যাবেন?
‘হ্যাঁ, কোথায়?’ ..., চলুন। ‘মিটারে যা আসে তার চেয়ে ২০ টাকা বাড়িয়ে দিতে
হবে।’ -এটা এখন সিএনজি অটোরিকশাচালক ও যাত্রীর সাধারণ কথোপকথনে পরিণত হতে
দেখা যাচ্ছে। গতকাল সোমবার সকালে স্কুলশিক্ষক রহমত আলী মিটারের ভাড়ায়
যাওয়ার চেষ্টায় পরপর তিন অটোচালকের কাছে যান। চলে এই একই কথোপকথন। কেউ
মিটারে যেতে রাজি নয়। অগত্যা ২০ টাকা বেশি দেয়ার শর্তেই তিনি চড়ে বসলেন এক
কিশায়। যাবেন ফকিরাপুল। তিনি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় চড়তেই চালু হল মিটার।
তবে তা ভাড়া নির্ধারণের জন্য নয়। রাস্তায় ট্রাফিক বা থানা পুলিশকে ফাঁকি
দেয়ার জন্য। রিকশাটি ফার্মগেট ত্যাগের পর যাত্রীবেশে একটু এগিয়ে কথা হয়
অপেক্ষারত অপর অটোচালক (ঢাকা মেট্রো-থ ১১-৫৫৩৪) আবুল হাসান টিটুর সঙ্গে।
তিনিও মিটারের ভাড়ায় যেতে রাজি নন। চান বেশি ভাড়া।
কারণ, জানতে চাইলে টিটু মানবজমিনকে বলেন, শুধু আমি নই। বেশির ভাগ অটোরিকশাচালকই এখন মিটারের চেয়ে অন্তত ২০ টাকা বেশি ভাড়া নেয়। তা বখশিশও বলতে পারেন। বখশিশের পরিমাণ যাত্রীর ওপর ছেড়ে না দিয়ে এভাবে ধরে-বেঁধে চাওয়া যায় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে চালকরা যাত্রীদের বলতেন, মিটারে যা আসে তার চেয়ে কিছু বেশি দিবেন। তখন যাত্রীরা দুই-পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দিত। ধরুন মিটারে কারও ভাড়া এসেছে ৯৮ টাকা। যাত্রী দিতেন ১০০ টাকা। এজন্য এখন চালকরা গাড়িতে উঠার আগেই ২০ বা ৩০ টাকা বেশি ভাড়া দাবি করছে। অনেকে ৩০ বা ৪০ টাকাও আদায় করছে।
এগিয়ে এসে অপর যাত্রী নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নাজমুল আহসান তানভীর বলেন, এখন প্রায় চালক ২০ থেকে ৪০ টাকা বেশি চাচ্ছে। কিছুদিন পর চাইবে ৫০ টাকা। গত সপ্তাহে আমার কাছে ১২০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা দাবি করেছিল।
তখন ফার্মগেটে দায়িত্বরত ট্রাফিক কর্মকর্তা বশিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পেয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। মোবাইল কোর্টে জেল দেয়া হচ্ছে।
গত রোববার রাত ৯টা। রাজধানীর পান্থপথ মোড়। পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পর রিকশার জন্য অপেক্ষা করেন রোগী মো. দিনার উদ্দিন। সঙ্গে আরও তিন স্বজন। সেখান থেকে যাবেন তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি ফ্লাইওভারের নিচ পর্যন্ত)। প্রথমে একটি প্রাইভেট রিকশাকে সংকেত দেন। মিটার নেই জানিয়ে দাবি করে ১৫০ টাকা। তারপর অপর এক রিকশাকে সংকেত দেয়া হয়। চালক রিকশার গতি কমিয়েই বলেন, মিটারে যা আসে তার চেয়ে ২০ টাকা বেশি দিতে হবে। কারণ, জানতে চাইলে বলেন, শুধু মিটারের ভাড়ায় কেউ যাবে না। আর আপনারা তো কাছেই যাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে সেই শর্তেই চড়ে বসেন তারা। গন্তব্যে পৌঁছার পর মিটারে ভাড়া আসে ৪৮ টাকা। দিতে হয় ৭০ টাকা।
গত সোমবার ভোরে এই প্রতিবেদক ফার্মগেট মোড়ের কাছ থেকে কমলাপুর যাচ্ছিলেন। অপেক্ষামাণ দুই রিকশা ৩০ টাকা বেশি ভাড়া চায়। কারণ, জানতে চাইলে দ্বিতীয়টি ১০ টাকায়। ২০ টাকায় যেতে রাজি হলে তাতে চড়েই রওনা দিতে বাধ্য হন। গন্তব্যে পৌঁছার পর মিটারে ভাড়া আসে ৯৪ টাকা। দিতে হয় ১১৫ টাকা। একই দিন রাতে রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে তেজকুনিপাড়ায় আসতেও ২০ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়।
