![]() |
| মমতা বন্দে্যাপাধ্যায় |
কলকাতা
এখন রাজনৈতিক উত্তাপে উত্তপ্ত। রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে চার দফার ভোট
গ্রহণ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন বাকি দুই দফার ভোট। আসন বাকি ৭৮টি।
২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৬টিতে ভোট নেওয়া হয়েছে। ৩০ এপ্রিল এবং ৫ মে শেষ হবে
শেষ দুই পর্বের ভোট গ্রহণ। এবারের এই নির্বাচনে কে জিতবে, তা এখনো স্পষ্ট
হয়নি। জনমত সমীক্ষা নিষিদ্ধ থাকায় কোনো সংস্থাই এখনো এ নিয়ে আগাম কোনো
আভাস দেয়নি। তবে তৃণমূল এবং বাম-কংগ্রেস জোট উভয়ই দাবি করেছে, তারাই জিততে
চলেছে এবার। কিন্তু কে সরকার গড়বে তা জানা যাবে ১৯ মে ফলাফল ঘোষণার দিন।
তবু এখন পশ্চিমবঙ্গের গোটা নির্বাচনী ময়দান উত্তপ্ত। কে কাকে টেক্কা দিতে
পারে, চলছে তারই প্রতিযোগিতা। এই নির্বাচনের আগে গত ১৪ মার্চ দিল্লির একটি
ওয়েব পোর্টাল নারদকাণ্ড ফাঁস করে তোলপাড় করে দেয় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে।
মমতা ক্ষমতায় আসার আগ থেকেই তৃণমূলের নেতা-কর্মী সমর্থকেরা ‘সততার প্রতীক’
হিসেবে তাঁকে তুলে ধরে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই প্রচারে এতটুকু খামতি
নেই আজও। অথচ ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর ২০১৩ সালেই মমতার সরকার ও
দল ফেঁসে যায় সারদা কেলেঙ্কারিতে। কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে এই
সারদা কেলেঙ্কারিতে। সারদায় গচ্ছিত গরিবের আমানতের টাকা লুট হয়েছে। অভিযোগ
উঠেছে, সেই লুটের ঘটনার অন্যতম নেতা পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনমন্ত্রী মদন মিত্র
১৬ মাস ধরে কলকাতার কারাগারে। দুর্নীতির খাঁড়া মাথায় নিয়েও মমতাকে সততার
প্রতীক হিসেবে প্রচার করতে এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করছেন না দলীয় নেতা-কর্মীরা।
মমতা এখনো তাঁদের কাছে উন্নয়নের কান্ডারি। সৎ এবং লড়াকু নেত্রী। গত ১৪
মার্চ ফাঁস হয় নারদকাণ্ড। তৃণমূল নেতাদের ঘুষ নেওয়ার এক ভিডিও। তৃণমূলের ১১
মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়কদের ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ছবি। দিল্লির নারদ নিউজ
নামের একটি ওয়েব পোর্টাল স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে ফাঁস করে দেয় ওই ঘুষ
গ্রহণের ভিডিও। সেই ভিডিও নিয়ে রাজ্যে তোলপাড় চলছে এখনো। এবারের বিধানসভা
নির্বাচনে কংগ্রেস-বাম জোট এমনকি বিজেপিরও অন্যতম ইস্যু হলো সারদা আর নারদ
কেলেঙ্কারি কাণ্ড। সততার প্রতীকের বিরুদ্ধের এই দুটি অস্ত্র বিরোধীদের। এই
অস্ত্র বিরোধীরা নির্বাচনী ময়দানে প্রয়োগ করে ভালোই ফায়দা লুটছিল এবার।
এবার সেই ফায়দার মাঝে একটু ছেদ ঘটানোর জন্য তৎপর হয়ে পড়েন তৃণমূলের নেতারা।
না, এভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না বাম দলকে। এর একটা বিহিত করতেই হবে। সুতরাং
নতুন পরিকল্পনা। নতুন বুদ্ধি। নতুন ষড়যন্ত্র। যথাসময়ে বাম দলকে ঘায়েল করার
জন্য তৃণমূল তাদের নতুন অস্ত্র তুলে ধরে ২৪ এপ্রিল শনিবার দুপুরে। বিরাট সে
এক অস্ত্র। তৃণমূল হাজির করে বাম দলের সঙ্গে বিজেপির সখ্যের একটি ছবি।
বিজেপির প্রবীণ নেতা ও বর্তমান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের
সিপিএমের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান পলিটব্যুরো সদস্য
প্রকাশ কারাতকে লাড্ডু খাওয়ানোর ছবি। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ওব্রায়েন রীতিমতো
সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ করেন সেই ছবি। তাতে দেখা যায় প্রকাশ কারাতকে
