বিশ্বজুড়ে
চলছে তীব্র তাপদাহ। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে চলছে খরা। মাসের পর মাস
বৃষ্টি নেই অনেক অঞ্চলে। পানির অভাবে মরছে মানুষ, গবাদিপশুসহ অন্যান্য
জীবজন্তু। মরে গেছে গাছপালা, মাঠের ফসল। শুকিয়ে চৌচির নদী, খালবিল পুকুর
জলাশয়। অনেক অঞ্চলে দেখা দিয়েছে খাদ্যসঙ্কট তথা দুর্ভিক্ষ। পানি ও খাদ্যের
অভাবে মানুষ পালাচ্ছে এক গ্রাম ছেড়ে আরেক গ্রামে। আফ্রিকা মহাদেশের
ইথিওপিয়ায় গত জুলাই মাসের পর আর কোনো বৃষ্টি হয়নি। মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে
অনেক সবুজ গ্রাম ও জনপদ। অপর দিকে ভারতের ১২টির অধিক রাজ্যের ২৫৬টি জেলায়
৩৩ কোটি মানুষ খরার কবলে। মাসের পর মাস বৃষ্টির দেখা নেই। ৭শ’ ফুট মাটি
খুঁড়েও পানি মিলছে না অনেক অঞ্চলে। শেষে পানির সন্ধানে খনন করা কুয়ায় ঝাঁপ
দিয়ে আত্মাহুতি দেয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে।
এ দিকে চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাস এ যাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গোটা বিশ্বে। চলতি বছর নিয়ে মার্চ মাস এখন পর্যন্ত পরপর ১১ বার সমগ্র বিশ্বে উঞ্চতম মাস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসা, নোয়া এবং জাপানের আবহাওয়া অফিসসহ বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব সংস্থার প্রতিবেদনে ফেব্রুয়ারি মাসকে এযাবৎকালের সবচেয়ে অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়ার মাস এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার আচরণের মাস হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষণকৃত আবহওয়ার রেকর্ড ভঙ্গ করেছে চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাস। আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণের কারণে বিশ্বের কোথাও চলছে তীব্র খরা আবার কোথাও চলছে অতিবৃষ্টি, বন্যা। নাসা, নোয়াসহ বিভিন্ন সংস্থার জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, সামনে অনেক দিন পর্যন্ত আবহাওয়ার এ অস্বাভাবিক আচরণ তথা খরা অতিবৃষ্টি বন্যা অব্যাহত থাকতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট প্রচণ্ড তাপ বা এলনিনোর কারণে এটি হচ্ছে বলে তাদের বিশ্বাস। বিপরীত দিকে আবার অনেকের মতে, আবার সামনের কয়েক মাসে বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ঝড়ঝঞ্ঝার মাধ্যমে কমে আসবে এলনিনোর প্রভাব।
রেকর্ড উঞ্চতম মাস : এ বছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসের সম্ভাব্য যে তাপমাত্রা ২০১৫ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল তা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) কর্তৃক গত ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮০০ সাল থেকে রেকর্ড রাখার পর এখন পর্যন্ত চলতি বছর নিয়ে মার্চ মাস পরপর ১১ বার সবচেয়ে উঞ্চতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সারা বিশ্বে।
২০১৪, ২০১৫ এবং চলতি বছরের জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস এখন পর্যন্ত রেকর্ড তাপদাহের মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী।
ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা) এবং জাপান মেটিয়োরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের উষ্ণতাবিষয়ক রিপোর্টও নোয়ার প্রতিবেদনের কাছাকাছি।
১৬ মার্চ ২০১৬ নাসা প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, গত জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি ছিল সবচেয়ে অস্বাভাবিক গরম মাস। ফেব্রুয়ারি মাসে উষ্ণতা দীর্ঘ দিনের গড় উষ্ণতার চেয়ে ১ দশমিক ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। চলতি বছর জানুয়ারি মাসকে নাসা এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক গরম মাস হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের অস্বাভাবিক আচরণ জানুয়ারি মাসকেও ছাড়িয়ে যায়। জানুয়ারির চেয়ে ফেব্রুয়ারি তাপমাত্রা দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
