নতুন অ্যাপের কারণে কিনা জানি না, ফেসবুকের ভিডিওগুলো এখন নিজে নিজেই
প্লে হয়ে যায়। মজার নানা ভিডিওর মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু চলে আসে, যা আমার
মতো অনেকের কাছেই অসহনীয়। বাংলাদেশের কোনো গ্রামগঞ্জের ভিডিও। কেউ কাউকে
পেটাচ্ছে তো পেটাচ্ছেই। মারের চোটে কেউ রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছেন, কারও হাত-পা
ভেঙে যাচ্ছে, একসময় নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছেন। তবু পেটানো থামে না। আশপাশে লোকজন
জড়ো হয়ে তা দেখছেন। আর এর যেহেতু ভিডিও হয়েছে, তার মানে কেউ একজন মনোযোগ
দিয়ে তা রেকর্ডও করেছেন। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ধারণা করি, এমন আরও
অনেকেরই হয়। ফেসবুকে এমন ভিডিও কে দেখতে চায়! তবে ফেসবুকে এ ধরনের ভিডিও
শেয়ার ও হাজির হয় সাধারণত সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই। বর্বরতা ও নৃশংসতায় জড়িত
ব্যক্তিদের ধরিয়ে দেওয়া বা তাদের পরিচয় জানার আবেদন-আহ্বান থাকে। এসব
ভিডিওর কারণে জনমতও তৈরি হয়। সিলেটের শিশু রাজনের ওপর নির্যাতনের ভিডিওটি
দেখার সাহস আমার হয়নি। কিন্তু ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওটির কারণেই বলা
যায় এই হত্যার বিচার হয়েছে। ফেসবুকে এ ধরনের বীভৎস ভিডিও আপলোড করা কতটা
ঠিক—এমন প্রশ্ন যেমন তোলা যায়, তেমনি নৃশংসতার বিরুদ্ধে জনমত বা বিচারের
ক্ষেত্রে যে এর ভূমিকা আছে, সেটাও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। বোঝা যায়, এক
জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। ফেসবুকে আবার কিছু এমন ভিডিও আমরা
দেখি, যেখানে নির্যাতক বা নির্যাতক গোষ্ঠী নিজেরাই ভিডিও করে তা ফেসবুকে
দিয়ে দেয়। স্কুল বা কলেজে যাওয়ার সময় মেয়েদের ওপর নির্যাতন ও জোরজবরদস্তির
ভিডিওই এ ক্ষেত্রে বেশি। উদ্দেশ্য মেয়েটিকে হেয় করা আর নিজেদের হিরোইজম
দেখানো। কিছু ক্ষেত্রে এসবের ফল শেষ পর্যন্ত ভালো হয়নি। এসব ভিডিও শেয়ার
হয়েও ফেসবুকে জনমত গড়ে উঠেছে। হিরোইজম দেখাতে গিয়ে অনেকেই ধরা পড়েছেন।
নৃশংসতার ভিডিওগুলোর যেসব অংশ দেখতে বাধ্য হয়েছি, তাতে মনে অনেক প্রশ্ন
জেগেছে। এ ধরনের বীভৎস মারপিটের ক্ষেত্রে দেখা যায় আশপাশে লোকজন জড় হয়ে তা
দেখছেন। তাঁরা সাধারণ নারী-শিশু বা পুরুষ। এসব দেখে তাঁদের মনে কী
ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়? এ ধরনের মারপিটের প্রতি কি তাঁদের সমর্থন আছে? কারও
যদি প্রতিবাদ করার সাহস না-ও থাকে, এই বীভৎসতা কি জড়ো হয়ে দেখার বিষয়!
কিছু ভিডিও দেখলে মনে হবে যে চারপাশে যাঁরা জড়ো হয়ে আছেন, তাঁদের এসব
বর্বর কায়দার মারপিটের প্রতি একধরনের সায় আছে। আর যাঁকে বা যাঁদের পেটানো
হচ্ছে, তিনি বা তাঁরা সামাজিক বিবেচনায় কোনো না-কোনো ‘অপরাধ’ করেছেন। জড়ো
হয়ে যাঁরা পেটানো দেখেন, তাঁরা কি ‘অপরাধীর’ ওপর এই নির্যাতনের বিষয়টি
উপভোগ করেন?
প্রশ্ন আরও আছে। যিনি ভিডিও করেন, তিনি কি ঘটনাটির বিরোধিতা থেকে তা করেন, যাতে নির্যাতকদের চিহ্নিত করা যায় এবং পরে তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া যায়? নাকি নিছক ‘মজা’ হিসেবে তা করেন? ভিডিওগুলো দেখলে তো মনে হয়, গ্রামগঞ্জে স্বাভাবিক পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্যেই এ ধরনের মারপিটের ঘটনাগুলো ঘটেছে। তবে কি এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়! আগেও ঘটেছে, এখনো ঘটছে। পার্থক্য এনে দিয়েছে মোবাইল ফোনের ক্যামেরা ও ফেসবুক। আমরা আমাদের সমাজ ও জনপদের হিংস্র চেহারা ফেসবুকের মতো একটি আধুনিক মাধ্যমে দেখতে পেয়ে হায় হায় করে উঠছি! মার্কিন লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও রাজনৈতিক কর্মী সুসান সন্টাগের একটি উদ্ধৃতি পড়েছিলাম বেশ আগে। তাঁর কথাটি অনেকটা এ রকম, ‘কেউ একই সঙ্গে চিন্তা করতে ও কাউকে মারতে পারে না।’ মানে কেউ কাউকে যখন মারতে শুরু করে, তখন তার আসলে চিন্তাশক্তি কাজ করে না। বেশ কিছুদিন ধরে এ ধরনের ভিডিও দেখে মনে হচ্ছিল, যে বা যারা সরাসরি এসব মারধরে অংশ নেয়, তাদের না হয় তখন চিন্তা করার শক্তি থাকে না। কিন্তু বাকি যাঁরা তা দেখছেন, তাঁদেরও কি চিন্তাশক্তি বলে কিছু কাজ করে না! আমাদের কি তবে গণচিন্তাশক্তি লোপের ঘটনা ঘটছে?