লাড্ডু খাওয়াচ্ছেন রাজনাথ সিং। ব্যস, ফের উত্তাল হয়ে পড়ে কলকাতার রাজনীতি।
প্রশ্ন ওঠে ছবিটা কি সত্যি? যদিও তৃণমূলের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ওই ছবিটি
আপলোড করা হয়। শনিবার দুপুরের পর থেকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনীতি। রাজনৈতিক
ভাষ্যকারেরা মনে করেন, সংখ্যালঘু ভোট নিজেদের বাক্সে পোরার জন্য তৃণমূল এই
খেলা খেলেছে। প্রমাণ করতে চেয়েছে বাম দলের সঙ্গে বিজেপির রয়েছে গোপন
সম্পর্ক, সখ্য। আর এ খবর জানতে পারলে সংখ্যালঘুরা নিশ্চয়ই ভোট দেবেন না বাম
দলকে। ওই দিন বিকেলেই উল্টে যায় সব ঘটনা। রাজ্য বিজেপি থেকে জানিয়ে দেওয়া
হয় ছবিটি জাল। রাজনাথ সিং কখনো প্রকাশ কারাতকে লাড্ডু খাওয়াননি। শুধু কি
তাই, পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে থাকা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা সিদ্ধার্থ নাথ সিং
আসল ছবি প্রকাশ করে জানিয়ে দেন এটা জাল ছবি। তৃণমূল মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার
জন্য এই জালের আশ্রয় নিয়েছে। প্রকৃত ছবিটি ছিল ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর
মাসের। বিজেপি নেতৃত্ব যখন ঘোষণা করে নরেন্দ্র মোদিই হবেন তাদের দলীয়
প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী, তখনই সেদিন রাজনাথ সিং দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয়
কার্যালয়ে সবার সামনে লাড্ডু খাইয়েছিলেন মোদিকে। কেবল ফটোশপের মাধ্যমে
মোদির মাথার স্থলে প্রকাশ কারাতের ছবি লাগিয়ে এই প্রতারণা করেছে তৃণমূল।
শুধু তা-ই নয়, সেদিন মোদি যে পোশাক পরেছিলেন, প্রকাশ কারাতকেও দেখা যায় ওই
একই পোশাক পরা অবস্থায়। ব্যস, উত্তাল হয়ে ওঠে রাজনীতি। তখনই ডেরেক বুঝে
নেন, তিনি ধরা পড়ছেন। তাই সম্মান ও দলের ভাবমূর্তি বাঁচানোর জন্য সন্ধ্যায়
আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, ভুল হয়েছে। ফটোশপের কারণে এই ভুল।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমাও চেয়ে নেন। কিন্তু মাফ করার পাত্র নয় বিজেপি।
২৪ এপ্রিল রোববারই কলকাতার লালবাজারের পুলিশ হেডকোয়ার্টারে অপরাধ দমন শাখায়
মামলা ঠুকে দেয় বিজেপি। আসামি করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়,
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুব্রত বক্সী ও সাংসদ ডেরেক
ওব্রায়েনকে। মামলা দায়ের করে বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার সাংবাদিকদের
বলেন, মমতাকে আসামি করার কারণ হলো তিনিই ডেরেককে দিয়ে ওই সংবাদ সম্মেলন করে
জাল ছবি ফাঁস করেছিলেন। ডেরেকও সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, মমতার
নির্দেশেই তিনি এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। বিজেপি এই মামলা দায়ের করে
আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও ডেরেকের সাংসদ পদ বাতিলের দাবি করে। এদিকে
চুপ থাকেনি সিপিএম নেতা প্রকাশ কারাতও। তিনিও দিল্লির মন্দিরমার্গ থানার
সাইবার অপরাধ শাখায় আরেকটি মামলা ঠুকে দেন ডেরেকের বিরুদ্ধে। আবেদনে তিনি
বলেছেন, তিনি বিজেপি নেতা রাজনাথ সিংকে লাড্ডু খাওয়াচ্ছেন—এই জাল ছবি
দেখিয়ে বামদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার প্রয়াস চালিয়েছেন সাংসদ ডেরেক ওব্রায়েন।
এটা মানহানির ঘটনা। সাইবার অপরাধ। তাই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন
জানিয়েছেন তিনি। তিনি এ কথাও বলেছেন, তাঁর সঙ্গে রাজনাথ সিংয়ের এখনো দেখাই
হয়নি। কলকাতার লালবাজারে সাইবার অপরাধ শাখায়ও সিপিএম আরেকটি মামলা ঠুকে
দিয়েছে ডেরেকের বিরুদ্ধে।

No comments:
Post a Comment