![]() |
| এলিজাবেথ ড্রিউ |
ডোনাল্ড
ট্রাম্প তো মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনেও জিতে যেতে পারেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
ও অবশিষ্ট দুনিয়া বহুদিন ধরেই এই ভেবে বিস্মিত হবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো
মানুষ কীভাবে এ জায়গায় এলেন! তাঁরা ইতিমধ্যে সেটা করা শুরু করেছেন।
প্রথমত, যে ব্যাপারটা বুঝতে হবে তা হলো, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে প্রার্থী
হবেন, সে বিষয়ে মার্কিন রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু করার নেই। বস্তুত মার্কিন
রাজনৈতিক দলগুলো আসলে কিছু কর্মভারপ্রাপ্ত মানুষের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়,
যাঁরা প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া আয়োজন করেন। এরপর চার বছর
অন্তর অন্তর নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর
জয়ের প্রচারণা চালান। বাস্তবে এই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা মুক্তজীবী,
ইংরেজিতে যাকে বলে ফ্রিল্যান্সার। তাঁরা প্রতিযোগিতায় নামবেন কি না, সে
সিদ্ধান্ত নিজেদের বোধবুদ্ধির (সম্ভবত নির্বাচন) ভিত্তিতেই নেন, নির্বাচনে
তাঁরা কেমন করবেন এবং প্রয়োজনীয় তহবিল জোগাড় করতে পারবেন কি না, তার
নিরিখে। কিছু মানুষ স্রেফ অহম ও লোভের বশবর্তী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে প্রার্থীদের যে নামধাম হয়, তাতে ব্যর্থ
প্রার্থীরা বই লেখার চুক্তি, টেলিভিশনের চুক্তি ও ভালো বেতনের বক্তৃতা
দেওয়ার চাকরি পেয়ে যেতে পারেন, এমনকি এই তিনটিও একত্রে পেয়ে যেতে পারেন।
ট্রাম্প একজন সেলিব্রিটি, তার ভিত্তিতেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনি
একজন বিখ্যাত ডেভেলপার, সব ভবন ও ব্যক্তিগত সৌভাগ্যের ওপরই তাঁর নাম থাকে,
তিনি দিনের প্রধান সময়ে প্রচারিত হয় এমন একটি টিভি রিয়ালিটি শোর তারকা,
যেটি অনেক দিন ধরে চলছে। এই রিয়ালিটি শো মার্কিন সংস্কৃতিতে বেশ জনপ্রিয়।
তিনি জানতেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্টি ব্যবস্থা এতই অস্বচ্ছ যে তিনি
নিজেই প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন (অন্তত
তিনি এটাই আশা করছেন, যদি তিনি ক্লিভল্যান্ডের মনোনয়ন সম্মেলনে
যথেষ্টসংখ্যক ডেলিগেটের সমর্থন নিয়ে যেতে না পারেন)। ট্রাম্প এই সময়ের
মাজেজা ভালোভাবেই পাঠ করেছেন: তিনি শ্রমিক শ্রেণির ক্রোধ নিয়ে খেলেছেন,
মার্কিন অর্থনীতি উৎপাদন খাত থেকে সরে গিয়ে তথ্য খাতভিত্তিক হয়ে যাওয়ায়
যাঁরা ছাঁটাই হয়েছেন, তাঁদের। নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের
(নাফটা) মতো বাণিজ্য চুক্তির কারণে এই গোষ্ঠী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে, যার কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের কারখানা নিজ দেশ থেকে
মেক্সিকোতে সরিয়ে নিতে উৎসাহিত হয়েছে। এ কারণে মালিকদের হাতে শ্রমিকদের
মজুরি কমানোর তুরুপের তাস চলে এসেছে। ট্রাম্প এই নাফটার প্রচণ্ড সমালোচনা
করে বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে এমন বাণিজ্য চুক্তি করবেন, যা শ্রমিকদের
জন্য অধিকতর সুবিধাজনক হবে। শুরুর দিকে তিনি অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের
ভিত্তিতে প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি প্রচারণা শুরুই করেছিলেন মেক্সিকোর
অভিবাসীদের ‘ধর্ষক’ ও ‘খুনি’ আখ্যা দিয়ে। ট্রাম্পের প্রচারণার ভিত্তি
হচ্ছে, তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী, যদিও এটা ঠিক পরিষ্কার নয়, তিনি কতটা সফল।
কারণ, তাঁর চারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে, আর নিজের ব্র্যান্ডের
ভিত্তিতে যে কটি ব্যবসা চালু করার চেষ্টা করেছিলেন, তার মধ্যে বেশ কয়েকটি
ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার কি না, এমন প্রশ্নের