নাসার তথ্যানুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি মাস ছিল ইতিহাসে প্রথম মাস যা কি না বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে অতিক্রম করল।
উত্তর গোলার্ধের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি গত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল সারা বিশ্বের মধ্যে। ১৯৫১-১৯৮০ নাসার বেসলাইন তথ্যানুযায়ী উত্তর গোলার্ধের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৭৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ৩ মার্চ উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রা স্বাভাবিক চিহ্নিত তাপমাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল যা রেকর্ড রাখার পর ইতিহাসে প্রথম ঘটল।
অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ, প্রায় পুরো দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণের কিছু দেশ ছাড়া পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ পড়েছে উত্তর গোলার্ধে।
রেকর্ড মার্চ মাস : গোটা বিশ্বে চলতি বছরের মার্চ মাস একটি উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে এক শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে উষ্ণতম মাসের যে রেকর্ড রাখা আছে তাতে দেখা গেছে মার্চ মাস ঘুরে ফিরে রেকর্ড উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে বারবার।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : ১৮৯৫ সালে জাতীয় রেকর্ড রাখার পর থেকে চলতি মার্চ মাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ নিয়ে চতুর্থবার মার্চ মাস উষ্ণতম মাসের রেকর্ড করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে চলছে তীব্র খরা। আবার সমগ্র আরকানসাস, লুইজিয়ানা ও মিসিসিপিজুড়ে মার্চের শুরু ও শেষে ভারী বৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়।
২০১০ সালে মহাদেশীয় রেকর্ড রাখার পর থেকে উত্তর আমেরিকায় গত মার্চ মাস ছিল সবচেয়ে উষ্ণ মাস।
এশিয়া : এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মার্চ মাসের তাপমাত্রা গড় তাপমাত্রার চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ২০১০ সালের পর থেকে এ বছরের মার্চ মাস ছিল তৃতীয় উষ্ণতম মাস।
এ দিকে ইউরোপ সপ্তম, আফ্রিকা ২০১০ সালের পর তৃতীয়, নিউজিল্যান্ড ১৯০৯ সালের পর ষষ্ঠ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ২০১০ সালের পর গত মার্চ মাসকে সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
আর্কটিক সাগর : গত মার্চ মাসে আর্কটিক সাগরের বরফের আয়তন দ্বিতীয় সর্বনিম্ন আকার ধারণ করে। ১৯৭৯ সাল থেকে স্যাটেলাইট ইমেজে ধারণকৃত রেকর্ডের পর থেকে ২০১৫ সালে আর্কটিক সাগরের বরফ সবচেয়ে ছোট আকার ধারণ করে।
প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট হওয়া প্রচণ্ড তাপ যা এলনিনো নামে পরিচিত এর ফলে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ চলছে তা অব্যাহত থাকবে। তার মানে ভূপৃষ্ঠের কোথাও হঠাৎ অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং কোথাও খরা চলতে থাকবে আরো অনেক দিন ধরে। অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানীর মতে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তাপদাহ কমে আসবে ঝড়বৃষ্টির মাধ্যমে।
নোয়া বিজ্ঞানীরা চলমান এলনিনোকে ১৯৯৭-৯৮ সালের সৃষ্ট এলনিনোর সাথে তুলনা করছেন। সে সময়ও সারা বিশ্বে প্রচণ্ড তাপদাহ সৃষ্টি হয়েছিল। তখনকার তুলনায় এবার তাপমাত্রা দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
এ দিকে বিচিত্র পরিবেশ দেখা গেছে বরফাচ্ছাদিত আর্কটিক সাগরে। ১৯৭০ সাল থেকে রেকর্ড রাখার পর চলতি গ্রীষ্মে সবচেয়ে বেশি বরফ গলতে দেখা গেছে সেখানে।
