Thursday, May 12, 2016

আমরা বিচারের দাবি উচ্চকিত রাখব

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী
২৩ এপ্রিল ২০১৬, সকাল সাড়ে সাতটা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ড. রেজাউল করিম সিদ্দিকী বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ধরতে। সোয়া আটটায় ছিল তাঁর ক্লাস। বাসস্ট্যান্ড বাড়ি থেকে একটা গলি পেরিয়ে দু-এক মিনিটের হাঁটাপথ। কিন্তু সেটুকু আর পেরোতে পারলেন না অধ্যাপক রেজাউল করিম। গলি পেরিয়ে মূল রাস্তায় ওঠার আগেই দুর্বৃত্তদের হাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন তিনি। ২৩ এপ্রিল তাঁর বিভাগের সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে এক তীব্র শোক ও শঙ্কার দিন হয়ে থাকবে।
২. অধ্যাপক রেজাউল করিমের সঙ্গে বিভাগের সম্পর্ক ৪০ বছরেরও বেশি। বিগত শতকের সত্তরের দশকের প্রথম ভাগে তিনি ছাত্র হিসেবে আসেন ইংরেজি বিভাগে। এরপর ১৯৮৩ সালের মার্চ মাস থেকে এই বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০০০ সালে বিভাগের ফেলো হিসেবেই ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ওপর তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিন বছর বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বিভাগে আমরা তাঁর সহকর্মীরা, যারা তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে দেখেছি, তারা অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে বর্ণনা করব একজন আপাদমস্তক শিক্ষক হিসেবে। তিনি এমন একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি যা-ই ঘটুক না কেন কখনো ক্লাস বাদ দিতে চাননি; এমন একজন শিক্ষক, যিনি ক্লাসে টেক্সট হাতে নিয়ে ‘বিটুইন দ্য লাইনস’ আলোচনা করতেন; যিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ক্লাসেও হাতে ধরে শিখিয়ে দিতে চাইতেন কীভাবে পরীক্ষার খাতায় ভালো উত্তর লিখতে হয়; এমন একজন শিক্ষক, যিনি ছাত্রদের চিন্তা করতে শেখান, তাদের ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করার নিরন্তর প্রয়াস চালাতেন। অধ্যাপক রেজাউল করিম বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। এর সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও তাঁর আগ্রহ ছিল। কোমল গান্ধার নামে ছোট্ট একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি। আমাদের বিভাগের ছাড়াও অন্য বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও সেখানে গল্প-কবিতা লিখতেন। নিজের খরচেই তিনি তা ছাপাতেন। বেশি টাকা-পয়সা তাঁর ছিল না, বাড়তি আয়ের জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি কখনো পড়াতে যেতেন না। তবু তিনি নিজ খরচে স্বল্প পরিসরে কখনো কখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন বিভাগের কোনো কক্ষে বা করিডরে অথবা শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের সামনের বাগানে। কোনো কোনো সময় তাঁকে নিজ অফিসকক্ষে অবসর সময়ে সেতার বাজাতে দেখা যেত। বিভাগের গরিব শিক্ষার্থী কিংবা এলাকার দুস্থ মানুষজনকে তিনি নীরবে আর্থিক সহায়তা দিতেন। গ্রামে শিশু-কিশোরদের জন্য ছোট্ট একটা গানের স্কুল খুলেছিলেন, ক্রিকেট খেলার সরঞ্জামও কিনে দিয়েছিলেন নিজ পয়সায়। একই সঙ্গে গ্রামের মসজিদ-মাদ্রাসায় নিয়মিত দান করেছেন তিনি।
অধ্যাপক রেজাউল করিম সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী ছিলেন না, না ছিলেন রাজনৈতিক দলের মতানুসারী। এমন একজন নিরীহ, নির্বিবাদী, নিঃস্বার্থ, শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা মানুষের এ রকম মর্মান্তিক মৃত্যু আমরা, তাঁর সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। ক্ষোভ, হতাশা ও আতঙ্ক আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আমাদের জীবনের স্বাভাবিক গতি আর নেই। বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। আমরা জানি না, কবে আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে পারব। রেজাউল করিমের মতো একজন সাতপাঁচে না থাকা এবং শ্রেণিকক্ষ, নিজ চেম্বার, বাড়ি, পড়ার টেবিল, গান-কবিতা এটুকু গণ্ডির মধ্যে বিচরণ করা একজন মানুষকে যদি আচমকা সাতসকালে খুন হয়ে যেতে হয়, তাহলে তাঁর সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তাঁদের পক্ষে এখন পঠন-পাঠন, ক্লাস, পরীক্ষা, খাতা