Thursday, April 7, 2016

তথ্য ফাঁস সামাজিক প্রতিবাদ

একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে বলতে পারি, পানামা পেপারসের গুরুত্ব অনেক সুদূরপ্রসারী হবে। এমনকি ৯৯ শতাংশ যা সন্দেহ করেছিল, গুরুত্বের দিক থেকে এটা তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল ফাঁসের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, যারা সেই বাকি ১ শতাংশ অর্থাৎ বিশ্বের অভিজাত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, তাদের অনেককেই জেলে পোরা উচিত। তবে ব্যাপারটা তেমন হচ্ছে না। অথচ তাদের যে জেলে পোরা উচিত তার বিপক্ষে এখন কেউ যুক্তিও দিতে পারবে না। অনেক মানুষের কাছেই এটা খবর হিসেবে বিস্ময়কর নয়। তবে এই বিশাল ফাঁসের ঘটনা সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কী বার্তা বয়ে আনল, সেটাই তার প্রকৃত মাজেজা। এই পানামা পেপারসের ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, তৎপরতা হিসেবে এই তথ্য ফাঁস আরও পাকাপোক্ত হয়েছে। এটা হচ্ছে তৎপরতার তত্ত্ব, যেটার সবচেয়ে বেশি প্রচারণা দিয়েছিল উইকিলিকস। তারা বলে, সত্য তথ্য ফাঁস করা একধরনের সামাজিক প্রতিবাদ। তবে অবশ্যই চিন্তা হিসেবে এটা নতুন কিছু নয়, ‘আপনি সত্য জানবেন, আর সত্যই আপনাকে মুক্ত করবে’ (জন ৮: ৩২)। কিন্তু পৃথিবীতে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, চেলসিয়া ম্যানিং ও এডওয়ার্ড স্নোডেনের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য ফাঁসকারী মানুষের আবির্ভাব ঘটায় এই তথ্য ফাঁসের ব্যাপারটা সাম্প্রতিক কালে তৎপরতা হিসেবে বেশ আদৃত হয়েছে। এটা আসলে ফাঁসের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার এক অনন্য সুযোগ। তর্কযোগ্যভাবে বলা যায়, এই পানামা পেপারস ফাঁস হিসেবে নিখুঁত। প্রথমত, এর পরিসর অনেক বড়: ৪০ বছরের নথি, ১ কোটি ১৫ লাখ ফাইল, যা কম্পিউটারের হিসাবে ২ দশমিক ৬ টেরাবাইট পরিমাণ তথ্য, যেগুলো এসেছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান থেকে। ফাঁস হিসেবে এটা পূর্ণাঙ্গ, যা মানবেতিহাসে অতীতের সব ফাঁসকে ছাড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, একদল বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক সাংবাদিক এক অভূতপূর্ব সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে এই নথিগুলোর সত্যাসত্য যাচাই করেছেন। এর মাধ্যমে ফাঁসের ব্যাপারটা বৈশ্বিক পরিসরে পেশাদার রূপ পেল আর উইকিলিকসের শৌখিন ফাঁসের যুগ শেষ হলো। এখন কথা হচ্ছে, এই পানামা পেপারস ফাঁসের মধ্য দিয়ে কি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে? পরিষ্কারভাবেই বলা যায়, রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল শুরু করানোর মতো শক্তি এই ঘটনার আছে। ইতিমধ্যে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমন্ডুর ডেভিড গুনলাগসন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, এই ফাঁসে স্ত্রীসহ তাঁর নিজের নামও আসায় ১০ হাজার মানুষ দেশটির সংসদের সামনে জড়ো হয়, ফলে তাঁকে পদত্যাগ করতেই হয়। আর এসব নথিপত্রে তো ১৪৩ জন রাজনীতিকের তথ্য রয়েছে, যার মধ্যে আছেন রুশ প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট, সৌদি আরবের রাজা, যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের আটজন সদস্য, চীনের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতার অধিকারী সংস্থার সঙ্গে জড়িত আট সদস্য ও ডজন খানেক ব্রাজিলীয়। ফলে ধারণা করা যায়, বিক্ষোভ আরও অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়বে। এই পানামা পেপারসের তাৎক্ষণিক প্রভাব হচ্ছে, এর কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকারই অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। সামনের দিনগুলোতে হয়তো এমন হবে যে চূড়ান্ত ক্ষমতাধর নেতাদের মধ্যে অনেকেই নিজের বৈধতা হারাবেন। রানা ফুরুহার টাইম ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয়তে লিখেছেন, ‘পানামা পেপারসের কারণে পুঁজিবাদ সবচেয়ে গুরুতর সংকটের মুখে পড়তে পারে।’ কিন্তু সংকট ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সর্বোপরি সংকট তো পুঁজিবাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেই মনে হয়। কিছু রাজনীতিকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে হয়তো আংশিকভাবে মানুষের রাগ-ক্ষোভ প্রশমিত হবে, কিন্তু এতে মূল সমস্যার সমাধান হবে না, সেটা হলো আমাদের পৃথিবীটা ১ শতাংশ ভণ্ড মানুষ বাজেভাবে চালাচ্ছে। পানামা পেপারসের সৌন্দর্য হচ্ছে এতে বোঝা যায়, পৃথিবীর সব দেশের মানুষ আজ অভিন্ন বিশ্বায়িত শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে। আপনি পাকিস্তানে থাকেন বা ব্রাজিল, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যে থাকেন, সেটা ব্যাপার না, সত্যটা সব জায়গাতেই একই রকম এখন তো রব উঠেছে, বড় ফাঁস ও প্রতিবাদ হলেই সমাজে বড়সড় পরিবর্তন আসবে, আসুন এই কোরাসে গলা মেলানোর আগে আমরা একদণ্ড সুস্থির হয়ে চিন্তা করি। এই ফাঁস পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে পারে, এ ব্যাপারে আমাদের কি উৎসাহ কম থাকা উচিত নয় বা নিদেনপক্ষে সন্দিহান হওয়া উচিত নয়? আমরা কি দেখিনি, উইকিলিকস ও এডওয়ার্ড স্নোডেন বিপুল তথ্য ফাঁস করার পরও বিরাজমান ব্যবস্থার একচুলও নড়চড় হয়নি? আবার ২০১১ সালে প্রতিবাদকারীরা ৮২টি দেশের আর্থিক কেন্দ্র দখল করার পরও ধনী ও ক্ষমতাশালীদের কিছুই হয়নি, যখন তারা দাবি করেছিল, ‘রাজনীতি থেকে টাকা হটাও’? হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ...
আমাদের অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, সেটা হলো আমরা প্রতিবাদ বন্ধ করে দেব বা সব শেষ করে দেব তা নয়, কিন্তু আমাদের নতুনভাবে প্রতিবাদ করতে হবে, সেটা হতে পারে এ রকম: পানামা পেপারসের সৌন্দর্য হচ্ছে এতে বোঝা যায়, পৃথিবীর সব দেশের মানুষ আজ অভিন্ন বিশ্বায়িত শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে। আপনি পাকিস্তানে থাকেন বা ব্রাজিল, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যে থাকেন, সেটা ব্যাপার না, সত্যটা সব জায়গাতেই একই রকম। সেটা হলো অতি ধনী মানুষেরা সম্পদ ব্যবহার করে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে, আবার একই সঙ্গে তারা রাজস্ব সংগ্রাহকদের চোখও ফাঁকি দেয়। পানামা পেপারস যে মৌলিক দিকটির ওপর আলো ফেলেছে সেটি হলো বৈশ্বিক আইনের শাসনের প্রশ্ন ও ভুল মানুষের হাতে ক্ষমতার বিষয়টি। একটি উপায়ে বাকি ৯৯ শতাংশ এই গভীর সমস্যার সমাধান করতে পারে, যদি দেশে দেশে সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং আন্দোলনকারীরা নির্বাচনে প্রভাব ফেলে ক্ষমতা গ্রহণ করে তারাই পৃথিবী শাসন করতে পারে। এই পানামা পেপারস ফাঁসের ঘটনা যদি আমাদের এই উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের দিকে এক ধাপও এগিয়ে দেয়, তাহলেই তা সার্থক হবে।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
মিকাহ্ হোয়াইট: অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের সহ-আয়োজক।

No comments:

Post a Comment