![]() |
| বিয়ন লোমবোর্গ |
উন্নয়ন
নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার
লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির
পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে
সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ
প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো ষষ্ঠটি। উত্তরবঙ্গের
গ্রামাঞ্চলে নিষ্ফলা শরৎ ঋতু বছরের সবচেয়ে কঠিন সময়, বিশেষ করে বৃহত্তর
রংপুরে; যেখানে ১ কোটি ৫৮ লাখ অধিবাসীর প্রায় অর্ধেকের মতো দারিদ্র্যসীমার
নিচে বসবাস করে। রংপুরের দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকেরা সাধারণত আশপাশের এলাকার
জমিগুলোতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে, যখন জমির ফসল
পরিপক্ব হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, তখন তাঁদের করার মতো কোনো কাজই থাকে
না। আর তাঁরা কোনো কাজ পেলেও মজুরি খুব কম এবং একই সময়ে খাদ্যও হয়ে পড়ে
অপ্রতুল। কারণ, ফসল ঘরে তোলার সময় আসতে তখনো বেশ কয়েক মাস বাকি। তাই চালের
দামও বেড়ে যায়। কম মজুরি এবং উচ্চ খাদ্যমূল্য—মূলত এ দুটি কারণে দরিদ্র
পরিবারগুলোকে কোনো না কোনো বেলা না খেয়ে থাকতে হয় এবং তাদের খাবারের
বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমান দুই–ই কমে যায়। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের জন্য এই
পরিস্থিতি বিশেষভাবে ক্ষতিকর। এতে করে তাঁদের দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক এবং
বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা থাকে। নিষ্ফলা মৌসুমে গ্রামীণ
কৃষকদের সাহায্য করার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় কী? এটি অনেক প্রশ্নের মধ্যে
একটি, যা ‘বাংলাদেশ প্রায়োরিটিজ’ উত্তর দিতে পারবে। উল্লেখ্য, বেসরকারি
সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের সহযোগিতায় কোপেনহেগেন কনসেনসাস
সেন্টার গবেষণা ও পরামর্শ–বিষয়ক প্রকল্প বাংলাদেশ প্রায়োরিটিজ গঠন করে। এই
প্রকল্প কীভাবে বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত কল্যাণসাধন হবে,
সে ব্যাপারে গবেষণা করে পরামর্শ দিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো
নীতিমালা তৈরিতে সহায়তার ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রায়োরিটিজ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সৌভাগ্যবশত, একটি কৌশল আছে যেটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মঙ্গার মৌসুমে
ভূমিহীন দরিদ্রদের সহায়তা করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইয়েল
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মুশফিক মোবারক এবং এভিডেন্স অ্যাকশনের পোস্ট
ডক্টরাল আগা আলী আকরাম তাঁদের করা নতুন গবেষণায় পরামর্শ দিয়েছেন, মঙ্গার
সময় গ্রাম থেকে লোকজনকে শহরে নিয়ে কাজ দিলে দরিদ্র পরিবারগুলো বেঁচে যেতে
পারে। এসব কার্যক্রমের পেছনে ব্যয় করলে ব্যয়িত প্রতিটি টাকা চার টাকার
সমপরিমাণ সামাজিক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশের শহরগুলো গ্রামের মতো
মৌসুমি মন্দার শিকার হয় না। তাই শহরগুলো নিষ্ফলা মৌসুমে দরিদ্র ভূমিহীনদের
জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র লোকজন রিকশা
চালানো থেকে শুরু করে নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতে পারেন। এই বিশ্লেষণটি
১০০টিরও বেশি বাংলাদেশি গ্রামে ছয় বছরব্যাপী গবেষণার ওপর ভিত্তি করে করা
হয়েছে। প্রথমে কয়েকটি গ্রাম বেছে নেওয়া হয়। এসব গ্রামের কয়েকটি পরিবারকে
কাজের জন্য শহরে যেতে ১ হাজার টাকা বাস ভাড়া এবং কয়েক বেলার খাবার দেওয়া
হয়। পক্ষান্তরে অন্য কয়েকটি পরিবারকে মৌসুমি কাজের সুযোগ সম্পর্কে শুধু
তথ্য দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো টাকাকড়ি দেওয়া হয়নি। পরে দেখা গেছে, যেসব
পরিবার শুধু তথ্য পেয়েছিল, তাদের মধ্যে থেকে অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ শহরে
গিয়েছিল। কিন্তু নিষ্ফলা মৌসুমে বাসের একটি টিকিটের জন্য পাওয়া ভাতা থেকে
যে সুফল এসেছিল, তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থনীতিবিদেরা গবেষণায় দেখেছেন, এই
প্রকল্পের মাধ্যমে যদি কাজের জন্য শহরে যেতে পরিবারপিছু ২ হাজার ৭০০ টাকার
মতো ব্যয় করা হয়, তাহলে তা প্রতিটি পরিবারের জন্য ১০ হাজার ৯০০ টাকার বেশি
অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক কল্যাণ বয়ে আনে। ভাতা পাওয়া যেসব পরিবার
থেকে একজন সদস্য শহরে গিয়েছিলেন, সেসব পরিবারের প্রতিটির দৈনিক খাবার ৬০০
ক্যালরিতে উন্নীত হয়েছিল এবং এরা দৈনিক দু-তিন বেলা করে খাবার খেতে
পেরেছিল। এই পরিবারগুলো মুরগি ও ডালের মতো প্রোটিনের উৎসেও বেশি অর্থ ব্যয়
করেছিল। তাই তারা শুধু বেশি পরিমাণে খায়ইনি, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো এবং
স্বাস্থ্যকর খাবারও পেয়েছিল। সেই সঙ্গে কিছু পরিবারের আয় প্রায় ৮৬ শতাংশ
পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ ছাড়া এর দীর্ঘমেয়াদি কিছু সুফলও রয়েছে। যেমন
শহুরে নিয়োগকারীদের সঙ্গে শ্রমিকদের দীর্ঘস্থায়ী একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠার
সুযোগ সৃষ্টি হওয়া, যা ভবিষ্যতে তাঁদের শহরে যাওয়ার পথকে আরও প্রশস্ত করে।
আর এই ভাতা কর্মসূচির আওতায় সেসব পরিবার থেকে অনেক সদস্য শহরে গিয়েছিলেন।
এটি শুধু তাদের সাহায্যই করেনি, সেই সঙ্গে এটি তাদের পরিবারের কোনো সদস্য
শহরে যাবেন কি না, তার সম্ভাবনাকে ২২ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে
দিয়েছিল। এ কর্মসূচিটি যদি বড় আকারে করা হয়, তাহলে কী প্রভাব পড়বে, সে
বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করছেন। ২ লাখ ৫০ হাজার পরিবারকে যদি মঙ্গার সময়
শহরে যাওয়ার জন্য ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে তার ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
ড. বিয়ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
ড. বিয়ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

No comments:
Post a Comment