![]() |
| বাঁশখালীতে সংঘর্ষে নিহত একজনের স্বজনদের আহাজারি। সোমবার রাতে বাঁশখালীর গন্ডামারার চরপাড়া এলাকায়। |
বেড়া
যখন খেত খাচ্ছে, তখন এক দারোয়ানই ঠেকিয়ে দিলেন ব্যাংক ডাকাতি। প্রহরী যখন
উঁচুতলার লোক, তখন দুর্বৃত্তরা অপ্রতিরোধ্য। প্রহরী যখন নিচুতলার
সাধারণ, তখন ডাকাতের কোপ খেয়েও দুঃসাহসীভাবে ব্যাংকের টাকা ও সম্পদ রক্ষা
পাচ্ছে। ঘটনাটি ভোলার চরফ্যাশনের। এক সাধারণ প্রহরীর বাধায় ব্যাংক ডাকাতি
করতে আসা ডাকাতেরা পালাতে বাধ্য হয় (প্রথম আলো অনলাইন, ২ এপ্রিল)। জীবনের
পরোয়া না করে জানালা ভেঙে ঢোকা ডাকাতদের তিনি বাধা দেন। ঝান্টু ছাড়া
নামের জায়গায় আর কিছু সংবাদে আসে না—এমন গৌণ একজন ব্যক্তি বাঁচালেন
ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশে সব ব্যাংকের বড় ব্যাংক বাংলাদেশ
ব্যাংক থেকে চোখের সামনে দিয়ে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চলে গেল, কোনো
ঝান্টুকে সেখানে দেখা গেল না! বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি আর ভোলার ঘটনার
প্রতীকী তাৎপর্য অনেক। জাঁদরেল অর্থনীতিবিদ, ইয়া বড় ব্যাংকার, বাঘা বাঘা
আইটি বিশেষজ্ঞ কেন পারলেন না, আর ভোলার একটি ব্যাংকের প্রহরী ঝান্টু কেন
পারলেন, তার নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা আছে। যাঁদের ওপর বড় বড় দায়িত্ব, দেখা যাচ্ছে
তাঁদের ধরা পড়ার ভয় নেই। দায়িত্ব পালনের নিষ্ঠাও তাঁদের কম। নইলে এমন ঘটনা
ঘটতে পারত না। কিন্তু ঝান্টু জানতেন, ডাকাতি হয়ে গেলে তাঁর চাকরি তো
থাকবেই না, বরং ঊর্ধ্বতনরা পার পেলেও তাঁকে জেলে যেতে হবে। তাই জীবনের
ঝুঁকি নিয়ে তিনি বাধা দিয়েছেন। যাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতায় জবাবদিহি
নেই, কম ক্ষেত্রেই তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। আইনের ভয় মানুষকে
সৎ থাকতে বাধ্য করে। ওপরতলার লোকদের মনে হয় সেই ভয় নেই। বাংলাদেশের সব
সমস্যার মূলে এই ঘটনা। একে বলা যায় রেগুলেটরি ব্যর্থতা: পরিচালনা ও
নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাঁদের যা করার কথা তা করছেন না। তাই তাসের
ঘরের মতো একের পর এক প্রতিষ্ঠানের অধঃপতন, মহিরুহ ব্যক্তিদের খামখেয়ালি
দেখতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ঝান্টু আরেকটা জিনিস শিখিয়েছেন। নিরাপত্তা ও
প্রহরা, এমনকি দক্ষতা পর্যন্ত সততার ওপর নির্ভরশীল। যাঁর সততা নেই, তিনি
যতই দক্ষ ও বিজ্ঞ হোন লাভ নেই। সিস্টেম যতই যান্ত্রিক হোক, মানবীয় সততার
পরিমিত প্রয়োগ ছাড়া তা কাজ করবে না। করছেও না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল
চুরির পর অনেকেই আরও উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ বিশেষজ্ঞ আনার কথা বলছেন।
কিন্তু আমাদের সমস্যা ডিজিটাল নয়, আমাদের সমস্যাটা ম্যানুয়াল। যে লোকবল
আমাদের আছে, তা-ই যথেষ্ট হতো, যদি তাঁরা নিষ্ঠাবান হতেন, নিজের কাজে
মনোযোগী হতেন এবং মানবিক যোগ্যতায় আরেকটু উন্নত হতেন। উন্নত প্রযুক্তি
কিছুই বাঁচাতে পারবে না যদি মানুষগুলো মধ্যম বা একেবারে অধম চরিত্রের হয়।
ভোলার চরফ্যাশনের ঝান্টু সমাজের অধম অবস্থানে থেকেও উন্নত চরিত্রের প্রমাণ
দিয়েছেন। কিন্তু এ এমন এক দেশ, যখন অধমেরা সরের মতো ভেসে উঠেছে আর
উত্তমেরা তলিয়ে যাচ্ছে। তনু হত্যার তদন্তে শুভংকরের ফাঁকি দেখা গেল। ওদিকে
এই হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী তরুণ, তনুর ছোট ভাইয়ের বন্ধু আট দিন ধরে
নিখোঁজ! বাংলাদেশ ভালো নেই। হত্যা, ধর্ষণ, সম্পত্তি দখল, সংখ্যালঘুদের
বিতাড়ন চলছে তো চলছেই। ইউপি নির্বাচনে দুই দফায় শিশুসহ নিহত হলেন ৩৪ জন!
