Monday, March 14, 2016

চট্টগ্রামে ৩ মাসে ১০ খুন তদন্তে হিমশিম by মহিউদ্দীন জুয়েল

চট্টগ্রামে গত ৩ মাসে ১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনাই হয়েছে নৃশংসভাবে। হত্যার শিকারদের মধ্যে দু’শিশুও রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে অন্তত পাঁচটি ঘটনায় এখনও ধরা পড়েনি কোনো আসামি। পরকীয়া, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরে বাসায় ঢুকে খুন করা হয়েছে নিহতদের।
চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গত ১৫ই জানুয়ারি মায়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জের ধরে খুন করা হয় মোহাম্মদ মহসিন (৫৫) নামে লাইটারেজ জাহাজের এক ক্যাপ্টেনকে। এই ঘটনায় ধরা পড়েছে আরিফুল ইসলাম নামের এক যুবক। যিনি তার মায়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। একইসঙ্গে খুন করার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
বলেন, বাবার মৃত্যুর পর তার মায়ের সঙ্গে জনৈক মহসিনের অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিষয়টি জানতে পেরে ওই ব্যক্তিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পরে লাশ ১০ টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য জানান, নাজমা বেগমের স্বামী প্রায় ১২ বছর আগে মারা যান। গত ৫-৬ বছর ধরে তার সঙ্গে মহসিনের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। দিনের পর দিন চোখের সামনে অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি দেখে ছেলে আরিফুলের মধ্যে খুনের নেশা জাগে। পরে সে বাসায় আসলে মহসিনকে গলাটিপে খুন করে।
তার আগে গত ৫ই জানুয়ারি ১২ বছর বয়সী আজিম হোসেন নামের এক শিশুকে গলাকেটে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনায় এক প্রতিবেশিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নগরীর বায়েজীদ থানার শেরশাহ বাংলা বাজারের গুলশান আবাসিক এলাকার দিদার কলোনিতে ঘটে এই নৃশংস ঘটনা।
হত্যা করা শিশুটি ৫ম শ্রেণিতে পড়তো। তার বাবা একজন সবজি বিক্রেতা। মা বায়েজীদ এলাকার একটি গার্মেন্টে চাকরি করতো। বাসা থেকে আজিম নিজের স্কুল শেরশাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকে। তার আগে শিশুটির মা ও বাবা দুইজনেই একই সময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
পরে দুপুর ১২টায় তারা কর্মস্থল থেকে এসে দেখেন বাসার একটি কক্ষে আজিমের গলাকাটা লাশ। বিছানার ওপর তার রক্তাক্ত দেহ। মেঝেতে পায়ের ছাপ। খবর পেয়ে প্রতিবেশিরা বায়েজীদ থানায় ফোন করেন। পরে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে। জানা যায়, বাবা-মার সঙ্গে শত্রুতা থাকার কারণে প্রতিবেশি এক মহিলা তাকে ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যা করেছে।
গত ২রা মার্চ রাতে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানার ফিরিঙ্গি বাজার এয়াকুব নগর এলাকায় রাতে পরকীয়ার জের ধরে স্ত্রী ও খালুকে হত্যা করে হৃদয় নামের এক যুবক। বর্তমানে সে পলাতক রয়েছে। হৃদয় খুন হওয়া স্ত্রী আসমার স্বামী। এই ঘটনায় হৃদয়কে আসামি করে সন্ধ্যায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, পলাতক স্বামী হৃদয়ের গ্রামের বাড়ি সিলেটের হবিগঞ্জের বানিয়াচং এলাকায়। অন্যদিকে নিহত মাকসুদ ফিরিঙ্গি বাজার এলাকায় একটি মোবাইলের দোকানে কাজ করতেন। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে।
অনৈতিক সম্পর্কের সূত্র ধরে চট্টগ্রামের
ফিরিঙ্গি বাজারে খালু ও স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা
