১৯৯১
সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি। ৪৫ বছর আগেও সোভিয়েত
ইউনিয়নের কাছ থেকে এ অবস্থানটি দখল করতে নানা কৌশল আর তৎপরতার মধ্যে চালিয়ে
যাচ্ছিল তারা। ওই সময়টায় বোঝা যায়নি, যুক্তরাষ্ট্রই এই লড়াইয়ে চূড়ান্তভাবে
জয়ী হবে। বহুবার, বহু সময় তাদের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এরও আগে বিংশ
শতাব্দীর গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্র ছিল উদীয়মান শক্তি। বিশ্বে নিজের অবস্থান
তৈরির চেষ্টা করছিল। ১৯৯১ সাল থেকে নতুন একটি ভূমিকায় নামে যুক্তরাষ্ট্র।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়াতে বিস্ময় তৈরি হয়েছিল তাদেরও। স্নায়ুযুদ্ধের
সময় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ছিল সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে জটিল কিছু জোট তৈরি
করা। জোটের সঙ্গী হয়েই মার্কিন বাহিনী সে সময় লড়াই করেছে। আর তাদের
অর্থনৈতিক সখ্য তৈরি হয়েছে সেসব দেশের সাথে যাদের সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে
কোনো না কোনো বৈরিতা ছিল। এক সময় এসে দেখা যায়, সামরিক ও অর্থনৈতিক-
দু’ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনৈতিকভাবে
জোটসঙ্গীদের সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছে তারা। একই সাথে সামরিক ক্ষেত্রে
বেশির ভাগ উগ্যোগই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এ ক্ষেত্রে জোটসঙ্গীদের অংশগ্রহণ
ছিল তাদের সাধ্যের চেয়েও অনেক কম।
এক
সময় বোঝা গেল, কৌশলগত ও নৈতিকভাবে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। আবার এ
বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, মার্কিন সেনার উপস্থিতি মানেই জোটের সদস্যদের
নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নয়। কোরিয়া বা ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ১৯৫৮ সালের লেবানন বা
১৯৮৩ সালের গ্রানাডা লড়াই সর্বোপরি কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে
যুক্তরাষ্ট্রের যে গোপন তৎপরতা তার কোনোটিই পুরোপুরি সাফল্যের মুখ দেখেনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশ আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ এবং
মিউনিখ চুক্তির ওপর ভরসা করেই চলছিল। জামার্নরা চেকোস্লোভাকিয়ার অংশবিশেষ
দখল করে নিলে তাতেও অনুমোদন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তবে এক সময় তারা বুঝতে
পারে, মিউনিখ চুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্রুতই
অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনীতে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই
শিক্ষা থেকেই স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে ওয়াশিংটন। মজার বিষয় হলো, এই
কৌশলই কিন্তু শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে। পরমাণু যুদ্ধ বেধে যায়নি।
প্রকৃত বৈসাদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র তার প্রকৃত জাতীয় কৌশল খুঁজে নিতে ব্যর্থ হয়। পার্ল হারবারের পর যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিক্রিয়া ছিল ৯/১১-এও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় তারা। মিত্রদের নিয়ে বহুজাতিক বাহিনী গঠন করে তারা। এ দফায়ও মিউনিখের শিক্ষাকেই মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে তারা। কিন্তু ওই কৌশল এবার আর কাজ করেনি। ইসলামপন্থী মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে পুরনো কৌশল ব্যবহার করে সাফল্য পায়নি তারা। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশলে চলেছে তা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর ব্যর্থ হয়। এর মধ্যেই ন্যাটো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ নানান সংস্থা তৈরি এবং ব্যর্থ হয়।
প্রকৃত বৈসাদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র তার প্রকৃত জাতীয় কৌশল খুঁজে নিতে ব্যর্থ হয়। পার্ল হারবারের পর যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিক্রিয়া ছিল ৯/১১-এও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় তারা। মিত্রদের নিয়ে বহুজাতিক বাহিনী গঠন করে তারা। এ দফায়ও মিউনিখের শিক্ষাকেই মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে তারা। কিন্তু ওই কৌশল এবার আর কাজ করেনি। ইসলামপন্থী মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে পুরনো কৌশল ব্যবহার করে সাফল্য পায়নি তারা। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশলে চলেছে তা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর ব্যর্থ হয়। এর মধ্যেই ন্যাটো, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ নানান সংস্থা তৈরি এবং ব্যর্থ হয়।
