Wednesday, March 23, 2016

কালো মানিকজোড় by আনম আমিনুর রহমান

রাজশাহীর নবগঙ্গার কাছাকাছি একটি চরে কালো মানিকজোড়।
গত ২৯ জানুয়ারি তোলা ছবি
বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে সদলবলে রাজশাহী গেছি। পুলিশ লাইনের কাছে পদ্মাপাড়ের বটতলার ঘাট থেকে নৌকায় উঠলাম। বুলনপুর, হারুপুর ও নবগঙ্গা পার হয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে চলে গেলাম। ঘণ্টা দেড়েক লাগল। পথে ১০-১২টি ধূপনি বক ও ২৫-৩০টি বড় পানকৌড়ি চোখে পড়ল। তবে এসব পাখির মেলায় ঢেঙ্গা পাওয়ালা যে পাখিটিকে খুঁজছিলাম, ওর টিকিটিও দেখলাম না।
এবার ফেরার পালা। সবাই ক্লান্ত। আমি বাইনোকুলার হাতে নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সাদা-কালো কিছু একটা দেখলাম মনে হলো। মাঝিকে নৌকা ঘুরিয়ে পেছনে নিতে বললাম। একটি বড় পানকৌড়ির পাশে লম্বা সাদা গলার সাপ পাখি দাঁড়িয়ে ছিল, মুহূর্তে উড়াল দিল। উড়ন্ত সাপ পাখির পেছনে ঢেঙ্গা পায়ের কালো পাখিটি নজরে এল। কিন্তু একি! যে ঢেঙ্গা পাওয়ালা পাখিকে খুঁজছি, এ তো সে নয়! এর কথা তো চিন্তাও করিনি! কালো এই পাখিটিকে এর আগে ইউরোপে দেখেছিলাম ২০১০ সালে। জানামতে, ২০০৫ সালের পর থেকে ফি বছর পঞ্চগড় থেকে রাজশাহী পর্যন্ত নদী ও চরাঞ্চলে স্বল্পসংখ্যায় এদের দেখা গেছে। এবারের শীতে নভেম্বর ২০১৫-তে পঞ্চগড়ে প্রথম এদের দেখা যায়। রাজশাহীতে আমার আগে জানুয়ারি ২০১৬-এর প্রথম দিনই রাজশাহী বার্ড ক্লাবের সদস্যরা এদের দেখেন।
লাল লম্বা ঠোঁট-পা ও কালো দেহের বড় আকারের এ পাখিটি হলো এ দেশের এক অতি বিরল সারস পাখি, কালো মানিকজোড় (Black Stork)। কালাজাং নামেও পরিচিত। Ciconiidae গোত্রের এই পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Ciconia nigra।
কালো মানিকজোড়ের দৈর্ঘ্য ৯০-১০০ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ১৪৪-১৫৫ সেন্টিমিটার, উচ্চতা ১০২ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৩ কেজি। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও পুরুষ আকারে বড়। মাথা, গলা, ঘাড়, বুকের ওপরের অংশ, পিঠ, ডানা ও লেজ ধাতব কালো। বুকের পালকগুলো বেশ বড়। চোখের চারদিকের পালকবিহীন অংশ ও ঠোঁট আলতা-লাল। পা ও পায়ের পাতা প্রবাল-লাল। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির বুকসহ দেহের ওপরটা কালচে বাদামি, ফ্যাকাশে ও নিষ্প্রভ। ঠোঁট ও পা ফ্যাকাশে জলপাই-সবুজ।
কালো মানিকজোড় অনিয়মিত পরিযায়ী পাখি। কালেভদ্রে রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রামের নদীতীর, হ্রদ ও জলাশয়ে বিচরণ করে। ধীরে ডানা নেড়ে আকাশে উড়ে বেড়ায়। সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে দেখা মেলে। তবে পদ্মার চরে আমি একাকী চরতে দেখেছি। এরা জলময় কাদায় হেঁটে হেঁটে ঠোঁট চালিয়ে খাবার খোঁজে। চিংড়ি ও মাছ মূল খাবার। তবে কীটপতঙ্গ, ব্যাঙ, ছোট সাপ, শামুকেও অরুচি নেই। এক পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেয় ও ঘুমায়। কর্কশ গলায় ‘ক্যাঁচর-ক্যাঁচর’ স্বরে ডাকে।
এপ্রিল-মে প্রজননকাল। এ সময় নিজের এলাকায় উঁচু গাছের মগডালে বা খাড়া পাহাড়ের উঁচুতে ডালপালা দিয়ে বাসা বানায়। ডালপালার ওপর মাটি দিয়ে তাতে শৈবাল, ঘাস ও লতাপাতার গদি তৈরি করে। স্ত্রী ৩ থেকে ৫টি সাদা ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ৩২ থেকে ৩৮ দিনে। বাচ্চারা ৬৩ থেকে ৭১ দিনে উড়তে শেখে এবং ৩ থেকে ৫ বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। বুনো পরিবেশে অন্তত ১৮ বছর ও আবদ্ধাবস্থায় সর্বোচ্চ ৩১ বছর বেঁচে থাকার রেকর্ড আছে।

No comments:

Post a Comment