বিআরটিএ ও রিকশা যাত্রী-চালক-মালিক সূত্র জানায়, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের সাধারণ বাহন হিসেবে পরিচিত তিন চাকার এই যানবাহন নামমাত্র মূল্যে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসে চলাচল করলেও তাতে লাভবান হচ্ছে মালিক ও চালকরাই। রাজধানী ঢাকায় ১৩ হাজার রিকশা মিটারে চলাচল করে। নষ্ট বা চুরির কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও কম। এর বাইরে প্রায় ৬ হাজার প্রাইভেট রিকশার বেশির ভাগই বেআইনিভাবে চুক্তিতে যাত্রী পরিবহন করছে। তাছাড়া ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে আরও অন্তত ৬ হাজার মতো অটোরিকশা রাজধানীতে ঢুকে বেআইনিভাবে চুক্তিতে যাত্রী পরিবহন করছে। কিন্তু গত বছরের ১লা নভেম্বর থেকে রিকশার ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়ানোর পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই এভাবে যাত্রীদের জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এর আগে প্রথম দুই কিলোমিটারের সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৪০ এবং প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৭ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়। যানজটে প্রতিমিনিটের জন্য যাত্রীর ঘাড়ে চাপানো হয় আরও ২ টাকা করে অপেক্ষমাণ বিল। আর তখন চালককে রিকশার মালিকের কাছে দিনে জমা দিতে হতো ৬০০ টাকা। তা এখন ৯০০ টাকা। কিন্তু পাঁচ মাসের ব্যবধানে পাল্টে গেছে ভাড়া হার। গোপনে বাড়ছে জমার হার। রিকশা মালিকরা চালকের কাছ থেকে আদায় করছে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। তাও আবার দুই শিফটে। দিনের শিফটে মালিকরা চালকের কাছ থেকে আদায় করছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত। আর রাতের শিফটে আদায় কারছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। মালিকদের এই বেআইনি বাড়তি ভাড়া যোগানো ও নিজেদের বেশি আয়ের লোভেই চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গত ২০ থেকে ২৮ জানুয়ারি রাজধানীতে পরিচালিত এক জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, মিটারে চলাচলকারী রিকশার ৮১ শতাংশ ২০ টাকা থেকে ৪০ টাকা বেশি ভাড়া আদায় করছে। ৬২ ভাগ রিকশা মিটারের পরিবর্তে চুক্তিতে চলাচল করছে। যাত্রীদের গন্তব্যে চালকরা যেতে রাজি হচ্ছে না ৭৩ ভাগ রিকশা। এছাড়া ৩৮ ভাগ প্রাইভেট এবং ঢাকা, নরায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার রিকশা বেআইনিভাবে ঢাকা মহানগরে প্রবেশ করছে। রাজধানীর ১৯ ব্যস্ততম স্পটে ১ হাজার ৯৩টি রিকশায় যাত্রী সেবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং ১ হাজার ১৬০ জন রিকশা যাত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর এই চিত্র উঠে আসে।
