Saturday, May 7, 2016

সুইফট ও ফেডের সঙ্গে গভর্নরের বৈঠক হবে সুইজারল্যান্ডে

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক (নিউইয়র্ক ফেড) ও আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক মাধ্যম সুইফটের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করতে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির বিষয়টি নিয়ে ১০ মে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে ত্রিপক্ষীয় এক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। চুরি যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে এ বৈঠকে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চুরির ঘটনায় কার কতটুকু দায়দায়িত্ব তা নিয়েও আলোচনা হবে। বাংলাদেশ মনে করে, এ ঘটনায় নিউইয়র্ক ফেড ও সুইফটের দায় রয়েছে। অন্যদিকে সুইফট ও নিউইয়র্ক ফেড একাধিকবার বলেছে যে তাদের কোনো দায় নেই। দুর্বলতা বাংলাদেশ ব্যাংকের। বৈঠকে অংশ নিতে ৮ মে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার কথা রয়েছে গভর্নরের। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। গভর্নরের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ওই বৈঠকে অংশ নেবেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি (প্রকারান্তরে ৫ ফেব্রুয়ারি) বিশ্বজুড়ে আলোচিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনার পর নিউইয়র্ক ফেড ও সুইফটের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের ওই বৈঠকটিই হবে প্রথম আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় সভা। আর গত ২০ মার্চ দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবিরের এটাই হবে প্রথম বিদেশ সফর। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স বলেছে, সুইজারল্যান্ডের ওই বৈঠকে অংশ নেবেন নিউইয়র্ক ফেডের সভাপতি বা প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ডাডলি। তবে সুইফটের পক্ষ থেকে কে ওই বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। রয়টার্স আরও বলেছে, সুইজারল্যান্ডের ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসিও উপস্থিত থাকবেন। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, নিউইয়র্ক ফেড ও সুইফটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে গভর্নরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দল সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে। সেখানে ১০ মে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে নাম প্রকাশ না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় ফেড নিউইয়র্ক ও বেলজিয়ামভিত্তিক সুইফটেরও কিছু দায়দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, রিজার্ভের অর্থ স্থানান্তরে সুইফটের বার্তা ব্যবহার করে যে ৩৫টি আদেশ পাঠানো হয়েছিল, তার মধ্যে ৩০টি আদেশ আটকে দেওয়া হয়েছিল। যদি ৩০টি আদেশ আটকানো সম্ভব হয়, তবে অপর পাঁচটি আদেশ কেন আটকানো গেল না? তাই বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এ ক্ষেত্রে ফেড নিউইয়র্ক তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার পরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একাধিক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে মোট ১০১ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়। অর্থ স্থানান্তরের পাঁচটি আদেশের মাধ্যমে এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চলে যায় ফিলিপাইনে। আর বাকি ২ কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কায়। শ্রীলঙ্কা থেকে ইতিমধ্যে ২ কোটি ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ফিরে এসেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনাটি প্রথম জানাজানি হয় ফেব্রুয়ারির শেষে। ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়ারার-এ এ নিয়ে অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে মার্চের শুরুতে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনায় আসে। এ ঘটনার দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান। দুজন ডেপুটি গভর্নরকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদিকে, ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়ারার ডট নেটের গত মঙ্গলবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থ স্থানান্তরে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) বরখাস্ত হওয়া শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুয়েইতো। রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় আরসিবিসির মাকাতি শহরের জুপিটার স্ট্রিট শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মায়াকে বরখাস্ত করা হয়। দেশটির সিনেটের শুনানিতে এ ঘটনার সঙ্গে মায়ার সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। পরে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) সাবেক ব্যাংকার মায়া ও দেশটির ব্যবসায়ী কিম ওয়ংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। ওই মামলায় আদালতে মায়া তাঁর সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন বলে ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইন্টারপোলের ছয় সদস্যের দল বাংলাদেশে: রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় জব্দ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটারের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাইয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) সহায়তা দিতে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের ছয় সদস্যের একটি দল এসেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁরা ঢাকায় এসে পৌঁছান। ইন্টারপোলের ছয় সদস্যের দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্র্যাড মারডেন। সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইন্টারপোলের ছয় সদস্যের প্রত্যেকেই ফরেনসিক ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গত ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে। তদন্ত তদারকির সঙ্গে যুক্ত সিআইডির অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক শাহ আলম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ইন্টারপোলের দলটি আগামী শুক্রবার দেশ ছাড়বে। এ সময় মামলাটির অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শাহ আলম বলেন, তদন্ত বেশ অগ্রগতি হচ্ছে। শিগগিরই এ বিষয়ে তাঁরা জানাতে পারবেন। এদিকে গতকাল বুধবার সকাল থেকে ইন্টারপোলের সদস্যরা জব্দ করা কম্পিউটার ও ডিভাইসের বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে সিআইডিকে সহায়তা দিতে কাজ শুরু করেছেন। রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় সিআইডি বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কিছু কম্পিউটারসহ বেশ কিছু ডিভাইসের তথ্য-উপাত্ত জব্দ করেছে।

No comments:

Post a Comment