Friday, April 22, 2016

তৈরি পোশাক খাতে নেয়া পদক্ষেপ সন্তোষজনক- টিআইবি

রানা প্লাজা ধসের পর তৈরি পোশাক খাতে উন্নয়নের জন্য নেয়া পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়নে সন্তোষজনক ও যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তবে ওই ভবন ধসের মামলায় অপরাধীদের বিচারকাজ ধীরগতিতে চলছে বলে উল্লেখ করা হয়। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডির নিজস্ব কার্যালয়ে ‘তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন: অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। অনুষ্ঠানে গবেষণা পরিকল্পনা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন মনজুর ই খোদা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান এবং সহকারী প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা।
গবেষণা প্রতিবেদন উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ২০১৫ ও ২০১৬ সালে নেয়া ৬৮টি উদ্যোগের মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে ৪২টি। তবে কারখানায় অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ বিধিমালা কার্যকর, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, পোশাকপল্লী স্থাপনসহ বেশ কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, কারখানার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এবং অগ্নিনির্বাপণের ক্ষেত্রে কারিগরি অগ্রগতি হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, এটা নিয়ে প্রশ্ন আমরা সবাই উত্থাপন করতে পারি। তবে প্রভাবমুক্ত পরিবেশে যাতে কার্যক্রম চলতে পারে, সেটা হবে অবশ্যই আইনি কাঠামোর ভেতরে, সে বিষয়টি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন বছরে কারখানা নিরাপত্তাজনিত গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে ৪১ শতাংশ, সন্তষজনক অগ্রগতি হয়েছে ৩৬ শতাংশ, ধীর অগ্রগতি হয়েছে ১০ শতাংশ এবং স্থবির রয়েছে ১৩ শতাংশ। এছাড়া রানা প্লাজা ধসের পর বিভিন্ন অংশীজনের নেয়া ১০২টি উদ্যোগের মধ্যে ৭৭ শতাংশ বাস্তবায়ন ও সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে। বাকি ২৩ শতাংশ উদ্যোগ ধীরগতিতে এগোচ্ছে বা স্থবির হয়ে আছে।
অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহের বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে সব অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ইফতেখারুজ্জামান।
সম্পদের হিসাব ওয়েবসাইটে দেখতে পারেন: টিআইবি ও তার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব ওয়েবসাইটে দেয়া আছে। যে কেউ ওয়েবসাইট থেকে এ হিসাব দেখে নিতে পারেন। গত ১৩ই এপ্রিল নিজের ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে টিআইবির সম্পদের বিবরণ প্রকাশের দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। এর প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান এ মন্তব্য করেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠাটা আমাদের জন্য ভালো। তাছাড়া আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলবো, আমাদের স্বচ্ছাতা থাকবে না, সেটা হতেই পারে না। তাই টিআইবির সব আয়-ব্যয় বা সম্পদের তথ্য সরকারের কাছে রীতিমতো জমা দেয়া হয়, যা জনগণের জ্ঞাতার্থে আমাদের ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত। টিআইবির বোর্ড, নির্বাহী পরিচালক, উপ-পরিচালকদের সম্পদের বিবরণও ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রয়েছে।
গৃহীত পদক্ষেপসমূহ: ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৬ মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন, ইপিজেড শ্রমিকদের আইনগত সুবিধা প্রদানে ইপিজেড শ্রম আদালত ও শ্রম অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল গঠন, এবং শ্রম বিধিমালা-২০১৫ পাস। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রায় ৯৫ শতাংশ কারখানায় ন্যূনতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত হারে মজুরি দেয়া হচ্ছে, এবং অধিকাংশ কমপ্লায়েন্স কারখানায় শ্রমিকদের জরুরি নম্বরসহ পরিচয়পত্র দেয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে কারখানা শ্রমিকদের সমন্বিত ডাটাবেজ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইউরোপীয় বায়ারদের জোট অ্যাকর্ড ও মার্কিন বায়ারদের জোট অ্যালায়েন্স কারখানার অগ্নি, বৈদ্যুতিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রায় শতভাগ কারখানায় জরিপ সম্পন্ন করেছে এবং জরিপ পরবর্তী রেমেডিয়েশনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি (প্রায় ৪৪%) সাধিত হয়েছে। এছাড়া রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহায়তার উদ্দেশ্যে গঠিত বিভিন্ন তহবিল থেকে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ইউএস ডলার সফলভাবে বিতরণ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখানো হয়, বিভিন্ন অংশীজন কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনও বিভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। শ্রম আইনের বিভিন্ন ধারার অপব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৬-এ ট্রেড ইউনিয়নের আদলে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠনের কথা বলা হলেও ৩০% শ্রমিকের স্বাক্ষর ছাড়াও ৫০% শ্রমিকের ভোটের মাধ্যমে এবং ইপিজেড কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠনের বিষয়টি কঠিন করা হয়েছে। অপরদিকে, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা পরিচালনায় দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন তদারকি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা দেখা যায়। এছাড়া শ্রমিক অধিকার রক্ষায় শ্রম পরিদপ্তরে ‘হটলাইন’ স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। শ্রম পরিদপ্তরের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের পূর্বে শ্রমিকদের পরিচয় জানিয়ে দেয়া এবং ইউনিয়ন নিবন্ধনে বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পরিলক্ষিত হয়। রাজউকের জনবল নিয়োগ এখনো সম্পন্ন হয়নি এবং নকশা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এখন চ্যালেঞ্জ: কারখানা পর্যায়ে শ্রমিকদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি, শ্রমিক ছাঁটাই ও ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের হয়রানি, মামলা বা চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে জবাবদিহির ঘাটতি, কোনো কোনো কারখানায় অতিরিক্ত এক ঘণ্টা কোনো প্রকার মজুরি ছাড়া কাজ করানোর অভিযোগ, নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতার কারণে অনেক কারখানা মালিকের নারী শ্রমিকদের জন্য রাত্রিকালীন কাজ না করানোর সিদ্ধান্ত উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বিজিএমইএ’র প্রভাবে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ বিধিমালা-২০১৪ স্থবির কার্যকর না করা, প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কারখানা পর্যায়ে অতিরিক্ত ৪ কর্মঘণ্টা বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপনের পাশাপাশি বিজিএমই’র ‘পকেট ট্রেড ইউনিয়ন’ বা ‘ইয়েলো’ ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে কারখানার সংস্কার ও স্থানান্তরে রেমেডিয়েশন ফাইন্যান্সের মাধ্যমে মালিকদের উচ্চ সুদে টাকা ছাড় করা হলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
টিআইবির সুপারিশ: তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীভূত তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, যেসব কারখানা বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ’র সদস্য নয় তাদের টেকনিক্যাল কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন, রানা প্লাজা ও তাজরিন দুর্ঘটনায় দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা, যত দ্রুত সম্ভব শ্রমিক ডাটাবেজ গঠন, পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত সব ধরনের কারখানার সমন্বিত তালিকা তৈরি করা, এবং দ্রুত সাব-কন্ট্রাক্টিং গাইডলাইন তৈরি, শ্রম পরিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংগঠন ও যৌথ দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিতে নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে সব কারখানায় কল-কারখানা অধিদপ্তরের হটলাইনের নম্বরটি দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি-উত্তর পোশাক খাতের সুশাসন নিশ্চিতকরণে সরকার ও বিভিন্ন অংশীজন বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনায় টিআইবি ধারাবাহিকভাবে গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। ২০১৩ সালে পরিচালিত টিআইবি’র ‘তৈরি পোশাক খাত: সুশাসনের সমস্যা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের তৃতীয় ফলোআপ হিসেবে বর্তমান গবেষণাটি ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত হয়।

No comments:

Post a Comment