এ দিকে শুধু রাজধানী ঢাকা নয়। চট্টগ্রামসহ সব মহানগর এবং জেলায়ও বাড়তি ভাড়া আদায়ের মহোৎসব চলছে। গত ২০শে মার্চ চট্টগ্রামে সিএনজি চালিত রিকশার উপর সংগঠনটির পরিচালিত এক অনুসন্ধানে আরও খারাপ চিত্র উঠে আসে। ‘সিএনজি রিকশা মিটারে চলাচল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি’ শীর্ষক অনুসন্ধানে ৩৬২ রিকশা মালিক ৩৮৪ জন যাত্রী ও ৩৬২ চালকের মধ্যে জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায় ৯৮ ভাগ চুক্তিতে ও ৮৭ ভাগ ২০ টাকা থেকে ৪০ টাকা বেশি আদায় করছে। যাত্রীর গন্তব্যে যেতে রাজি হচ্ছে না ৮৫ ভাগ রিকশা। এছাড়া ৩৩ ভাগ বহিরাগত গাড়ি মিটার বিহীনভাবে নগরীতে চলাচল করছে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন মানবজমিনকে বলেন, সরকার মালিকের জমা ৯০০ টাকা করলেও মালিকরা অবৈধভাবে দুই শিফটে গাড়ি ভাড়া দিয়ে ১ হাজার ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। মালিকের ওই বাড়তি টাকার জোগান দিতে গিয়ে চালকদেরকে মিটারের চেয়ে বেশি ভাড়া চাইতে হচ্ছে। পরিণতিতে জেল-জরিমানা ভোগ করতে হচ্ছে। ৯০০ টাকার চেয়ে বেশি জমা নিচ্ছে এমন ২ হাজার ৩৮৪ মালিকের বিরুদ্ধে আমরা বিআরটিএতে তিন দফায় অভিযোগ দিয়েও সুফল পাইনি। এমন গাড়ি মালিকের সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।
ঢাকা সিটি সিএনজি রিকশা মালিক সমিতির সভাপতি মো. মোতালেব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আইন ও সংগঠনের নিয়ম না মেনে অন্তত ২০ ভাগ রিকশা মালিক শিফটিং করে ভাড়া দিয়ে বেশি টাকা আদায় করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আমাদের আপত্তি নেই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজ্জাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, তাদের দাবিতে ভাড়া বাড়লেও রিকশার মালিক ও চালকরা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। অতি লোভে তারা ২০ থেকে ৪০ টাকা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। আমাদের প্রস্তাব ছিল চালকের পেছনে ও যাত্রীর সামনের স্থানে বিভিন্ন পয়েন্টের ট্রাফিক পুলিশের মুঠোফোন নম্বর সম্বলিত প্লেট টানাতে। তাতে চালকরা বেশি নিলেও পরবর্তী পয়েন্টে যাত্রীরা সরাসরি অভিযোগ করে প্রতিকার পেতেন। তাছাড়া মাত্রা ৫টি মোবাইল কোর্ট দিয়ে পুরো রাজধানীর এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। মোবাইল কোর্টও বাড়াতে হবে।
কারণ, জানতে চাইলে টিটু মানবজমিনকে বলেন, শুধু আমি নই। বেশির ভাগ অটোরিকশাচালকই এখন মিটারের চেয়ে অন্তত ২০ টাকা বেশি ভাড়া নেয়। তা বখশিশও বলতে পারেন। বখশিশের পরিমাণ যাত্রীর ওপর ছেড়ে না দিয়ে এভাবে ধরে-বেঁধে চাওয়া যায় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে চালকরা যাত্রীদের বলতেন, মিটারে যা আসে তার চেয়ে কিছু বেশি দিবেন। তখন যাত্রীরা দুই-পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দিত। ধরুন মিটারে কারও ভাড়া এসেছে ৯৮ টাকা। যাত্রী দিতেন ১০০ টাকা। এজন্য এখন চালকরা গাড়িতে উঠার আগেই ২০ বা ৩০ টাকা বেশি ভাড়া দাবি করছে। অনেকে ৩০ বা ৪০ টাকাও আদায় করছে।
এগিয়ে এসে অপর যাত্রী নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নাজমুল আহসান তানভীর বলেন, এখন প্রায় চালক ২০ থেকে ৪০ টাকা বেশি চাচ্ছে। কিছুদিন পর চাইবে ৫০ টাকা। গত সপ্তাহে আমার কাছে ১২০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা দাবি করেছিল।
তখন ফার্মগেটে দায়িত্বরত ট্রাফিক কর্মকর্তা বশিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পেয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। মোবাইল কোর্টে জেল দেয়া হচ্ছে।