যুক্তরাষ্ট্র
বরাবরই এই সংস্থাগুলোকে নিয়েই এগোতে চেয়েছে। তাদের আশঙ্কা ছিল, অন্যথায়
নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে তারা। এই আশঙ্কা থেকেই এশিয়ায় বেশি করে জড়িয়ে পড়ে
ওয়াশিংটন। জাপানের বিরুদ্ধে চীনকে সহযোগিতা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি
থেকে আমাদেরও শিক্ষণীয় বিষয় আছে। সেনা নামানো যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ
পদক্ষেপ। কোনো সঙ্কটে শুরুতেই তারা সেনা ব্যবহার করে না। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনা নামানোর বিষয়টি নির্ভর করত আঞ্চলিক
শক্তিগুলোর পরিস্থিতির ওপর। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য দিত কিন্তু
ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে না পড়া পর্যন্ত জাপান ও জামার্নির আক্রমণের
পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়নি। তারা হস্তক্ষেপ করেছে বেশ পরে।
যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী সন্দেহ নেই, কিন্তু সরাসরি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে
পুরো বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। অতীতে ব্রিটিশ বা রোমানরাও
তাদের নিজ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে শাসন করেনি, বরং স্থানীয় সঙ্ঘাতকেই
কৌশলে ব্যবহার করেছে তারা। ব্রিটিশরা লাখ লাখ সেনা ব্যবহার করে ভারত দখল
করেনি।
তারা প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর
মধ্য থেকে নিজেদের সুবিধামতো বেছে নিয়ে তাদের সমর্থন জুগিয়েছে। আর এই
পক্ষগুলোই পরস্পরের সাথে বিবাদে একে অপরকে ধরাশায়ী করেছে। ১৯৯১ সাল থেকেই
প্রশ্ন জেগেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষমতা রক্ষা এবং ব্যবহার করবে কী করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে কার্যকর
নয়। কারণ এ দেশগুলোর প্রচলিত সামরিক বাহিনীকে ধ্বংসের পর তাদের এই শূন্যতা
পূরণের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক সেনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। স্নায়ুযুদ্ধের সময়
যে জোট গড়ে ওঠে সেগুলোর সাথেও নতুন এই বিশ্বপরিস্থিতির কোনো সাদৃশ্য নেই।
ফলে জোটগুলো ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরনো নীতিই আঁকড়ে ধরে থাকলে
ব্যর্থ হয় তারাও। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে। তবে তা
কোনোভাবেই তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব ও ইসরাইলের চেয়ে বেশি নয়। আবার ইউরোপেরও
এই অঞ্চলে আগ্রহ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট করতে হবে, এই অঞ্চলে তারাই
মুখ্য শক্তি নয়। এ ক্ষেত্রে ইউরোপকে সহায়তা করতে পারে তারা। তবে ইউরোপ যদি এ
অঞ্চলের প্রয়োজনীয় সেনাবাহিনী গড়তে ব্যর্থ হয় তবে এর পরিণতি অবশ্যই তাদের
ভোগ করতে হবে। একমাত্র বিশ্বশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই পুরো
বিশ্বের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
তবে
সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে সর্বত্রই মুখ্য ভূমিকা পালন তাদের পক্ষে সম্ভব
নয়। দু’টি লড়াইয়ের মধ্যবর্তী পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে কৌশল তা যথাযথ।
আবার স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও তাদের নেয়া কৌশল যথাযথ ছিল। তবে দু’টি কৌশলই এক
সময় একই সাথে কার্যকর নয়। যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধের-পরবর্তী পরিস্থিতির
সাথে যথার্থভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি। তাদের কৌশলে পরিবর্তন আসা প্রয়োজন,
এমনটিও বুঝে উঠতে পারেনি তারা। বর্তমানে তাদের সবচেয়ে বড় সঙ্কটটি হলো, কোন
বিষয়গুলো দেশটির জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ তা তারা বুঝে উঠতে পারছে না। ফলে
বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি বিশ্বের স্থিতিশীলতার দায়িত্ব নিতে পারছে না।
চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে সহায়তা দিতে
পারে। নিজেরাও জড়িয়ে যেতে পারে। তবে বিশ্বপরিস্থিতি বা স্বার্থ নিয়ন্ত্রণ
তাদের ক্ষমতার বাইরে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও স্বার্থের ওপর
দৃষ্টি রেখে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে হবে। একই সাথে এই স্বার্থগুলো যখন
চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে তখন কাজ করারও ইচ্ছা থাকতে হবে। আর সেটাই হবে এখনকার
কৌশল।
অনুবাদ : তানজিলা কাওকাব
অনুবাদ : তানজিলা কাওকাব

No comments:
Post a Comment