জবাবে তিনি রেগে গিয়েছিলেন। এমনকি তিনি নিজের ট্যাক্স রিটার্ন জনসমক্ষে
প্রকাশ করার প্রক্রিয়াও বন্ধ করেছেন, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর কাছ থেকে
যেটা প্রত্যাশিত। যদিও তিনি বলেছিলেন, মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল তোলা হবে,
কিন্তু এখন তিনি বাণিজ্যকেই প্রধান ব্যাপার মানছেন। তবে এটা মোটেই আপতিক
ব্যাপার নয় যে ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট বার্নি স্যান্ডার্স বাণিজ্যকে প্রধান
ইস্যু বানিয়েছেন। কারণ, ট্রাম্প ও স্যান্ডার্স দুজনেই মধ্যবিত্তের
বিদ্রোহের ওপর ভর করার চেষ্টা করছেন। যারা সদ্য কলেজ পাস করে বেরোচ্ছে,
তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১২ শতাংশ। ট্রাম্পের অধিকাংশ অনুসারী হয়তো
কলেজে যাননি, তাঁরা বাণিজ্য চুক্তির কারণে চাকরি হারিয়েছেন বা তাঁরা সেটা
মনে করেন, কিন্তু তাঁদের অন্য কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি (অথবা তাঁরা এমন
কাজে নিয়োজিত আছেন, যাঁর মজুরি বহুকাল ধরে স্থবির হয়ে আছে)। ট্রাম্পের
প্রচারণার শুরু থেকেই তার মধ্যে একধরনের ফ্যাসিবাদের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি এক শক্তিশালী মানুষ, যিনি সব প্রতিবন্ধকতা দূর করবেন, স্রেফ
ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি শ্রমিকদের জীবন উন্নত করবেন। গত নভেম্বরে আলাবামায়
এক প্রচারণা মিছিলে ট্রাম্পের সমর্থকেরা যখন একজন কালো ব্যক্তিকে
পেটাচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প তাঁদের বলেন, আরও জোরে পেটাও, তিনি চিৎকার করে
বলেন, ‘তাকে এখান থেকে বের করে দাও’। দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পেয়ে ট্রাম্প
পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি মিছিলে কথাটি উচ্চারণ করেন। অন্য রাজনীতিকেরা হয়তো
এটা এড়িয়ে যেতেন, কিন্তু ট্রাম্প তা না করে প্রতিবাদকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ
করেন: কীভাবে শক্তিশালী মানুষেরা তাঁর কথায় সাড়া দেন। ট্রাম্পের ক্ষমতা
লাভের একটি হাতিয়ার হচ্ছে সহিংসতা উসকে দেওয়া। তিনি যদি প্রেসিডেন্ট
হন—অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তিনি তা হতেও পারেন—তাহলে এ ব্যাপারে তেমন
সন্দেহ নেই যে ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি সহিংসতার দ্বারস্থ হবেন। মার্চের
মাঝামাঝি সময়ে শিকাগোর মিছিলে যে সহিংসতা হয়, তা মোটেও দুর্ঘটনা ছিল না,
নির্ধারিত স্থানে যা হওয়ার কথা ছিল, তা-ই হয়েছিল। তিনি আবার এই বলে কৃতিত্ব
নেন যে সহিংসতা শুরু হলে তিনি মিছিল বন্ধের আহ্বান জানান। ওই ঘটনার পর
তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কেব্ল সংবাদ চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে
বারবার সহিংসতার ফুটেজ দেখানো হচ্ছিল। ফলে রিপাবলিকান কর্তৃপক্ষ
ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে, তারা চেষ্টা করছে, যাতে ট্রাম্প যথেষ্টসংখ্যক
ডেলিগেটের ভোট পেয়ে মনোনয়ন না পান। কিন্তু তাদের মধ্যে বিভক্তি থাকায় এই
চেষ্টা হয়তো কাজে আসবে না। আবার উল্লিখিত কনভেনশনে তাঁকে আটকানো হবে কি না,
সে বিষয়েও তাঁরা দ্বিধাবিভক্ত। কারণ, এই চেষ্টা করা হলে ট্রাম্পের
অনুসারীরা বিদ্রোহ করতে পারেন। কয়েক সপ্তাহ আগে দেখলাম, অল্প কিছুসংখ্যক
রিপাবলিকান নিজেদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প
খুব একটা খারাপ হবেন না। কিন্তু ট্রাম্প ক্রমাগত সহিংসতায় উসকানি দিতে
থাকলে তাঁরা আবার মনকে বোঝান, না এটা সম্ভব নয়। অন্য রিপাবলিকানরা
সিদ্ধান্ত নেন, জাতীয়তাবাদ, অভিবাসীবিরোধী স্বাদেশিকতা ও জনগণ সম্পর্কিত
অজ্ঞতার কারণে তিনি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন। আর এখন তাঁদের মনে এই ভয় সৃষ্টি
হওয়ার কারণ হচ্ছে, ঝোলা থেকে কিছু বেরিয়ে গেছে, যাকে আর রোখা যাবে না।

No comments:
Post a Comment