পশ্চিম
বাংলার খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক গত ২১ ফেব্র“য়ারি (২০১৬) উপলক্ষে
বাংলাদেশের বেনাপোলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করেছেন- দুই বাংলার মধ্যে
পাসপোর্ট থাকবে কেন? তিনি বলেন, “এপার বাংলার অনেকেরই ওপার বাংলায়
জন্মস্থান। দুই বাংলার মানুষের মাতৃভাষা ‘বাংলা’ তাই আমাদের মধ্যে কোনো
ভেদাভেদ নেই।” হোন না জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ভারতের একটি ক্ষুদ্রতর রাজ্যের
মন্ত্রী। মন্ত্রী না হয়ে শুধু সাধারণ ভারতীয় হলেও জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক
নিঃসন্দেহে বোঝেন ভাষা এক হলেও বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার মধ্যে অনেক
পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্য রয়েছে বলেই পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশ এক নয়।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। আর পশ্চিম বাংলা ভারতের অধীনস্থ
একটি প্রদেশ। বাংলাদেশ কারো অধীনস্থ নয়। বাংলাদেশ যে অর্থে স্বাধীন, পশ্চিম
বাংলা সেই অর্থে স্বাধীন নয়। পশ্চিম বাংলা ভারতের অধীন। পশ্চিম বাংলার
সার্বভৌমত্ব নেই। পশ্চিম বাংলা সরকার কোনো ক্ষেত্রে ভারত সরকারের নীতি ও
নির্দেশের বাইরে কোনো কাজ করতে পারে না, এমনকি কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারে
না।
কারণ পশ্চিম বাংলা ভারতের অধীনে থেকেই নিজেকে স্বাধীন মনে করে। কিন্তু
বাংলাদেশের মতো স্বাধীন সার্বভৌম নয়, পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশ
সমমর্যাদাসম্পন্নও নয়। তাই পশ্চিম বাংলার বাসিন্দা হলেও ভারতীয় নাগরিক
হিসেবে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকদের ভারতের পাসপোর্ট নিতে হয়, পশ্চিম বাংলার
পাসপোর্ট নয়। সুতরাং দুই বাংলার মধ্যে আমাদেরই নিজস্ব পাসপোর্ট রয়েছে,
জ্যোতিপ্রিয়দের রয়েছে ভারতীয় পাসপোর্ট। ভারতের অধীন পশ্চিম বাংলার
অধিবাসীদের সাথে কেবল ভাষাগত কারণে কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে তাদের বিনা
পাসপোর্টে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া হলে তো পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশ অখণ্ড হয়ে
যায়। ভারতের অধীন পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের অখণ্ড ভূখণ্ড হওয়া মানে
বাংলাদেশকেও ভারতের অংশ হওয়া, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এমন অখণ্ড স্বাধীন
বাংলা তো ১৯৪৭ সালেই আমরা চেয়েছিলাম। তৎকালীন বাংলা পরিষদের মুসলিম সদস্যরা
অখণ্ড স্বাধীন বাংলার অনুকূলে এবং হিন্দু সদস্যরা ভারতে যোগদানের অনুকূলে
রায় দিয়েছিলেন বলেই বাংলা ভাগ হয়েছিল। আশাহত পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা
পাকিস্তানে যোগ দেয়। জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এ ইতিহাস হয়তো জানেন। এখন অখণ্ড
বাংলা না হলেও পশ্চিম বাংলার জন্য তখনই পাসপোর্ট তুলে দেয়া যায়, যদি
সেখানকার অধিবাসীরা বাংলাদেশের সাথে মিলে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র
গঠন করতে পারেন। সেই প্রশ্ন তো এখন আর উঠছে না। সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের
অত্যাচার-নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই উপমহাদেশের মুসলমানই পৃথক
আবাসভূমির দাবি করেছিলেন। আর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের গড়া পাকিস্তান
ভেঙে এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের পাসপোর্ট অর্জন করেছি। এটা আমাদের
স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, স্বাতন্ত্র্য ও অস্তিত্বের ছাড়পত্র। দুই বাংলা
কেবল ধর্ম নয়, ভাষা ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রেই এক নয়। ১৯৪৭ সালের পরও পশ্চিম
বাংলার সাথে আমাদের অনেক পার্থক্য ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পশ্চিম বাংলা
হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছে। ফলে বাংলা ভাষা সেখানে অনেকটা