দেখা ও গবেষণায় মনোসংযোগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেজাউল করিম অত্যন্ত পড়ুয়া স্বভাবের ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখে অনার্সে প্রথম ও মাস্টার্সে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। তাঁর হাতে সব সময়ই একটি বা দুটি বই থাকত, সুযোগ পেলেই গল্প-গুজবে সময় না কাটিয়ে পড়তে শুরু করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে তাঁকে নিয়মিতই দেখা যেত। অত্যন্ত ছাত্রবান্ধব শিক্ষক ছিলেন তিনি। কী করলে ছাত্রদের ভালো হবে, সব সময় সে চিন্তাই তিনি করতেন। বিভাগীয় খেলাধুলার সব প্রতিযোগিতাতেই তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খেলোয়াড় শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতেন; জয়-পরাজয়ে সব সময়ই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। শিশুসুলভ সারল্য ও আনন্দ নিয়ে বিভাগের যেকোনো অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর ট্রাইপড-স্ট্যান্ড ও ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে এসে গ্যালারির মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুরো অনুষ্ঠানটিই রেকর্ড করতেন, ছবি তুলতেন। সহকর্মীদেরও আপনজনের মতো দেখেছেন। তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরদিন বিভাগের শোকসভায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা দেখেছেন, ওনার ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের চোখে কেমন বান এসেছিল।
৩. ড. রেজাউল করিম সিদ্দিকীর ডাক নাম ছিল মুকুল। তিনি অত্যন্ত সৎ ও স্পষ্টবাদী একজন মানুষ ছিলেন। প্রিয় এই শিক্ষক ও সহকর্মীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষুব্ধ প্রতিবাদে এবং দ্রুত প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও বিচারের দাবিতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন ‘মুকুল প্রতিবাদ ও সংহতি মঞ্চ’। প্রতিদিনই বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মী ও নানা শ্রেণির মানুষ মুকুল মঞ্চে এসে আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছেন। হত্যাকাণ্ডের দিন থেকেই ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নানা কর্মসূচি পালন করছেন এবং এখনো তা অব্যাহত রেখেছেন। অন্য বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দিচ্ছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও প্রতিদিন নানা কর্মসূচি পালন করছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ডাকে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
ইংরেজি বিভাগের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের পরপরই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। সরকারের যেসব সংস্থা এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে, তাদের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। মানববন্ধন, শোকর্যাছলি, প্রতিবাদ সমাবেশ তো চলছেই। আমরা ন্যায়বিচারের জন্য জোর দাবি জানিয়েই চলেছি; কিন্তু যাঁরা বিষয়টি দেখছেন, তাঁরা এ ব্যাপারে কতটা অগ্রসর হয়েছেন, আমরা সত্যিই তা জানি না। তবে আমরা এক্ষুনি আশাহত হচ্ছি না। আমরা শুধু চাইব, এই মামলার তদন্তভার যাঁদের ওপর ন্যস্ত, তাঁরা পেশাগত দক্ষতা, যোগ্যতা ও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করবেন। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম ছেড়ে এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আমাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে। যত দিন এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হচ্ছে, তত দিন আমরা প্রিয় শিক্ষক ও সহকর্মীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি উচ্চকিত রাখব।
এম আতর আলী, এম শহীদুল্লাহ, এম জহুরুল ইসলাম, অসীম কুমার দাস, মো. শহীদুর রহমান, শেহনাজ ইয়াসমীন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মাসউদ আখতার, রুবাইদা আখতার, মুহাম্মদ তারিক-উল-ইসলাম, মো. মোমিনুল ইসলাম, মোহা. সাখাওয়াত হোসেন, মাহবুবা হাসিনা, মো. অসিউজ্জামান, রিদিতা মিজান: নিহত অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম সিদ্দিকীর সহকর্মী, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments:

Post a Comment