একটি
বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, রাজধানীর বাইরের সরকারি মেডিকেল
কলেজগুলোতে পদায়ন করা তিন শতাধিক শিক্ষকসহ চিকিৎসক বছরের পর বছর ঢাকাতেই
অবস্থান করছেন। অন্যদিকে মফস্বলের ১৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে পাঠদান
কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পথে। এগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমের সংকট দূর করতে সরকার
জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র ও সিনিয়র কনসালট্যান্টদের মেডিকেল
কলেজে পাঠদানের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওই
দৈনিকটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘শিক্ষক-সংকটের কারণে মেডিকেল
কলেজগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই জুনিয়র ও সিনিয়র কনসালট্যান্টরা ওই
সব কলেজে বিষয়ভিত্তিক পাঠদান করবেন। ঢাকার বিভিন্ন কর্মস্থলে অতিরিক্ত
চিকিৎসকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাঁদের বদলির পর কনসালট্যান্টদের পাঠদান
থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।’ নিয়োগের শর্তানুযায়ী কনসালট্যান্টরা জেলা
সদর ও জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি বিভিন্ন প্যারামেডিক
কোর্সের ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। তাঁদের দিয়ে মেডিকেল কলেজ
শিক্ষার্থীদের পাঠদানে আপত্তি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট মেডিকেল শিক্ষকেরা।
মনে হচ্ছে হাইস্কুলের শিক্ষককে অনার্স বা এমএ ক্লাসে পড়াতে দেওয়া হলো। হতে
পারে তাঁদের মধ্যে এসব পড়ানোর যোগ্যতাসম্পন্ন দু-চারজন আছেন। তবে একটি
নিয়মকানুন তো থাকা দরকার। আর যাঁর যা কাজ তাঁর তা-ই করা উচিত।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অধিকাংশ সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষাদানের মান
ভালো নয়। এর জন্য বিভিন্ন অব্যবস্থা দায়ী বলে মনে করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে
যথাযথ অবকাঠামো ছাড়া সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন। এই অবকাঠামোর মধ্যে
শ্রেণিকক্ষ, ছাত্রাবাস ছাড়াও রয়েছে যন্ত্রপাতিসহ কমপক্ষে মাঝারি মানের একটি
হাসপাতাল। এসব তো নেই-ই, তার ওপর উপযুক্ত শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার মান
কোথায় দাঁড়ায়, তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। তবে এর চেয়েও করুণ অবস্থায় আছে
বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। সরকারি মেডিকেল কলেজের মতো এগুলো মূলত
নিয়ন্ত্রণ করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় আর বাংলাদেশ মেডিকেল ও
ডেন্টাল কাউন্সিল। এত কিছুর পরও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর সিংহভাগের মান
খুব নিম্ন বলে ধারণা করা হয়। অধিকাংশ কলেজেই নেই উপযুক্ত শিক্ষক ও কাজ চলার
মতো হাসপাতাল। প্রকৃতপক্ষে যথাযথ তদারকির অভাবে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের
পরিচালনা পর্ষদের মর্জি মাফিকই চলছে। অবশ্য বেশ কয়েকটি ভালো মানের বেসরকারি
মেডিকেল কলেজও রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় সাধারণত মেডিকেল স্কুল নামে
পরিচিত প্রতিষ্ঠানই আমাদের দেশে মেডিকেল কলেজ নামে পরিচিত। এগুলোতে স্নাতক
পর্যায়ে পড়াশোনা ও ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দেশে শুধু
সরকারি পর্যায়েই মেডিকেল শিক্ষাদান কার্যক্রম ছিল। এরপর সরকার বেসরকারি
মেডিকেল কলেজ স্থাপনকে উৎসাহিত করতে থাকে। ধারণা করা হয়েছিল, সরকারের
পাশাপাশি বেসরকারি খাত চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে বেশিসংখ্যক
ছাত্রছাত্রী পড়াশোনার সুযোগ পাবে। বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান (হৃদ্রোগ,
কিডনি, বক্ষব্যাধি ইত্যাদি ইনস্টিটিউট) বাদ দিলে এখন পর্যন্ত দেশে ৮৩টি
স্বীকৃত মেডিকেল কলেজ রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে ২৯টি সরকারি আর ৫৪টি
বেসরকারি। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত
ছয়টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। মেডিকেল কলেজে পড়ার পর এমবিবিএস ডিগ্রি দেওয়া হয়।
যে ১৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষক–সংকটের কথা বলা হলো, তার পেছনের
কারণও উল্লেখ করা হয়েছে ওই দৈনিকটিতে। মফস্বলে পদায়ন করা শিক্ষকেরা ওএসডি
হয়ে ঢাকার কোনো না কোনো সরকারি হাসপাতালে সম্পৃক্ত আছেন। তাঁদের কেউ
অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক কিংবা সহকারী অধ্যাপক। (তাঁদের পদসংখ্যা নির্ধারিত
