![]() |
| আলী হোসেন |
কক্সবাজারের
টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত একটি
আনসার ক্যাম্পে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তারা
অস্ত্রাগার লুট করতে চাইলে বাধা দেন ক্যাম্পের আনসার কমান্ডার মো. আলী
হোসেন। এ সময় দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। পরে দুর্বৃত্তরা
১১টি অস্ত্র ও ৬৭০টি গুলি লুট করে পালিয়ে যায়। যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের
দায়ের কোপে আহত হন শিবিরের এক বাসিন্দাও। ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের জন্য এ
হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ, বিজিবিসহ জেলা প্রশাসন। হামলায়
অংশ নেয় ২০ থেকে ২৫ জন দুর্বৃত্ত। তাদের অনেকেই মুখোশ পরা ছিল। এর আগে গত
বছরের ১৫ মার্চ নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে ডাকাতদের সঙ্গে আনসার
সদস্যদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় দুই আনসার সদস্য আহত ও এক ডাকাত
নিহত হন। নয়াপাড়া শরণার্থীশিবিরে প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা বাস করে।
গুলিতে নিহত আনসার কমান্ডার আলী হোসেনের (৫৫) বাড়ি টাঙ্গাইলের সফীপুর
এলাকায়। গতকাল শুক্রবার বিকেলে তাঁর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর
হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং দুর্বৃত্তদের
ধরতে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন
কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ। গতকাল সকালে ঘটনাস্থল
পরিদর্শন করেন বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. তানভীর আলম
খান, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন, পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ,
টেকনাফ ২ বিজিবির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল ছিদ্দিকী, র্যাব-৭
কক্সবাজার ক্যাম্পের ইনচার্জ লে. আসিকুর রহমান, ২৯ আনসার ব্যাটালিয়নের
অধিনায়ক লে. তানজিনা বিনতে এরশাদসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। টেকনাফ ২ বিজিবির
ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল ছিদ্দিকী বলেন, রোহিঙ্গা শিবির
এলাকাকেন্দ্রিক একটি ডাকাত দল রয়েছে। ডাকাতির উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটেছে বলে
আমাদের ধারণা।
প্রায় একই কথা বলেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন।
নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সি ও ডি-ব্লকের পাশের শালবনে আনসার
ক্যাম্পটির অবস্থান। এটি শালবন ক্যাম্প নামেও পরিচিত। এখানে ১৪ জন আনসার
সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। বৃহস্পতিবার রাতে নয়জন ছিলেন। বাকি পাঁচজন ছুটিতে
ছিলেন। নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে আনসার সদস্যদের চারটি ক্যাম্প রয়েছে।
শালবন ক্যাম্পের টিনশেড ভবনের তিনটি কক্ষের মধ্যে দুটিতে আনসার সদস্যরা
থাকতেন। অপর কক্ষে থাকতেন আনসার কমান্ডার। এই কক্ষেরই একটি অংশ অস্ত্রাগার
হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বৃহস্পতিবার রাতে ক্যাম্পে পাহারার দায়িত্বে থাকা
আনসার সদস্য চন্দন কুমার বলেন, তিনজন অপরিচিত লোক ক্যাম্পের সামনে দিয়ে
হেঁটে যাওয়ার সময় তাদের পরিচয় জানতে চান তিনি। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময়
হঠাৎ পেছন থেকে আরও কয়েকজন লোক এসে তাঁর মুখ চেপে ধরে ও হাত-পা বেঁধে ফেলে।
তাঁর সঙ্গে থাকা অস্ত্রটিও কেড়ে নেয় তারা। ক্যাম্পের দরজার কাছে সামনেই
তাঁকে ফেলে রাখা হয়। এরপরই ক্যাম্পের ভেতরে ঢোকে দুর্বৃত্তরা। তারা
কামান্ডার আলী হোসেনের কাছ থেকে অস্ত্রাগারের চাবি চায়। তিনি দিতে না চাইলে
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাঁকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পরে চাবি নিয়ে অস্ত্র
লুট করে। ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ক্যাম্পে থাকা আনসার সদস্য অজিত বড়ুয়া
প্রথম আলোকে বলেন, রাত আড়াইটার দিকে ২০-২৫ জন অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত
ক্যাম্পে ঢোকে।
তখন তিনিসহ আটজন ক্যাম্পের দুটি কক্ষে ঘুমিয়েছিলেন। পাশের
কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন আনসার কমান্ডার আলী হোসেন। হঠাৎ তাঁর (আলী) ঘর থেকে
আর্তনাদের শব্দ শুনে তাঁর ঘুম ভাঙে। জেগে দেখেন সব আনসার সদস্যদের হাত-পা
বাঁধা। এ সময় দুর্বৃত্তরা তাঁকেও বেঁধে ফেলেন। টেকনাফ মডেল থানার
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, ক্যাম্পে
থাকা পাঁচটি রাইফেল, দুটি এসএমজি, চারটি এমজিটু অস্ত্র, ৬৭০ রাউন্ড গুলি,
আনসার সদস্যদের মুঠোফোন ও টাকা লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। অস্ত্রাগার লুট ও
আনসার সদস্যকে গুলি করে পালিয়ে যাওয়া রাত তিনটার দিকে শরণার্থী শিবিরের
বাসিন্দা আবদুল আমিনকেও দা দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। তাঁর স্ত্রী শারমিন
আক্তার বলেন, ডাকাতেরা পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের দিকে টর্চের আলো ফেলেছিলেন
তাঁর স্বামী। এ কারণে তাঁকে কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে যায় তারা। তাঁকে
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও
প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের সহকারী সচিব (নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরের
ইনচার্জ) সাইদুল ইসলাম বলেন, ই-শিবিরে সীমানা দেয়াল না থাকায় বহিরাগতরা
অবাধে ভেতরে ঢুকতে পারে।

No comments:
Post a Comment