ্গে বৈরী কোনো আচরণ করছে না দাবি করে ইনু বলেন, ওই দুটি পত্রিকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা আন্তরিকভাবে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। এর আগে সংসদেও ১/১১ নিয়ে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, মাহফুজ আনামের কথাকে কেন্দ্র করে পুরো বিষয় স্মরণে এসেছে, নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু একাধিকবার দাবি করেন, গণমাধ্যমের ওপর কোনো চাপ নেই। সরকারে ক্রটিবিচ্যুতি থাকলে আপনারা সমালোচনা করতে পারেন। সরকার সমালোচনা ও পরামর্শকে সাদর আমন্ত্রণ জানায়। দেশের গণমাধ্যম এখন স্মরণকালের সবচেয়ে স্বাধীনতা ভোগ করছে।

No comments:

Post a Comment