নাসার জলবায়ুবিজ্ঞানী জেমন হ্যানসেনের মতে সামনের অন্তত এক দশক পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী ঝড়ঝঞ্ঝা অনেক বাড়বে এবং তাতে অনেক জীবন ক্ষয় হবে। তার প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো বিশ্বব্যাপী ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি তথা খনিজ তেল ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর চরম বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এর ফল আমাদের ভোগ করতে হবে। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাতে না পারার ব্যর্থতাজনিত পরিবেশগত দুর্যোগ বিষয়ে জেমস হ্যানসেনের আশঙ্কার সাথে সব জলবায়ুবিজ্ঞানীরা একমত। হ্যানসেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী যে, গত বছর প্যারিসে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানোর বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। জেমস হ্যানসেন এবং তার সাথে ১৮ জনসহ লেখকের মতে এক লাখ ২০ হাজার বছর আগে প্রাকৃতিক কারণে পৃথিবীতে যে উষ্ণযুগ বিরাজ করেছিল তখনকার তাপমাত্রা আজকের তাপমাত্রার চেয়ে সামান্য কিছু বেশি ছিল।
খরা : অনেক দেশে মাসের পর মাস বৃষ্টি নেই। অনেক অঞ্চলে বৃষ্টি হয়েছে পরিমাণের চেয়ে অনেক কম। পানি ও বৃষ্টির অভাবে কমে গেছে ফসলের উৎপাদন। ফলে অনেক অঞ্চলে দেখা দিচ্ছে খাদ্য সঙ্কট ও দুর্ভিক্ষ। অনেক অঞ্চলের নদী, খাল, পুকুর কুয়াসহ সব জলাশয় শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। পানির অভাবে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে মানুষজন। মাঠে মরে পড়ে আছে গবাদিপশুর নিথর দেহ, কঙ্কাল। অনেক সবুজ শ্যামল গ্রাম পরিণত হচ্ছে মরুভূমিতে। আফ্রিকার অনেক দেশ এবং এশিয়ার ভারতের অনেক অঞ্চলে এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো অঞ্চলেও চলছে খরা।
ভারতে গত চার বছরে খরায় সরকারি হিসেবেই মারা গেছে চার হাজার ২০৪ জন। বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশি। চলতি বছর খরায় এ পর্যন্ত শতাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছে। গত বছর খরায় মারা গেছে দুই হাজার ১৩৫ জন। খরায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। মানুষজন পানির সন্ধানে ছুটে চলছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। পানির অভাবে মরে যাচ্ছে অসংখ্য গবাদিপশু। ঝাড়খণ্ডে এক কৃষক তার কয়েকটি গরু বাঁচাতে ৭৫ হাজার রুপি লোন নিয়ে একটি কুয়া খনন করেন। কিন্তু ৭শ ফিট খনন করার পরও পানি না পেয়ে শেষে সেই কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
এ দিকে ইথিওপিয়ায় গত জুলাই মাসের পর আর বৃষ্টি হয়নি। গত ৩০ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ খরা। জাতিসঙ্ঘ বলছে অবিলম্বে সেখানে এক কোটি মানুষের জন্য খাদ্য সাহায্য পাঠাতে হবে। এ সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে। ইথিওপিয়ার মতো আফ্রিকার আরো অনেক দেশে একই অবস্থা বিরাজ করছে।
এ দিকে চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাস এ যাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গোটা বিশ্বে। চলতি বছর নিয়ে মার্চ মাস এখন পর্যন্ত পরপর ১১ বার সমগ্র বিশ্বে উঞ্চতম মাস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসা, নোয়া এবং জাপানের আবহাওয়া অফিসসহ বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব সংস্থার প্রতিবেদনে ফেব্রুয়ারি মাসকে এযাবৎকালের সবচেয়ে অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়ার মাস এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার আচরণের মাস হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষণকৃত আবহওয়ার রেকর্ড ভঙ্গ করেছে চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাস। আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণের কারণে বিশ্বের কোথাও চলছে তীব্র খরা আবার কোথাও চলছে অতিবৃষ্টি, বন্যা। নাসা, নোয়াসহ বিভিন্ন সংস্থার জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, সামনে অনেক দিন পর্যন্ত আবহাওয়ার এ অস্বাভাবিক আচরণ তথা খরা অতিবৃষ্টি বন্যা অব্যাহত থাকতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট প্রচণ্ড তাপ বা এলনিনোর কারণে এটি হচ্ছে বলে তাদের বিশ্বাস। বিপরীত দিকে আবার অনেকের মতে, আবার সামনের কয়েক মাসে বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ঝড়ঝঞ্ঝার মাধ্যমে কমে আসবে এলনিনোর প্রভাব।