হয় কলেজ, বিভাগ, ছাত্রসংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনায়। এখানেও নিশ্চয়ই সেই ১৮টি
কলেজকে বিবেচনায় নিয়েই মেডিকেল কলেজের শিক্ষকের সংখ্যা নির্ধারিত হয়েছে।
সেই বিবেচনাতেই নিয়োগ ও পদোন্নতি হয়েছে তাঁদের।) তদবির যাঁরা শুনছেন, তাঁরা
কী জবাব দেবেন? কোনো মেডিকেল কলেজের শূন্যপদে বিকল্প নিয়োগ না দিয়ে
নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যাঁরা ওএসডি হিসেবে প্রত্যাহার করে ঢাকায় নিয়ে
আসেন, তাঁদের জবাবদিহি কোথায়? এখানে মন্ত্রী আর সচিব উভয়ের দায় রয়েছে তাহলে
তাঁরা গেলেন কোথায়? এ যেন কাজির গরুর মতো। কেতাবে আছে কিন্তু গোয়ালে নেই।
আর রাজধানীর মেডিকেল কলেজগুলোর অতিরিক্ত শিক্ষক আবশ্যক হলে সেই পদ সৃষ্টির
ব্যবস্থা করা শ্রেয়। তা না হলে যাঁর যেখানে থাকার কথা সেখানে তিনি থাকবেন
না কেন? সেই কলেজগুলো না হলে অনেকে তাঁদের বর্তমান পদে নিয়োগ বা পদোন্নতি
পেতেন না, এটা কি ভেবে দেখেছেন? তাঁদের খোঁজ পেতে সরকারের এত সময় লাগবে কেন
তা বোধগম্য নয়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরটিতে উল্লেখ করা হয়, প্রাইভেট
প্র্যাকটিস, বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজে খণ্ডকালীন পাঠদান ও হাসপাতালে
যুক্ত থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ নিতে সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষকেরা ঢাকা
ছাড়তে চান না। তবে আরও মেডিকেল কলেজ করার জন্য শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বারবার
দাবি জানানো হয় কেন? সরকারও তা উদারভাবে করে। কিন্তু সেখানে শিক্ষকই যদি না
থাকেন, তাহলে সরকারের সেই সদিচ্ছা ব্যর্থ হয়ে যায়। বাস্তবতা হিসেবে
স্বীকার করতে হয়, আমাদের সমাজে তদবিরের একটি ভূমিকা রয়েছে। কাউকে ঢাকার
বাইরে বদলি করা হলে তদবির করানো হয় প্রভাবশালী স্বজন দ্বারা। কখনো বা যখন
যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের সমর্থনপুষ্ট চিকিৎসকদের সংগঠনের কোনো
সদস্যও সেই দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই তদবিরের পেছনে রয়েছে
বাণিজ্য চক্র। এ বিষয়ে অবশ্য স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ দাবি করছে, তারা কারও
বদলি ঠেকাতে তদবির করেছে এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। এমন কথা হয়তো
তাদের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান ড্যাবও বলবে। এটা সত্যি, বিষয়গুলো হয়তো প্রমাণ
করা যাবে না। কেননা, তদবির মাইক্রোফোনে করা হয় না। এমনকি লেখা হয় না কোনো
চিঠি। কোনো তালিকা দেওয়া হলেও তা থাকে অস্বাক্ষরিত। সুতরাং কে কীভাবে
প্রমাণ করবে? হতে পারে তদবিরগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হয় না। তবে
প্রতিষ্ঠানের প্রভাববলয়ে থাকা কেউ না কেউ করছেন এটা অস্বীকার করা অবাস্তব
হবে। আর প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করা যায় না এমন অনেক বাস্তব বিষয়ও কিন্তু
রয়েছে। অপর দিকটি হচ্ছে, তদবির যাঁরা শুনছেন তাঁরা কী জবাব দেবেন? কোনো
মেডিকেল কলেজের শূন্যপদে বিকল্প নিয়োগ না দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে
যাঁরা ওএসডি হিসেবে প্রত্যাহার করে ঢাকায় নিয়ে আসেন, তাঁদের জবাবদিহি
কোথায়? এখানে মন্ত্রী আর সচিব উভয়ের দায় রয়েছে। এমন অবস্থা চলছিল সাধারণ
শিক্ষা খাতে। মাত্র কিছুদিন আগে ঢাকার বেশ কয়েকটি কলেজে সংযুক্ত থাকা প্রায়
সব শিক্ষকের সংযুক্তি বাতিল করে মফস্বলে নিজ কর্মস্থলে যেতে নির্দেশ দেওয়া
হয় তাঁদের। হয়তোবা অনেকেই গেছেন। দু-চারজন থেকেও যেতে পারেন। তবে মৌলিক
লক্ষ্য তো কিছুটা হলেও অর্জিত হলো। এ বিষয়টিকে কোনো কোনো ‘ক্ষতিগ্রস্ত’
শিক্ষক ‘আমলাতান্ত্রিক চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। মেডিকেল শিক্ষা খাতেও
আজকের অবস্থায় এমন একটি ‘আমলাতান্ত্রিক চক্রান্ত’ প্রয়োজন। চিকিৎসকেরা
যেকোনো সমাজের অপরিহার্য একটি অংশ। আমরা সবাই চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল।
তাঁদের প্রতি আমাদের সম্মান ও মমত্ববোধের কোনো ঘাটতি নেই। আর যাঁরা চিকিৎসা
শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা আরও অনেক বেশি। তবে
এটা সবাই মানবেন যে তাঁদের প্রয়োজন শুধু ঢাকায় নয়। প্রয়োজন আছে দিনাজপুর,
সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জসহ দেশের সব মেডিকেল কলেজে। তাই
ওই সব মেডিকেল কলেজে কনসালট্যান্ট দিয়ে শিক্ষাদানের সাময়িক ব্যবস্থার
দ্রুত অবসান ঘটানো দরকার। আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment