![]() |
| শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেছে শাবেল নদীর তলদেশ। |
সোমালিয়ার
রুটির ঝুড়ি এখন ধুলোর গামলা। সম্প্রতি সে দেশের একটি নদী সম্পর্কে এমন
মন্তব্য করা হয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপির একটি প্রতিবেদনে। এটি সোমালিয়ার
শাবেল নদী। একসময়কার এই খরস্রোতা নদী এখন ধু ধু বালুতে বিলীন। সে নদীর
রেখা আছে বটে, কিন্তু বিন্দু পরিমাণ পানি নেই কোথাও। খরতাপে পোড়া সে
শুকনো বালুতে এখন ফুটবল খেলে ছেলেপুলে। পানি থই থই একটি নদী অনেক জীবনের
গল্প। নদীতে মাছ ধরে জেলে ভাই তার পেট চালায়। নদীতে নৌকা বেয়ে জীবিকা
চালায় মাঝি ভাই। নদীর পানি তীরবর্তী জনপদে কৃষিজমিতে সেচসুবিধার বিশাল এক
আধার। নদীর মিঠে জলে দুই পারের অগণিত মানুষের সংসার চলে। নদীর বালু দিয়েই
চলে ইমারত তৈরির কাজ। নদীর পলিতে উর্বরা হয় শস্যের জমি। লাখো পশুপাখির
দানাপানির উৎস একটি নদী। কাজেই কোনো নদী শুকিয়ে যাওয়া মানে অজস্র জীবন
অচল হয়ে যাওয়া। জাতিসংঘ বলছে, শাবেল নদীর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ায় সোমালিয়ায়
১০ লাখের বেশি মানুষের জীবন এখন ঝুঁকির মধ্যে। সেখানে প্রায়ই আকাশে মেঘ
জমে। বৃষ্টি ঝরার আশা জেগে ওঠে। লাখো মানুষ তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো তাকিয়ে
থাকে আকাশের দিকে। কিন্তু বৃষ্টি আর হয় না। দীর্ঘদিনের খরা যুদ্ধকবলিত
দেশটির মাটি পুড়ে তামা। শাবেল নদীর মধ্যভাগের এলাকা ও ভাটির বয়স্ক মানুষ
বলাবলি করছেন, গত কয়েক দশকের মধ্যে নদীর এমন করুণ পরিণতি তাঁরা আর দেখেননি।
এসব মানুষ বেশির ভাগই খেতখামারের ওপর নির্ভরশীল। কাজেই নদীর পানি তাঁদের
জীবিকার বড় একটি চালিকা শক্তি। যে নদীর স্রোত ঠেলে তাঁরা নৌকা বেয়েছেন,
সেখানে রোদে পোড়া শুকনো তলদেশে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। পানি না পেয়ে ভুট্টা,
কলাসহ বিভিন্ন শস্য ও ফলমূলের চাষাবাদ শিকেয় উঠেছে। কৃষক ও খামারিদের দিন
কাটছে দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে। শাবেলের তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা সোমালি
নাগরিক আদাউ আমিন বলেছেন, ‘এই নদীর তলদেশ দিয়ে আমি হেঁটে যাব—এটা স্বপ্নেও
ভাবিনি!’ তিনি আরও বলেন, ‘কল্পনা করতে পারেন—এই নদীর কোথাও কোনো পানি
নেই! একসময় যে নদীতে নৌকা বাইতাম, এখন মনে হচ্ছে এটা অন্য কোনো স্থান।’
প্রতিবেশী দেশ ইথিওপিয়ার অবস্থাও একই। শাবেল নদী এই দেশের ভেতর দিয়েও গেছে।
সেখানে টানা ৩০ বছর ধরে চলা খরা বিপন্ন করে তুলেছে নদীনির্ভর মানুষের
জীবন। পরিবেশবিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকে সতর্ক করে আসছেন জলবায়ু পরিবর্তনের
বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে। দুনিয়াজুড়ে ব্যাপক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে
অনুমিত হিসেবের চেয়ে দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এই মাটির ধরা। পৃথিবীজুড়েই
পড়ছে এর বিরূপ প্রভাব। বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া ও ঋতুচক্রে দেখা দিচ্ছে