রেকর্ড উঞ্চতম মাস : এ বছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসের সম্ভাব্য যে তাপমাত্রা ২০১৫ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল তা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) কর্তৃক গত ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮০০ সাল থেকে রেকর্ড রাখার পর এখন পর্যন্ত চলতি বছর নিয়ে মার্চ মাস পরপর ১১ বার সবচেয়ে উঞ্চতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সারা বিশ্বে।
২০১৪, ২০১৫ এবং চলতি বছরের জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস এখন পর্যন্ত রেকর্ড তাপদাহের মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী।
ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা) এবং জাপান মেটিয়োরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের উষ্ণতাবিষয়ক রিপোর্টও নোয়ার প্রতিবেদনের কাছাকাছি।
১৬ মার্চ ২০১৬ নাসা প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, গত জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি ছিল সবচেয়ে অস্বাভাবিক গরম মাস। ফেব্রুয়ারি মাসে উষ্ণতা দীর্ঘ দিনের গড় উষ্ণতার চেয়ে ১ দশমিক ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। চলতি বছর জানুয়ারি মাসকে নাসা এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক গরম মাস হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের অস্বাভাবিক আচরণ জানুয়ারি মাসকেও ছাড়িয়ে যায়। জানুয়ারির চেয়ে ফেব্রুয়ারি তাপমাত্রা দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
নাসার তথ্যানুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি মাস ছিল ইতিহাসে প্রথম মাস যা কি না বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে অতিক্রম করল।
উত্তর গোলার্ধের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি গত এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল সারা বিশ্বের মধ্যে। ১৯৫১-১৯৮০ নাসার বেসলাইন তথ্যানুযায়ী উত্তর গোলার্ধের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৭৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ৩ মার্চ উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রা স্বাভাবিক চিহ্নিত তাপমাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল যা রেকর্ড রাখার পর ইতিহাসে প্রথম ঘটল।
অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ, প্রায় পুরো দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণের কিছু দেশ ছাড়া পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ পড়েছে উত্তর গোলার্ধে।
রেকর্ড মার্চ মাস : গোটা বিশ্বে চলতি বছরের মার্চ মাস একটি উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে এক শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে উষ্ণতম মাসের যে রেকর্ড রাখা আছে তাতে দেখা গেছে মার্চ মাস ঘুরে ফিরে রেকর্ড উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে বারবার।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : ১৮৯৫ সালে জাতীয় রেকর্ড রাখার পর থেকে চলতি মার্চ মাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ নিয়ে চতুর্থবার মার্চ মাস উষ্ণতম মাসের রেকর্ড করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে চলছে তীব্র খরা। আবার সমগ্র আরকানসাস, লুইজিয়ানা ও মিসিসিপিজুড়ে মার্চের শুরু ও শেষে ভারী বৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়।
২০১০ সালে মহাদেশীয় রেকর্ড রাখার পর থেকে উত্তর আমেরিকায় গত মার্চ মাস ছিল সবচেয়ে উষ্ণ মাস।
এশিয়া : এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মার্চ মাসের তাপমাত্রা গড় তাপমাত্রার চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ২০১০ সালের পর থেকে এ বছরের মার্চ মাস ছিল তৃতীয় উষ্ণতম মাস।
এ দিকে ইউরোপ সপ্তম, আফ্রিকা ২০১০ সালের পর তৃতীয়, নিউজিল্যান্ড ১৯০৯ সালের পর ষষ্ঠ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ২০১০ সালের পর গত মার্চ মাসকে সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
