![]() |
| টানা দুই দিন বৃষ্টি হচ্ছে। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ধরমপুর হাওরের অনেক বোরো খেত ডুবে গেছে। শঙ্কিত হয়ে আগেভাগেই ধান কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। গতকাল বিকেলে ছবিটি তুলেছেন আনিস মাহমুদ |
বোরো
ধান চাষ করে কৃষকের লাভ তো দূরে থাক, উল্টো লোকসান হচ্ছে। উৎপাদন খরচের
চেয়েও ১৮ শতাংশ কম দাম পাচ্ছেন কৃষক। ক্রমাগত লোকসানের কারণে কৃষক বোরো
চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। লাভের জন্য তাঁরা ভুট্টা ও গম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
এসব তথ্য উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি উন্নয়ন-বিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএর
বৈদেশিক কৃষি সেবা বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার গত বছরের তুলনায়
২০ হাজার হেক্টর কম জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে কৃষি মন্ত্রণালয়
থেকে আউশ ও আমন ধানে সার, বীজ ও নগদ টাকা প্রণোদনা হিসেবে দেওয়ার তথ্য
উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এতে ওই দুই মৌসুমে ধানের উৎপাদন এলাকা এবং মোট
উৎপাদন দুই-ই সামান্য হলেও বেড়েছে। গত ৩১ মার্চ ‘বাংলাদেশ: গ্রেইন অ্যান্ড
ফিড অ্যানুয়াল ২০১৬’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বোরো ধানের চাষ সম্পর্কিত হালনাগাদ প্রতিবেদনেও বোরো
ধানের চাষের জমি কমে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের
ওয়েবসাইটে দেওয়া ফসল চাষের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫-১৬
অর্থবছরে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা
হয়েছিল। কিন্তু চাষ হয়েছে ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। এ ব্যাপারে
জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতি কেজি
বোরো ধান উৎপাদনে ৩ হাজার ২০০ লিটার পানি খরচ হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানি
নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে আমরা বোরো থেকে কৃষক যাতে আউশ ও আমন চাষে বেশি
আগ্রহী হন, সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। গম, ভুট্টা, আলু, তেল ও ডাল জাতীয় ফসলের
চাষেও কৃষককে উৎসাহ দিচ্ছি। ফলে বোরো চাষ কমে অন্য ফসলের চাষ বৃদ্ধি
পাওয়া দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষির জন্য ইতিবাচক লক্ষণ।’ তবে
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বোরো আমাদের সবচেয়ে বড় ফসলের মৌসুম। ফলে
বোরোতে উৎপাদন কমলে তা দেশের মোট ধানের উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে
বিশ্ববাজারে চালের দাম কম থাকায় ও ভারত থেকে কম দামে চাল আমদানির সুযোগ
থাকায় দেশে ধানের উৎপাদন কমলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়ছে না। কিন্তু
হঠাৎ কোনো দুর্যোগের কবলে পড়লে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে,
দেশের উৎপাদনই হবে ভরসা। তখন হঠাৎ করে ধানের উৎপাদন বাড়ানো যাবে না। ফলে
দেশের মোট উৎপাদন যাতে চাহিদার সমানুপাতিক থাকে, সেই লক্ষ্যে সরকারকে
উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের প্রফেসরিয়াল ফেলো এম আসাদুজ্জামান
প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের কারণে আমাদের খাদ্য ঘাটতি
হয়েছিল। তখন আমরা বেশি অর্থ দিয়েও বিশ্ববাজার থেকে চাল কিনতে পারিনি।
বাজারে চালের দামও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল। তবে এতে
কৃষক ভালো দাম পেয়েছিলেন। ফলে এর পরের তিন-চার বছর আমরা ধানের উৎপাদন
ধারাবাহিকভাবে বাড়তে দেখেছি। কিন্তু কৃষকের ওই উদ্যোগকে ধরে রাখার জন্য
তাঁদের ফসলের ন্যায্য দাম দেওয়া উচিত ছিল। সেটা কৃষক না পাওয়ায় এখন
বোরোতে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।’ইউএসডিএর প্রতিবেদনে বোরোতে কৃষকের
আগ্রহ হারানোর প্রধানত দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। ধান বিক্রি করে
লোকসান হওয়া ও সেচের খরচ বেড়ে যাওয়া। বোরো চাষ কমে গম ও ভুট্টা চাষ
বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গমে কৃষক উৎপাদন
খরচের চেয়ে ২৪ শতাংশ ও ভুট্টায় ৬০ শতাংশ বেশি দাম পাচ্ছেন। রাজশাহীর পবা
উপজেলার বড়গাছি গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গত কয়েক বছর
ধরে ১২ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করে আসছিলেন তিনি। কিন্তু একটানা লোকসানের
কারণে তিনি এ বছর এক বিঘা জমিতেও বোরো চাষ করেননি। ইউএসডিএর ওই
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোরো চাষে বিনিয়োগ বেশি কিন্তু লাভ নেই। অন্যদিকে
গম ও ভুট্টায় বিনিয়োগ কম, লাভও বেশি। প্রতি হেক্টরে বোরো ধান চাষে ১
লাখ ৫৫ হাজার টাকা খরচ করে ৫ দশমিক ৩৮৯ মেট্রিক টন ধান হয়। অন্যদিকে গমে
প্রতি হেক্টরে ৫৩ হাজার ৪০ টাকা খরচ করে পৌনে চার টন উৎপাদন পাওয়া যায়।
ভুট্টার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ আরও কম, উৎপাদন আরও বেশি। প্রতি হেক্টর
ভুট্টা চাষে মাত্র ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৮০ টাকা খরচ করে উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে
প্রায় ১২ টন। ভুট্টা ও চালের দাম প্রায় সমান। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গত
তিন বছরে বাংলাদেশে বোরো, আউশ ও আমন মিলিয়ে মোট ধানের জমির পরিমাণ ও
উৎপাদন সামান্য বেড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১১ লাখ ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে ৩
কোটি ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জমির পরিমাণ
১০ হাজার হেক্টর বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর ও উৎপাদন ৫০ হাজার
মেট্রিক টন বেড়েছে।
বোরো উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দাম ১৮%
গম উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশি দাম ২৪%
ভুট্টা উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশি দাম ৬০%
৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। চাষ হয়েছে ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে
বোরো উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দাম ১৮%
গম উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশি দাম ২৪%
ভুট্টা উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশি দাম ৬০%
৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। চাষ হয়েছে ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে

No comments:
Post a Comment