এগুলো এই মাত্রায় হওয়ার কথা ছিল না। হচ্ছে, কারণ দেশের প্রহরীরা ঝান্টুর
মতো সাহসী ও সৎ নন। কারণ, রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকা নিয়ে ফেলেছে। অনেক ঘটনারই
কোনো কূলকিনারা হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক তদন্ত হয় না, বিচার তো
দূরের কথা। কারণ সেই একই, দায়িত্বশীলদের অনেকেরই ব্যর্থতা। রানা প্লাজা
ধসের কারণ ছিল ভবন নির্মাণ ও নকশার ত্রুটি, সেই ত্রুটির জন্য দায়ী ছিলেন
রাজউকের ও সাভার পৌরসভার কর্মকর্তারা। তাঁরা যদি বিধিবহির্ভূতভাবে ভবন
নির্মাণে বাধা দিতেন, আগেভাগেই তদারক ও নজরদারি করতেন, তাহলে হয়তো এত বড়
ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটত না। প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যাবে সিস্টেমের প্রহরী,
তথা রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের গাফিলতির জন্যই কোনো কোনো ক্ষতি, মৃত্যু,
বিপর্যয় ঘটছে। আর এই ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়িয়েছে সংক্রামক। সবাই যা করছে আমিও
তা-ই করব, এমন সুবিধাবাদী নীতি গ্রাস করে ফেলছে পুরো ব্যবস্থাকে। সাধে কেউ
এমন করে না, করে অর্থের জন্য সুবিধার জন্য। দুর্নীতি না করলে ভয় আছে, করলে
ভয় কম। সমগ্র বাংলাদেশ যখন টাকা কামানোর মরিয়া নেশায় বুঁদ, তখন মাত্র গত
বছরই পাচার হয়ে গেছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। যাঁদের বাধা দেওয়ার কথা ছিল, হয়
তাঁরা নীরব, নয়তো এসব অর্থকরী দুর্নীতির সহযোগী। প্রহরীরা যখন এমন
বেখেয়াল অথবা সুবিধাবাদী, তখন এই দেশ সামনে এগোবে কীভাবে? কীভাবে আইনের
শাসন আর সামাজিক ন্যায়বিচারের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা পাবে? ঝান্টুর
ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, নিচতলায় এখনো মানুষ আছে বলে দেশ যতটুকু থাকার
ততটুকু আছে। ফুলবাড়ীর কৃষকেরা তিনটি জীবনের মূল্যে বাধা না দিলে সেখানকার
কয়লা, আবাদ ও বসতি এশিয়া এনার্জি নামক ভুঁইফোড় কোম্পানির ভোগে যেত।
সুন্দরবন রক্ষার পাহারা দেওয়ার বদলে সরকারই যখন আগ্রাসী, তখন প্রহরীর
ভূমিকা নিচ্ছে তরুণ দেশপ্রেমিকেরা। গতকাল সোমবার চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে
কৃষকেরা কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে জমিগ্রাস ঠেকাতে বাধা দিতে গেলে পুলিশের
গুলিতে চারজন কৃষকের মৃত্যু হয়। এক মাস ধরে তাঁরা আন্দোলনে ছিলেন। যদি
গণতান্ত্রিক প্রশাসন, তথা জনস্বার্থের প্রহরী থাকত, তাহলে রক্তপাত ছাড়াই এই
দ্বন্দ্বের মীমাংসা করা যেত। এ ক্ষেত্রেও দেখা গেল প্রহরীরা তাদের ওপর
অর্পিত দায়িত্ব পালনের চেয়ে অন্য কাজে বেশি উৎসাহী। আমাদের অধিকাংশ সমস্যার
জন্য দায়ী ওপরতলার কর্তাগণ। একটা দেশ যখন তাদের শাসক-কর্তৃপক্ষের জন্য
ভোগে, তখন তাকে আর রাষ্ট্র বলে না। ক্রমেই সেটা হয়ে ওঠে নৈরাজ্যের
নৈরাষ্ট্র। এ অবস্থায় আর অধিকারভোগী নাগরিক থাকতে পারে না এর জনগণ, তারা
হয়ে ওঠে নৈরাষ্ট্রের নৈনাগরিক। অধিকারগুলো তখন খুব দ্রুত কর্পূরের মতো
উবে যেতে থাকে।

No comments:
Post a Comment