Sunday, March 13, 2016

চিকিৎসক হতে চাননি প্রাণ গোপাল দত্ত by আবদুল আলীম

মাঝারি আকারের চেম্বার। দুই পাশে সিরিয়ালে রোগীদের বসার অতি সাধারণ জোড়া চেয়ার। এক পাশে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। চেম্বারের বাকি পাশটাতে বিশ্রামাগার। সেখানে তিন দিকে সেলফে রয়েছে গাদাগাদা বই। ভেতরে জায়গা না হওয়ায় অসংখ্য বই সেলফের ওপর ও বিছানার ওপরেও রাখা। কিছু বই এমন এলোমেলো যেন কিছুক্ষণ আগে পড়া হয়েছে। বিশ্রামাগারের উত্তর পাশে একটি কম্পিউটার। এই হলো অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের চেম্বারের খণ্ডচিত্র।
অত্যন্ত সাদাসিধা জীবনের অধিকারী এ বিখ্যাত মানুষটির খ্যাতি রয়েছে চিকিৎসা, অধ্যাপনা জীবন ও ব্যক্তি জীবনেরও। টানা দুবার (২০০৯-২০১৫) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর থাকা এ চিকিৎসক মনে করেন, বর্তমান সময়ের অধিকাংশ চিকিৎসক লক্ষ্যচ্যুত। তাদের আগে মানুষ হতে হবে। রোগীদের মনে করতে হবে দেবতা। হাসপাতালকে ভাবতে হবে উপাসনালয়ের মতো পবিত্র স্থান। তাহলে এ জাতি দিয়ে কিছু করা যেতে পারে।
রাজধানীর গ্রীন রোডের গ্রীন লাইফ হাসপাতালের ৪ তলার চেম্বারে গিয়ে দেখা যায় অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্তের ব্যস্ততম জীবনাচরণ। তার কাছে আসা রোগীদের মধ্যে শিশুদের সঙ্গেও অত্যন্ত কোমল আচরণ করেন। কিছুক্ষণ রোগী দেখার ধরন দেখে অনুমান করা যায় চিকিৎসার ক্ষেত্রে শিশুদের ভয় কাটাতেও পারদর্শী তিনি। সবার সঙ্গে আচরণও করেন অত্যন্ত সাদাসিধা। মুহূর্তেই কাছে টেনে নিতে পারেন যে কোন ধর্ম-বর্ণের লোককে। তিনি জানান, ১৯৫৩ সালের ১লা অক্টোবর কুমিল্লার চান্দিনার মহিচাইল গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দিনটা ছিল রোববার সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট। পিতা কালাচান দত্ত ছিলেন দাদার বড় ছেলে। দাদা অশ্বিনীকুমার দত্ত সে আমলে পাস করা ডাক্তার থাকায় তাদের বাড়িটা ডাক্তার বাড়ি নামেই পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের বাড়িতে সকলের পড়ালেখার হাতেখড়ি হতো সরস্বতী পুজোর দিনে। বিদ্যাদেবীর পুজো শেষে ঠাকুর মশাই হাতে ধরে স্লেটে ‘অ’ লিখে দিতেন। সঙ্গে কিছু মন্ত্রপাঠও হতো। সেই হিসেবে বাড়িতেই তার পড়ালেখায় হাতেখড়ি হয়। তিনি বলেন, ১৯৬০ সালে প্রাথমিকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এবং ১৯৬৩ সালে মহিচাইল হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। তিন বছর পর ১৯৬৬ সালে চান্দিনা পাইলট হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন বিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৬৮ সালে ৫ বিষয়ে লেটারসহ স্টার মার্ক নিয়ে মেট্রিক পাস করেন। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে ইন্টার পাস করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৭৬ সালে এমবিবিএস শেষ করেন। ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল ছাড়াও পড়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন, ম্যানচেস্টার ও জার্মানিতে।
খ্যাতিমান এ চিকিৎসক অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারকে চিঠি লিখতেন। দেখা হয়েছিল সেই সরকারের প্রধানদের সঙ্গেও। তিনি বলেন, অক্টোবর মাসে শেখ ফজলুল হক মণি ভাইয়ের সঙ্গে কলকাতা যাই। সেখানে গিয়ে যে বাড়িতে উঠি, সেটা তোফায়েল ভাইয়ের বাসা। ওখানে তার ছদ্মনাম ছিল তপন দা। অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জননেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম তখন কলকাতায়। তার কাছে গেলে মণি ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার চিঠিগুলো কার হাতের লেখা? তিনি আমাকে দেখিয়ে দিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্যার বললেন, তাহলে ওকে রেখে যাও। সেখানে যে কয়দিন ছিলাম সে কয়দিন ডিকশনারি দেখে বিভিন্ন দলিলপত্র লিখতাম। পরে মণি ভাই এলে তাকে চেপে ধরে বললাম আমাকে নিয়ে যেতে। সৈয়দ নজরুল স্যারের যে ইংরেজি জ্ঞান আমার পক্ষে তার সঙ্গে কাজ করাটা কষ্টসাধ্য ছিল।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের আন্দোলনের সময় দেখেছেন সব আন্দোলনেরই কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাই তারও ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে পড়বেন, গবেষণা করবেন। পড়া শেষে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য এমন কিছু নেই যা তিনি করেননি। পিতা ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির জন্য টাকা দিয়ে গেলেও পরে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে ভর্তি হয়ে বাড়ি চলে যান। বাড়ি গেলে পিতার বকাবকিতে দিশাহারা অবস্থা। শেষ পর্যন্ত পিতাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে এবং পিতার জেদের কাছে পরাস্ত হয়ে ডাক্তারিতেই ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে।
প্রাণ গোপাল দত্ত ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৩য় বর্ষে পড়াকালে পরিচয় হয় ১ম বর্ষের ছাত্রী জয়শ্রী রায় জয়ার সঙ্গে। পরিচয় সূত্রে আলাপ, পড়ার বিষয়ে শেয়ারিংয়ের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে চলে। ১৯৭৯ সালের ১৮ই জুন সম্পর্ক প্রণয়ে পরিণত হয়। ডা. জয়শ্রী রায় জয়া গাইনি বিশেষজ্ঞ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন বছর আগেই স্বামীর অনুরোধে অবসর গ্রহণ করেন। দাম্পত্য জীবনে ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত ও ডা. জয়শ্রীর রয়েছে দুই ছেলেমেয়ে। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের প্রথম সন্তান অনিন্দিতা দত্তের জন্ম হয়। তিনি দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ কলেজ থেকে রেডিওলজি বিভাগ থেকে পাস করেছেন। এখন গ্রীন লাইফ হাসপাতালেই রেডিওলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ডা. পার্থ প্রতিম দাশের সঙ্গে। তার ছেলে অরিন্দম দত্ত আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে এ লেভেল করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে ডা. প্রাণ গোপাল বলেন, বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ডাক্তার লক্ষ্যচ্যুত। এ জাতি দিয়ে কিছু হবে না। তিনি বলেন, ডাক্তারদের প্রথমে মানুষ হতে হবে। মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হবে। রোগীদের সবসময় অতিথি অথবা দেবতা ভাবতে হবে। যে হাসপাতালে কাজ করেন সেই হাসপাতালকে ডাক্তারদের মন্দির বা উপাসনালয়ের মতো পবিত্র ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে ডাক্তার নিজে একজন সেবক। রোগী হলো সেখানের উপাসক। হাসপাতাল হলো উপাসনালয়ের মতো পবিত্র স্থান।
স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত প্রথিতযশা এ চিকিৎসক ১৯৯০ সাল থেকে প্রাধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিকিৎসা করছেন। তিনি বলেন, তবে আমি প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল ডাক্তার না। তার কোনো সমস্যা হলে আমাকে ডাকেন। এছাড়া, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদেরও চিকিৎসা করেছেন তিনি। চিকিৎসা করেছেন বিএনপি নেতা এম কে আনোয়ার ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে। চিকিৎসা দিয়েছেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানকেও।
অত্যন্ত সাদাসিধা জীবনের অধিকারী এ বিখ্যাত চিকিৎসক স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শিক্ষা জীবনের পুরো সময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করলেও সেটা কখনও পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। তিনি বলেন, ষাটের দশকে চান্দিনা স্কুলে যখন ভর্তি হই তখন দেশের পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। আর কিছুকালের মধ্যেই দেশটা স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এটা বুঝিনি। কিন্তু এলাকার যেসব বড় ভাইয়েরা আওয়ামী লীগ বা বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা এটা বলতেন। আমরা শুনতাম, আন্দোলিত হতাম। তখনও গ্রামাঞ্চলে বঙ্গবন্ধুকে শেখ সাহেব বলেই ডাকা হতো। এখনও গ্রামের মানুষ তাকে এই নামেই ডাকে। আমরা তখন বড়দের বলতে শুনতাম এবং নিজেরা বলতাম শেখ সাহেব এখন ধাক্কা দিলে এখনই পাকিস্তান সরকার পড়ে যাবে। পুরো দেশ অচল হয়ে যাবে। বাস্তবে কিন্তু একাত্তরে তাই ঘটলো। তিনি বলেন, আমার বন্ধুরা ছাত্র ইউনিয়ন করতো। কিন্তু আমি কিভাবে যেন গোড়া থেকেই ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। চান্দিনায় মেট্রিক পড়ালেখার সময় থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে আমার উঠাবসা শুরু।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার দাদু বুঝিয়েছিলেন এখানে থাকলে অকালে মারা পড়তে হতে পারে। পরে বাবা বললেন ত্রিপুরায় চলে যেতে। সেখানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কোনো একটা কাজে লেগে যেতে। বাবার নির্দেশ মতো তার বড় ভাই ও ছোট কাকাসহ ত্রিপুরার উদ্দেশ্যে রওনা হই। পরে সেখানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিই। সেখানে এসডিও হিলসের নিচে গোপাল চৌকিদারের বাড়িটা ভাড়া নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেয়া হতো।
তিনি বলেন, ত্রিপুরার সোনামুড়ার ওই ভাড়া বাড়িতে রেজা ভাইদের তত্ত্বাবধানে থাকাকালে আমাদের টাকা-পায়সার ব্যাপক সঙ্কট পড়ে। তখন আমি আরেকজনকে সঙ্গ নিয়ে রওনা দিলাম আমাদের বাড়িতে। বাড়িতে এসে বাবাকে বললে হাজার খানেক টাকা যোগাড় করে দিলেন। ফিরে যাওয়ার সময় মনে হলো চান্দিনায় একটা সোনালী ব্যাংক আছে। সেখানে তো টাকা থাকার কথা। ব্যাংকের ম্যানেজার ইয়াকুব সাহেব আওয়ামী লীগ করতেন। যেই ভাবা সেই কাজ। চলে গেলাম তার কাছে। তিনি বললেন, একটা কাজ করো। রাতে এসে তোমরা দরজা-জানালাগুলো ভেঙে ফেলবা। আমি লকার খোলা রেখে যাবো। রাতে আমরা যখন হামলা চালালাম তখনও তিনি সঙ্গে ছিলেন। দেখিয়ে দিলেন কি কি ভাঙতে হবে। সেখান থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো পেয়েছিলাম। যুদ্ধের সময় পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের কমান্ডার প্রধান ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি। আবার তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। আমরা তার নেতৃত্বেই যুদ্ধ করেছি।

No comments:

Post a Comment