স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রী ও খালু অবৈধভাবে মেলামেশা করার জন্য হৃদয়কে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পাঠায়। কিন্তু সেখানে পার্সপোট না থাকায় ধরা পড়ে দেশে ফিরে আসে সে। ফিরে আসার পর খালু মাকসুদুর রহমানের মেয়ে সানজিদার মুখে জানতে পারে তার স্ত্রী আসমার সঙ্গে পরকীয়ার কথা। এই কথা শুনে সে সহ্য করতে না পেরে ক্ষোভ থেকে খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে।
নগরীর কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক তদন্ত নূর হোসেন মানবজমিনকে বলেন, হৃদয়কে খালু মাকসুদ ও স্ত্রী আসমা মিলে অবৈধভাবে বিদেশে পাঠায়। মালয়েশিয়া যাওয়ার পর সেখান থেকে সে কিছুদিন আগে দেশে আসে। এই কারণটি তার মনে ক্ষোভ হিসেবে ছিল।
তিনি আরও বলেন, ঘাতক হৃদয়ের পুরো নাম রফিকুল ইসলাম। তাকে ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। তার মোবাইল ট্র্যাক করা হচ্ছে। সে চট্টগ্রামেই আছে বলে দেখা যাচ্ছে। হয়তো খুনের পর মোবাইল ফেলে দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে।
গত ৬ই মার্চ চট্টগ্রামের বায়েজীদে পারভীন আক্তার নামে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে বাসায় ঢুকে হত্যার ঘটনায় তার ভাসুরের ছেলেকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এই ঘটনায় তার ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়ার কথা বলেছেন বায়েজীদ থানা পুলিশ।
থানার ওসি জানান, গ্রেপ্তার যুবকের নাম আবদুল্লাহ আল মামুন। এই ঘটনায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয় ঘটনার পর পরই। এর আগে পারভীন আক্তারের স্বামী দুবাই থেকে দেশে ফিরে অজ্ঞাত ৩ জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন। বায়েজীদ থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ৩ যুবক পারভীন আক্তারকে বাসায় ঢুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী তার শিশু পুত্র সাঈদ আমাদের জানিয়েছে। আমরা ওই ভবনে থাকা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি দেখে তা তদন্ত করছি।
মায়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জের ধরে
মোহাম্মদ মহসিন (৫৫) নামে লাইটারেজ
জাহাজের এক ক্যাপ্টেনকে  শ্বাসরোধ করে
হত্যা করা হয়েছে। পরে লাশ ১০ টুকরা করে
নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল আরিফুল ইসলাম (১৯)
নামের এক যুবক। ঘটনার তিন সপ্তাহ পর
অভিযুক্ত আরিফুলকে গ্রেফতার করে চট্টগ্রাম
মহানগর পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলনে এ
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ও নেপথ্য কারণ জানায়।
পারিবারিক সূত্র জানায়, নগরীর বায়েজীদ বোস্তামি এলাকার কোঅপারেটিভ হাউজিং সোসাইটিতে রাতে বাসায় ঢুকে প্রবাসী নুরুল আলমের স্ত্রী পারভীন আক্তার (৩৮) কে খুন করে ৩ যুবক। এই সময় তারা তার ১২ বছরের শিশুকেও বাথরুমে নিয়ে গলাটিপে হত্যার চেষ্টা করে।
সেখানকার ১৩ নম্বর সড়কের ৩৮ নম্বর প্লটের খাতুন ভিলার তিন তলায় থাকতেন পারভীন। ওই বাড়ির বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট তার নিজের স্বামীর। বাকিগুলোর মালিক তার ভাসুর। ছয়তলা বিল্ডিংয়ের মালিকানা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে এই ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা পুলিশের। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা দাবি করছে তা ডাকাতি।
তবে কেবল এসব হত্যাকাণ্ডই নয়, তদন্তে থাকা আরও যেসব খুনের ঘটনা রয়েছে তার মধ্যে হলো গত ১৪ই জানুয়ারি কোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে নগরীর পাঁচলাইশে এক ব্যক্তিকে খুনের ঘটনা অন্যতম। এ ছাড়া গত ১০ই মার্চ রাতে ৫ তলা ভবনের ছাদ থেকে বুলবুলি নামের এক শিশুর নিচে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়েও চলছে পুলিশি তদন্ত। তবে কোনো ঘটনারই সুরাহা হয়নি বলে জানা গেছে।

No comments:

Post a Comment