এ ধরনের ঘটনা কেন বা কখন ঘটে? ‘ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশন’ ধারণার স্রষ্টা মার্কিন মনোবিদ মার্শাল বি রোজেনবার্গের লেখায় একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ‘মানুষ যখন নিজে এটা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের দুঃখ-কষ্টের কারণ হচ্ছে অন্য কেউ এবং তাদের শাস্তি দেওয়া উচিত, তখনই সহিংসতা সৃষ্টি হয়’ (ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশন: আ ল্যাঙ্গুয়েজ অব লাইফ)। তাঁর এই ব্যাখ্যাকে বিবেচনায় নিলে আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের সমাজে যাঁরা নানা অন্যায় ও অবিচারের শিকার হন, তাঁরা যেহেতু এর প্রতিকার পান না, তাই সহিংসতার পথকেই উপায় হিসেবে মানছেন। নিজেরাও এতে জড়িয়ে পড়ছেন, এসবে সমর্থন দিচ্ছেন, ক্রসফায়ারে কোনো ‘দুর্বৃত্তের’ মৃত্যুতে মিষ্টি বিতরণ করছেন। বিপদ হচ্ছে, সহিংসতা শুধু একটি রোগই নয়, এটি একটি সংক্রামক রোগ। আইনের শাসনের পথ থেকে আমরা যত দূরে সরতে থাকব, এর সংক্রমণ ততই বাড়তে থাকবে। আমরা চাই বা না চাই, ফেসবুকে আসতে থাকবে এ ধরনের আরও নতুন নতুন ভিডিও।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
প্রশ্ন আরও আছে। যিনি ভিডিও করেন, তিনি কি ঘটনাটির বিরোধিতা থেকে তা করেন, যাতে নির্যাতকদের চিহ্নিত করা যায় এবং পরে তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া যায়? নাকি নিছক ‘মজা’ হিসেবে তা করেন? ভিডিওগুলো দেখলে তো মনে হয়, গ্রামগঞ্জে স্বাভাবিক পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্যেই এ ধরনের মারপিটের ঘটনাগুলো ঘটেছে। তবে কি এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়! আগেও ঘটেছে, এখনো ঘটছে। পার্থক্য এনে দিয়েছে মোবাইল ফোনের ক্যামেরা ও ফেসবুক। আমরা আমাদের সমাজ ও জনপদের হিংস্র চেহারা ফেসবুকের মতো একটি আধুনিক মাধ্যমে দেখতে পেয়ে হায় হায় করে উঠছি! মার্কিন লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও রাজনৈতিক কর্মী সুসান সন্টাগের একটি উদ্ধৃতি পড়েছিলাম বেশ আগে। তাঁর কথাটি অনেকটা এ রকম, ‘কেউ একই সঙ্গে চিন্তা করতে ও কাউকে মারতে পারে না।’ মানে কেউ কাউকে যখন মারতে শুরু করে, তখন তার আসলে চিন্তাশক্তি কাজ করে না। বেশ কিছুদিন ধরে এ ধরনের ভিডিও দেখে মনে হচ্ছিল, যে বা যারা সরাসরি এসব মারধরে অংশ নেয়, তাদের না হয় তখন চিন্তা করার শক্তি থাকে না। কিন্তু বাকি যাঁরা তা দেখছেন, তাঁদেরও কি চিন্তাশক্তি বলে কিছু কাজ করে না! আমাদের কি তবে গণচিন্তাশক্তি লোপের ঘটনা ঘটছে?
এ ধরনের ঘটনা কেন বা কখন ঘটে? ‘ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশন’ ধারণার স্রষ্টা মার্কিন মনোবিদ মার্শাল বি রোজেনবার্গের লেখায় একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ‘মানুষ যখন নিজে এটা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের দুঃখ-কষ্টের কারণ হচ্ছে অন্য কেউ এবং তাদের শাস্তি দেওয়া উচিত, তখনই সহিংসতা সৃষ্টি হয়’ (ননভায়োলেন্ট কমিউনিকেশন: আ ল্যাঙ্গুয়েজ অব লাইফ)। তাঁর এই ব্যাখ্যাকে বিবেচনায় নিলে আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের সমাজে যাঁরা নানা অন্যায় ও অবিচারের শিকার হন, তাঁরা যেহেতু এর প্রতিকার পান না, তাই সহিংসতার পথকেই উপায় হিসেবে মানছেন। নিজেরাও এতে জড়িয়ে পড়ছেন, এসবে সমর্থন দিচ্ছেন, ক্রসফায়ারে কোনো ‘দুর্বৃত্তের’ মৃত্যুতে মিষ্টি বিতরণ করছেন। বিপদ হচ্ছে, সহিংসতা শুধু একটি রোগই নয়, এটি একটি সংক্রামক রোগ। আইনের শাসনের পথ থেকে আমরা যত দূরে সরতে থাকব, এর সংক্রমণ ততই বাড়তে থাকবে। আমরা চাই বা না চাই, ফেসবুকে আসতে থাকবে এ ধরনের আরও নতুন নতুন ভিডিও।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
No comments:
Post a Comment