বায়োমেট্রিক
পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনের পূর্বনির্ধারিত সময়সীমা আগামী মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে।
গতকাল পর্যন্ত নিবন্ধন হয়েছে প্রায় পৌনে ১০ কোটি সিম। বিটিআরসির সর্বশেষ
হিসাব অনুযায়ী দেশের ছয়টি মোবাইল ফোন অপারেটরের বর্তমান গ্রাহকসংখ্যা ১৩
কোটি আট লাখ ৮১ হাজার। ওই হিসেবে এখনো সোয়া তিন কোটিরও বেশি সিম অনিবন্ধিত
রয়েছে। এ ছাড়া সিম নিবন্ধন করতে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে আঙুলের ছাপ না
মেলাসহ নানা জটিলতায় এক কোটি গ্রাহক নিবন্ধন করাতে পারেননি। সে জন্য
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপুল এ সিম পুনঃনিবন্ধন নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন
সংশ্লিষ্টরা। তবে সিম নিবন্ধনের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে মন্ত্রণালয় ও
বিটিআরসি। এ দিকে সিম নিবন্ধন করতে গিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায়,
একজনের আঙুলের বেশি সংখ্যক ছাপ নিয়ে তার অজান্তেই অন্যের সিম নিবন্ধন এবং
নিবন্ধিত সিম দিয়ে জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। এতে চরম ক্ষুব্ধ
নিবন্ধন করতে আসা ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা। এসব ঘটনায় মোবাইল অপারেটরসহ
সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছে বিটিআরসি। ভুয়া পরিচয় দিয়ে মোবাইলের সিমকার্ড
কিনে নানা অপরাধে ব্যবহারের অভিযোগ বাড়তে থাকায় গত বছর গ্রাহকদের সিম
পুনঃনিবন্ধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। এরপর গ্রাহকদের সিমের তথ্য যাচাইয়ে শুরু
হয় জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহারের প্রক্রিয়া। গত বছরের ১৬
ডিসেম্বর সিম নিবন্ধনে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করে সরকার, যা গত মাসের ৩০
তারিখে শেষ করার কথা ছিল। তবে অপারেটরদের আবেদন এবং অনিবন্ধিত গ্রাহকদের
কথা বিবেচনায় রেখে সময়সীমা এক দফা বাড়িয়ে ৩১ মে পর্যন্ত করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এরপর আর সময় না বাড়িয়ে অনিবন্ধিত সব সিম
বন্ধ করে দেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, আঙুলের ছাপে অমিল, জাতীয়
পরিচয়পত্রে ভুল, সার্ভারের ত্রুটিসহ বেশ কয়েকটি কারণে বিপুল গ্রাহকের সিম
নিবন্ধন সম্পন্ন হয়নি। এ ছাড়া নিবন্ধনের শুরু থেকেই আঙুলের ছাপ নিয়ে
বিতর্ক, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ইস্যুতে নিবন্ধনে অনেকেই অনীহা প্রকাশ করেন।
এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ও আঙুলের ছাপ বাইরে চলে যেতে পারে বা
নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক লেখালেখিও হয়।
এ
কারণে অনেকেই নিজের সিম বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন না করার সিদ্ধান্তও
নেন। একপর্যায়ে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন বন্ধ করতে আদালতে রিট করা হয়।
তবে আদালত বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনের পে রায় দেন। ফলে কিছু দিন
থমকে থাকলেও আদালতের রায়ের পর নিবন্ধনে আবারো গতি ফিরে আসে। গত কয়েক দিনে
অপারেটরদের কাস্টমার কেয়ারে নিবন্ধনের অপক্ষোয় বিপুল উপস্থিতি লক্ষ করা
গেছে। বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, সিম নিবন্ধনে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক
এগিয়ে থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটক সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। প্রাপ্ত তথ্য
অনুসারে গতকাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সিম নিবন্ধন করেছে গ্রামীণফোন। এরপর
পর্যায়ক্রমে রয়েছে বাংলালিংক, রবি, এয়ারটেল ও সিটিসেল। এ দিকে সিম
নিবন্ধনের শেষ সময়ে এসে সার্ভার ত্রুটি ও গতি কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন
গ্রাহকেরা। কাস্টমার কেয়ারগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা
যায় অনেককে। নিবন্ধনের গতি কম থাকায় অনেকেই আবার এক কাস্টমার কেয়ার থেকে
অন্য কাস্টমার কেয়ারে ঘুরেও কোনো সুরাহা না হওয়ায় ফের ফিরে যান। এ দিকে সিম
নিবন্ধনে কোনো ধরনের লেনদেন করতে মন্ত্রণালয় থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও
গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০-৩০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া
যাচ্ছে। মোবাইল অপারেটরদের নির্দিষ্ট কাস্টমার কেয়ারগুলোতে এ ধরনের অভিযোগ
না থাকলেও রিটেইলারদের বিরুদ্ধে এ রকম হাজারো অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে
ভুক্তভোগীরা কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে
দাবি করেছেন। এ ছাড়া নিবন্ধন করতে যাওয়া গ্রাহকদের অজান্তেই অসংখ্যবার
আঙুলের ছাপ নিয়ে অন্যদের সিম নিবন্ধন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিটিআরসিও বিষয়টি স্বীকার করেছে। গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে বিটিআরসি
মহাপরিচালক (সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এমদাদ
উল বারী বলেন, ‘সিম নিবন্ধনে রিটেইলাররা বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার চেষ্টা
করছেন। গত মাসে আশুলিয়ায় একজন রিটেইলার গ্রাহকের অসাবধানতার সুযোগে আঙুলের
ছাপ নিয়ে একাধিক সিম নিবন্ধন করা হয়। ছাপ মেলেনি বলে বারবার ওই গ্রাহকের
ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।’
এ ব্যাপারে গ্রাহকদের
সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী বলেন ‘একজন গ্রাহককে
সচেতন হতে হবে। তিনি যতবার আঙুলের ছাপ দিচ্ছেন ততবার যে নম্বরগুলোকে
রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে তা যাচাই করে নিতে হবে।’ আর সম্প্রতি চট্টগ্রামে
নিবন্ধিত হয়ে যাওয়া সিম জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যজন তুলে নিয়ে ‘বিকাশ’
অ্যাকাউন্টের টাকা মেরে দেয়ার ঘটনা সংশ্লিষ্ট সবাইকে আতঙ্কিত করেছে। এ
ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অপারেটর এবং বিকাশ কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দায়ী করছে। সিম
নিবন্ধনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান
শাহজাহান মাহমুদ বলেন, সিম নিবন্ধনের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে আমরা সন্তুষ্ট।
সরকারের বেঁধে দেয়া নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ৩১ মে রাত ১২টা পর্যন্ত সিম
পুনঃনিবন্ধন করা যাবে। এরপর যেসব সিমের নিবন্ধন থাকবে না; সেগুলো বন্ধ করে
দেয়া হবে। ৩১ মে ‘জিরো আওয়ার’ থেকেই এ সিমগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। বন্ধ হয়ে
যাওয়া সিমগুলো টানা দুই মাস, অর্থাৎ অগাস্টের আগে আর কেনার সুযোগ থাকবে না।

No comments:
Post a Comment