এখন ফেরারি আসামির মতো সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না।
পশ্চিম বাংলার দীর্ঘ
ইতিহাসে বাংলাভাষী মুসলমানদের বাঙালি বলে স্বীকার করতে দেখা যায়নি। বলা হতো
বাংলাভাষী হিন্দুরাই হলো বাঙালি। হিন্দুরা মুসলিমদের কেমন ঘৃণা করত ষাটের
দশকে তেমন অভিজ্ঞতা আমি আমার প্রতিবেশী হিন্দুদের কাছ থেকেই পেয়েছি। এ
অমানবিক অভিজ্ঞতার আলোকে ব্রিটিশ আমলে মুসলমানদের অবস্থান কেমন দুর্বিষহ
ছিল তা অনুমান করা যায়। ইতিহাসে এসব কাহিনীর কিছু খণ্ডিত অংশ লেখা আছে।
আমরা বুঝি, মুখে এক ভাষার কথা বললেও বন্ধুত্বের বুলি আওড়ালেও প্রতিবেশি
দেশের অনেক কাজকর্মই প্রমাণ করে তারা আমাদের সুখ-শান্তি চান না। ভারতের
ভেতর দিয়ে আসা ৫৪টি নদীর পানি হতে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার বিরুদ্ধে তারা কি
কখনো প্রতিবাদ করেছেন? শুকনো মওসুমে ওই পানি আটকে রেখে বাংলাদেশকে
মরুভূমিতে পরিণত করে বর্ষাকালে সবগুলো বাঁধের দরজা খুলে দিয়ে বাংলাদেশে
বছরে দু-তিনবার বন্যা সৃষ্টি করার বিরুদ্ধে তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন
করেন। আর এখন বলছেন, আমরা ভালো থাকলে আপনারা ভালো থাকবেন। জ্যোতিপ্রিয়
দিল্লি সরকারকে এমনকি তাদের মুখ্যমন্ত্রীকে একবার কি তিনি বলেছেন, কেন
বাংলাদেশকে চুক্তি অনুযায়ী গঙ্গার পানি দেয়া হয় না, কেন তিস্তার পানি দেয়া
হয় না, কেন আন্তঃনদী সংযোগের নামে বাংলাদেশকে পুরোপুরি পানিশূন্য করার
চক্রান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে, কেন সীমান্তে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশীদের হত্যা করা
হচ্ছে, বাংলাদেশে ভারতীয় চর সৃষ্টি করে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও
কল-কারাখানা ধবংস করা হচ্ছে, যুবসমাজকে শেষ করার জন্য ফেনসিডিলের প্লাবন
বইয়ে দেয়া হচ্ছে? আমরা তো লাখ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা
অর্জন করেছি, রক্ত দিয়ে ভাষাকে রক্ষা করেছি, আর সে সড়ক বেয়ে স্বাধীন স্বদেশ
এনেছি। তাই বাংলাদেশের সাথে পশ্চিম বাংলা বা ত্রিপুরার আকাশ-পাতাল
পার্থক্য অনুধাবন করতে হবে। আমরা আমাদের পৃথক অস্তিত্ব ধরে রাখবই। আমরা
আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করছি। আমরা স্বাধীন।
সারা বিশ্ব আমাদের অবদানকে
স্মরণ করে। আমরা বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়েছি। এখন পশ্চিম বাংলার ঘরে
হিন্দি-ইংরেজির চর্চা বেশি হয়। সেখানকার বাংলা চ্যানেলে বাংলা গানের
পাশাপাশি প্রত্যেক শিল্পীই হিন্দি গান পরিবেশন করেন। হয়তো বা এসব চ্যানেলের
অনুষ্ঠানমালা বাংলাদেশীদের ভারতমুখী করার ষড়যন্ত্রকে সামনে রেখেই তৈরি করা
হয়, যেগুলো বাংলাদেশী মুসলিমদের ঈমান-আকিদা, সামাজিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির
পরিপন্থী। বাংলাদেশের কোনো চ্যানেলকেই যে ভারতে চলতে দেয়া হয় না, সে
প্রশ্ন কি তারা কখনো তুলেছেন? কলকাতার কোনো পত্রিকায় ভারতের এ নীতির কোনো
নিন্দা করে প্রবন্ধ বা সম্পাদকীয় কি ছাপা হয়েছে? এখনো ইসরাইলি সীমান্তে
কোনো ফিলিস্তিনি মেয়েকে মেরে তার লাশ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়নি।
এমন অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে ভারতের লোকসভায় বা প্রাদেশিক পরিষদে কিংবা
মন্ত্রিসভায় কোনো নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। এখন দুই বাংলার ভাষার
আত্মীয়তা দেখানো হচ্ছে। কোনো ভেদাভেদ নেই বলে ঘোষণা আসছে। পাসপোর্ট কেন
আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমরা ক্ষুদ্র হতে পারি, কিন্তু আমরা
স্বাধীন। এটা আমাদের অর্জন, আমাদের অহঙ্কার। অনেকের এই অহঙ্কার সহ্য হচ্ছে
না। তাই কখনো আমাদের সীমান্ত, কখনো আমাদের পাসপোর্ট, আমাদের স্বাধীন
অস্তিত্ব তুলে দেয়ার জন্য প্রকাশ্যে সবক দেন।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক, নিউইয়র্ক
Email: noa@agni.com
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক, নিউইয়র্ক
Email: noa@agni.com

No comments:
Post a Comment