গত রোববার রাত ৯টা। রাজধানীর পান্থপথ মোড়। পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পর রিকশার জন্য অপেক্ষা করেন রোগী মো. দিনার উদ্দিন। সঙ্গে আরও তিন স্বজন। সেখান থেকে যাবেন তেজকুনি পাড়া (বিজয় সরণি ফ্লাইওভারের নিচ পর্যন্ত)। প্রথমে একটি প্রাইভেট রিকশাকে সংকেত দেন। মিটার নেই জানিয়ে দাবি করে ১৫০ টাকা। তারপর অপর এক রিকশাকে সংকেত দেয়া হয়। চালক রিকশার গতি কমিয়েই বলেন, মিটারে যা আসে তার চেয়ে ২০ টাকা বেশি দিতে হবে। কারণ, জানতে চাইলে বলেন, শুধু মিটারের ভাড়ায় কেউ যাবে না। আর আপনারা তো কাছেই যাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে সেই শর্তেই চড়ে বসেন তারা। গন্তব্যে পৌঁছার পর মিটারে ভাড়া আসে ৪৮ টাকা। দিতে হয় ৭০ টাকা।
গত সোমবার ভোরে এই প্রতিবেদক ফার্মগেট মোড়ের কাছ থেকে কমলাপুর যাচ্ছিলেন। অপেক্ষামাণ দুই রিকশা ৩০ টাকা বেশি ভাড়া চায়। কারণ, জানতে চাইলে দ্বিতীয়টি ১০ টাকায়। ২০ টাকায় যেতে রাজি হলে তাতে চড়েই রওনা দিতে বাধ্য হন। গন্তব্যে পৌঁছার পর মিটারে ভাড়া আসে ৯৪ টাকা। দিতে হয় ১১৫ টাকা। একই দিন রাতে রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে তেজকুনিপাড়ায় আসতেও ২০ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়।
বিআরটিএ ও রিকশা যাত্রী-চালক-মালিক সূত্র জানায়, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের সাধারণ বাহন হিসেবে পরিচিত তিন চাকার এই যানবাহন নামমাত্র মূল্যে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসে চলাচল করলেও তাতে লাভবান হচ্ছে মালিক ও চালকরাই। রাজধানী ঢাকায় ১৩ হাজার রিকশা মিটারে চলাচল করে। নষ্ট বা চুরির কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও কম। এর বাইরে প্রায় ৬ হাজার প্রাইভেট রিকশার বেশির ভাগই বেআইনিভাবে চুক্তিতে যাত্রী পরিবহন করছে। তাছাড়া ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে আরও অন্তত ৬ হাজার মতো অটোরিকশা রাজধানীতে ঢুকে বেআইনিভাবে চুক্তিতে যাত্রী পরিবহন করছে। কিন্তু গত বছরের ১লা নভেম্বর থেকে রিকশার ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়ানোর পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই এভাবে যাত্রীদের জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এর আগে প্রথম দুই কিলোমিটারের সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৪০ এবং প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৭ টাকা ৬৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়। যানজটে প্রতিমিনিটের জন্য যাত্রীর ঘাড়ে চাপানো হয় আরও ২ টাকা করে অপেক্ষমাণ বিল। আর তখন চালককে রিকশার মালিকের কাছে দিনে জমা দিতে হতো ৬০০ টাকা। তা এখন ৯০০ টাকা। কিন্তু পাঁচ মাসের ব্যবধানে পাল্টে গেছে ভাড়া হার। গোপনে বাড়ছে জমার হার। রিকশা মালিকরা চালকের কাছ থেকে আদায় করছে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। তাও আবার দুই শিফটে। দিনের শিফটে মালিকরা চালকের কাছ থেকে আদায় করছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত। আর রাতের শিফটে আদায় কারছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। মালিকদের এই বেআইনি বাড়তি ভাড়া যোগানো ও নিজেদের বেশি আয়ের