আর্কটিক সাগর : গত মার্চ মাসে আর্কটিক সাগরের বরফের আয়তন দ্বিতীয় সর্বনিম্ন আকার ধারণ করে। ১৯৭৯ সাল থেকে স্যাটেলাইট ইমেজে ধারণকৃত রেকর্ডের পর থেকে ২০১৫ সালে আর্কটিক সাগরের বরফ সবচেয়ে ছোট আকার ধারণ করে।
প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট হওয়া প্রচণ্ড তাপ যা এলনিনো নামে পরিচিত এর ফলে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ চলছে তা অব্যাহত থাকবে। তার মানে ভূপৃষ্ঠের কোথাও হঠাৎ অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং কোথাও খরা চলতে থাকবে আরো অনেক দিন ধরে। অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানীর মতে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তাপদাহ কমে আসবে ঝড়বৃষ্টির মাধ্যমে।
নোয়া বিজ্ঞানীরা চলমান এলনিনোকে ১৯৯৭-৯৮ সালের সৃষ্ট এলনিনোর সাথে তুলনা করছেন। সে সময়ও সারা বিশ্বে প্রচণ্ড তাপদাহ সৃষ্টি হয়েছিল। তখনকার তুলনায় এবার তাপমাত্রা দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
এ দিকে বিচিত্র পরিবেশ দেখা গেছে বরফাচ্ছাদিত আর্কটিক সাগরে। ১৯৭০ সাল থেকে রেকর্ড রাখার পর চলতি গ্রীষ্মে সবচেয়ে বেশি বরফ গলতে দেখা গেছে সেখানে।
নাসার জলবায়ুবিজ্ঞানী জেমন হ্যানসেনের মতে সামনের অন্তত এক দশক পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী ঝড়ঝঞ্ঝা অনেক বাড়বে এবং তাতে অনেক জীবন ক্ষয় হবে। তার প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো বিশ্বব্যাপী ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি তথা খনিজ তেল ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর চরম বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এর ফল আমাদের ভোগ করতে হবে। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমাতে না পারার ব্যর্থতাজনিত পরিবেশগত দুর্যোগ বিষয়ে জেমস হ্যানসেনের আশঙ্কার সাথে সব জলবায়ুবিজ্ঞানীরা একমত। হ্যানসেন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী যে, গত বছর প্যারিসে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানোর বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। জেমস হ্যানসেন এবং তার সাথে ১৮ জনসহ লেখকের মতে এক লাখ ২০ হাজার বছর আগে প্রাকৃতিক কারণে পৃথিবীতে যে উষ্ণযুগ বিরাজ করেছিল তখনকার তাপমাত্রা আজকের তাপমাত্রার চেয়ে সামান্য কিছু বেশি ছিল।
খরা : অনেক দেশে মাসের পর মাস বৃষ্টি নেই। অনেক অঞ্চলে বৃষ্টি হয়েছে পরিমাণের চেয়ে অনেক কম। পানি ও বৃষ্টির অভাবে কমে গেছে ফসলের উৎপাদন। ফলে অনেক অঞ্চলে দেখা দিচ্ছে খাদ্য সঙ্কট ও দুর্ভিক্ষ। অনেক অঞ্চলের নদী, খাল, পুকুর কুয়াসহ সব জলাশয় শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। পানির অভাবে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে মানুষজন। মাঠে মরে পড়ে আছে গবাদিপশুর নিথর দেহ, কঙ্কাল। অনেক সবুজ শ্যামল গ্রাম পরিণত হচ্ছে মরুভূমিতে। আফ্রিকার অনেক দেশ এবং এশিয়ার ভারতের অনেক অঞ্চলে এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো অঞ্চলেও চলছে খরা।
ভারতে গত চার বছরে খরায় সরকারি হিসেবেই মারা গেছে চার হাজার ২০৪ জন। বাস্তবে এ সংখ্যা আরো বেশি। চলতি বছর খরায় এ পর্যন্ত শতাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছে। গত বছর খরায় মারা গেছে দুই হাজার ১৩৫ জন। খরায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। মানুষজন পানির সন্ধানে ছুটে চলছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। পানির অভাবে মরে যাচ্ছে অসংখ্য গবাদিপশু। ঝাড়খণ্ডে এক কৃষক তার কয়েকটি গরু বাঁচাতে ৭৫ হাজার রুপি লোন নিয়ে একটি কুয়া খনন করেন। কিন্তু ৭শ ফিট খনন করার পরও পানি না পেয়ে শেষে সেই কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
এ দিকে ইথিওপিয়ায় গত জুলাই মাসের পর আর বৃষ্টি হয়নি। গত ৩০ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ খরা। জাতিসঙ্ঘ বলছে অবিলম্বে সেখানে এক কোটি মানুষের জন্য খাদ্য সাহায্য পাঠাতে হবে। এ সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে। ইথিওপিয়ার মতো আফ্রিকার আরো অনেক দেশে একই অবস্থা বিরাজ করছে।

No comments:
Post a Comment