ক্ষতিকর পরিবর্তন। কোথাও দেখা যাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাওবা চলছে
অতিবর্ষণ। বর্ষণজনিত বন্যায় ঘটছে ব্যাপক প্রাণহানি। পাকিস্তানের
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গত শনিবার রাতে প্রবল বর্ষণে দেখা দেওয়া বন্যা, ভূমিধস ও
বিভিন্ন ঘরবাড়ির চালা ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় কমপক্ষে ৫৩ জন মারা গেছে। খাইবার
পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় মারা গেছে ৪৫ জন। আমাদের দেশেও
রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছে;
মুরব্বি অনেকের চোখেই যা বেমানান ঠেকছে। বিশেষ করে চৈত্রের চিরচেনা খরতাপে
যাঁরা অভ্যস্ত, তাঁরা চৈত্রের এই কাঁদো কাঁদো সুরতটাকে ঝলসানো তেজি
চেহারার সঙ্গে মেলাতে পারছেন না। তাঁর বলছেন, চৈত্রে বৃষ্টি হবে কায়ক্লেশে,
এক পশলা কি দুই পশলা। এ যেন আষাঢ়ের মেঘমল্লার রাগ! এটা ঠিক যে কালে কালে
প্রকৃতি বদলায়। ভূপ্রকৃতির বিচিত্র খেলা এক দেশকে প্রতিবেশী দেশের পাশ থেকে
নিয়ে যায় অনেক দূরে। নদীর গতিপথ বদলে এক জনপদকে নিঃস্ব করে আরেক জায়গায়
তার ঐশ্বর্য ঢেলে দেয়। স্বাভাবিক নিয়মের ভেতর প্রকৃতির আপন হাতে তা ঘটলে
ক্ষতি নেই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ঘটলে ক্রমে তা গোটা
মানবসমাজ, তথা জীবজগতের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আর জলবায়ু
পরিবর্তনের পেছনে কলকাঠি নাড়ছি কিন্তু আমরাই। কাজেই সময় থাকতে সাবধান!
আমরা গাছ বাঁচাও, পরিবেশ বাঁচাও—বলে যত চিৎকারই করি না কেন, নির্বিচারে
বৃক্ষনিধন থেমে নেই। গাছপালা ভুষ্টিনাশ করে গড়ে তোলা হচ্ছে ইট-পাথরের
ইমারত। সবুজ পাতায় ভরা সজীব ডালপালার বদলে আকাশ ঢেকে দিচ্ছে বহুতল ভবন।
সবুজ প্রকৃতি বিলীন করে একের পর এক গড়ে উঠছে আবাসন প্রকল্প। ফ্ল্যাট
বিক্রির ব্যবসায় ভাটা পড়েছে, তবু নির্মাণকাজ থেমে নেই। গ্রামগঞ্জে গাছপালা
সব কেটেকুটে চেলাকাঠ দেওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। নদী দখল আর নদীর পানিদূষণ
চলছেই। একদা যে বুড়িগঙ্গা একটি মিঠে পানির নদী ছিল, সে স্রোতস্বিনী এখন
দূষিত নর্দমা বৈ কিছু নয়। সে নদীর জলে প্রকৃতির মাতাল করা ঘ্রাণ নেই। আছে
ভুরভুরে পচা দুর্গন্ধ। পদ্মায় এখন বালুর চড়ায় ভরা। যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের
খরস্রোত হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্জন ও দুর্বৃত্তের দখলে ভরাট হয়ে মাটিতে মুখ
লুকাচ্ছে অনেক নদী। একসময় পরিবেশবাদীরা এসব নিয়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন। এখন
তাঁরাও থেমে গেছেন। আমরা দেখছি, ভয়াবহতা উপলব্ধি করছি, কিন্তু প্রকৃতি
বাঁচিয়ে পরিবেশ রক্ষা করে জীববৈচিত্র্য তথা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় কোনো
পদক্ষেপ নিচ্ছি না। ভাবটা যেন ধ্বংসাত্মক পরিণতি দেখার জন্য সবাই প্রস্তুত।
এভাবে চলতে থাকলে খুব বেশি দিন নেই, যেদিন বুকভরা হাহাকার নিয়ে পথিক নবীর
মতো নিভৃতে বসে গাইতে হবে—আমার একটা নদী ছিল জানল না তো কেউ...!

No comments:
Post a Comment