লোভেই চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গত ২০ থেকে ২৮ জানুয়ারি রাজধানীতে পরিচালিত এক জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, মিটারে চলাচলকারী রিকশার ৮১ শতাংশ ২০ টাকা থেকে ৪০ টাকা বেশি ভাড়া আদায় করছে। ৬২ ভাগ রিকশা মিটারের পরিবর্তে চুক্তিতে চলাচল করছে। যাত্রীদের গন্তব্যে চালকরা যেতে রাজি হচ্ছে না ৭৩ ভাগ রিকশা। এছাড়া ৩৮ ভাগ প্রাইভেট এবং ঢাকা, নরায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার রিকশা বেআইনিভাবে ঢাকা মহানগরে প্রবেশ করছে। রাজধানীর ১৯ ব্যস্ততম স্পটে ১ হাজার ৯৩টি রিকশায় যাত্রী সেবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং ১ হাজার ১৬০ জন রিকশা যাত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর এই চিত্র উঠে আসে।
এ দিকে শুধু রাজধানী ঢাকা নয়। চট্টগ্রামসহ সব মহানগর এবং জেলায়ও বাড়তি ভাড়া আদায়ের মহোৎসব চলছে। গত ২০শে মার্চ চট্টগ্রামে সিএনজি চালিত রিকশার উপর সংগঠনটির পরিচালিত এক অনুসন্ধানে আরও খারাপ চিত্র উঠে আসে। ‘সিএনজি রিকশা মিটারে চলাচল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি’ শীর্ষক অনুসন্ধানে ৩৬২ রিকশা মালিক ৩৮৪ জন যাত্রী ও ৩৬২ চালকের মধ্যে জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায় ৯৮ ভাগ চুক্তিতে ও ৮৭ ভাগ ২০ টাকা থেকে ৪০ টাকা বেশি আদায় করছে। যাত্রীর গন্তব্যে যেতে রাজি হচ্ছে না ৮৫ ভাগ রিকশা। এছাড়া ৩৩ ভাগ বহিরাগত গাড়ি মিটার বিহীনভাবে নগরীতে চলাচল করছে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন মানবজমিনকে বলেন, সরকার মালিকের জমা ৯০০ টাকা করলেও মালিকরা অবৈধভাবে দুই শিফটে গাড়ি ভাড়া দিয়ে ১ হাজার ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। মালিকের ওই বাড়তি টাকার জোগান দিতে গিয়ে চালকদেরকে মিটারের চেয়ে বেশি ভাড়া চাইতে হচ্ছে। পরিণতিতে জেল-জরিমানা ভোগ করতে হচ্ছে। ৯০০ টাকার চেয়ে বেশি জমা নিচ্ছে এমন ২ হাজার ৩৮৪ মালিকের বিরুদ্ধে আমরা বিআরটিএতে তিন দফায় অভিযোগ দিয়েও সুফল পাইনি। এমন গাড়ি মালিকের সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।
ঢাকা সিটি সিএনজি রিকশা মালিক সমিতির সভাপতি মো. মোতালেব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আইন ও সংগঠনের নিয়ম না মেনে অন্তত ২০ ভাগ রিকশা মালিক শিফটিং করে ভাড়া দিয়ে বেশি টাকা আদায় করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আমাদের আপত্তি নেই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজ্জাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, তাদের দাবিতে ভাড়া বাড়লেও রিকশার মালিক ও চালকরা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। অতি লোভে তারা ২০ থেকে ৪০ টাকা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। আমাদের প্রস্তাব ছিল চালকের পেছনে ও যাত্রীর সামনের স্থানে বিভিন্ন পয়েন্টের ট্রাফিক পুলিশের মুঠোফোন নম্বর সম্বলিত প্লেট টানাতে। তাতে চালকরা বেশি নিলেও পরবর্তী পয়েন্টে যাত্রীরা সরাসরি অভিযোগ করে প্রতিকার পেতেন। তাছাড়া মাত্রা ৫টি মোবাইল কোর্ট দিয়ে পুরো রাজধানীর এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। মোবাইল কোর্টও বাড়াতে হবে।

No comments:
Post a Comment