Thursday, May 26, 2016

অভিন্ন জলপ্রপাত

বিশ্বে এমন কিছু জলপ্রপাত আছে যা সত্যিই অভিন্ন। যার মালিক ভিন্ন দু’টি দেশ। জলপ্রপাতের দু’টি দিক হলো দু’টি দেশের সীমানা। আরেকটি বিস্ময় হলো অভিন্ন নদী নিয়ে নদীর পানি নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি হলেও জলপ্রপাত নিয়ে এখন অবধি তেমন বড় কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়নি। বরং দু’দেশই পর্যটন শিল্পের বিকাশে রেমিট্যান্সের কারণেই বোধকরি মিলেমিশে প্রপাতের দেখভাল করে থাকে। প্রতি বছর বিশ্বের মোট পর্যটন মুনাফার প্রায় ১১ শতাংশ আসে বিভিন্ন জলপ্রপাত থেকে। পর্যটকদের জলপ্রপাতের প্রতি আলাদা আকর্ষণ থাকে। এর মধ্যে সীমান্ত প্রপাত হলে তো কথাই নেই।
ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত
এটি বিশ্বের অন্যতম একটি প্রপাত। রেটিংয়ে নায়াগ্রা প্রপাতের পরই এর অবস্থান। এটির অবস্থান আফ্রিকা মহাদেশে। জিম্বাবুয়ে ও জাম্বিয়া সীমান্তে এটি অবস্থিত। তবে আরেকটি কারণে পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ সব থেকে বেশি। পানির ধোঁয়া! বা ধূমায়িত পানি! ঘোর লাগা ঝমঝম শব্দের ঝংকার তুলে অতলে নেমে যাচ্ছে পানির খরস্রোত। আর পানির সে মারাত্মক বেগের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বাষ্প। আকাশ ছুঁয়েছে বাষ্প। সেখানে আবার তৈরি হচ্ছে মন উচাটনী রংধনু। এ সৌন্দর্যের কারণেই এর স্থানীয় নাম মসি-ওয়া-তুনইয়া। অর্থ বজ্র সৃষ্টিকারী ধোঁয়া। মূল প্রপাত থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূর থেকেই দেখা যায় এ আকাশ ছোঁয়া ধোঁয়া। বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী যেন হাত বাড়িয়ে টেনে নিতে চায় পর্যটকদের। জিম্বাবুয়ের সীমান্ত শহর ভিক্টোরিয়ার নামানুসারেই প্রপাতের নাম ভিক্টোরিয়া রাখা হয়। প্রপাতের উচ্চতা বা গভীরতা ১০৮ মিটার এবং প্রশস্ততা ১৭০৮ মিটার। প্রপাতে প্রতি সেকেন্ডে ৩৮ হাজার ৪৩০ ঘনফুট পানি আছড়ে পড়ে। তবে, বছরের বিভিন্ন সময়ে এর পানিপ্রবাহের পরিমাণ ওঠানামা করে। এপ্রিলে এটি পূর্ণ গতিবেগে থাকে।
তেথিয়ান জলপ্রপাত এটি এশিয়ার সব থেকে বড় জলপ্রপাত। কিন্তু বিশ্বের মধ্যে চতুর্থতম মতভেদে দ্বিতীয় বড় সীমান্ত জলপ্রপাত। চীন ও ভিয়েতনাম সীমান্তে এর অবস্থান। এটির উৎপত্তি কুইছুন নদী থেকে। মূলত এটি একটি সম্মিলিত জলপ্রপাত। চীনের তেথিয়ান জলপ্রপাত এবং এর পাশেই ভিয়েতনামের ব্যানইয়ু নামের আরেকটি জলপ্রপাত। দু’টি জলপ্রপাত এক জায়গায় গিয়ে যুক্ত হয়েছে। এদের সম্মিলিত নাম ব্যানজিওক। তবে এটি সাধারণত তেথিয়ান নামেই পরিচিত। চীনের কুয়াংসি প্রদেশের তাজিন জেলার হেং লও গ্রাম এবং অপরপাশে ভিয়েতনামের ট্রানখান জেলার কাওপিং গ্রাম। প্রপাতটির উচ্চতা বা গভীরতা ৮০ মিটার এবং প্রশস্ততা ২০০ মিটার ছাড়িয়ে। অপরূপ বর্ণাঢ্য এর রূপ। ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়ার সময় মোট তিনটি ধাপে এর পানি প্রবাহিত হয়।
আবার এই প্রপাতটিতে তিনটি দিক থেকেই তিনটি স্রোতে পানি প্রবাহিত হয়ে আছড়ে পড়ে, যা এক অপার বিস্ময়। তবে এর আসল চমক হলো ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ। ভরা বসন্তে প্রপাতের চার পাশ লালচে বর্ণ ধারণ করে। তার মাঝে প্রপাতটিকে লাগে উজ্জ্বল সাদা একখণ্ড সিল্ক বস্ত্রের মতো। যার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকানো দায়। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। শরতে উজ্জ্বল সোনালি আভায় ভরে যায় প্রপাতের চার পাশ। পানি থাকে টলটলে। শীতে প্রপাতের গতিবেগ অনেক কমে যায়। তবে ভরা গ্রীষ্মেই তেথিয়ানের প্রকৃত রূপ অবলোকন করা যায়। কারণ তখন প্রপাত হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। প্রপাতের সে রুদ্ররূপই পর্যটকদের কাছে টানে বেশি।
নায়াগ্রা জলপ্রপাত
এটি বিশ্বের সব থেকে জনপ্রিয় ও পরিচিত জলপ্রপাত। বিশ্বের আনাচে কানাচের ছেলেবুড়ো সব মানুষই নায়াগ্রার নাম জানেন। এর অবস্থান উত্তর আমেরিকায়। একে বিশ্বের সব থেকে বড় জলপ্রপাত মনে করা হয়। যদিও অতীতে এটিই সব থেকে বড় বলে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তবে, পরে অন্যান্য জলপ্রপাতের সাথে এর বড়ত্ব নিয়ে মতদ্বৈধতা রয়েছে। এটি আমেরিকা ও কানাডার সীমান্তে অবস্থিত। এটি দু’টি ধারায় বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ধারা দু’টির ভিন্ন নামও রয়েছে। একটির নাম হর্স শু প্রপাত। এটি দেখতে ঘোড়ার খুড়ের আকৃতির। তাই এর এই নামকরণ। এটি পুরোটাই কানাডা সীমান্তে অবস্থিত। আরেকটির নাম লুনা প্রপাত বা ব্রাইডাল ভিল প্রপাত। এটি আমেরিকা সীমান্তে অবস্থিত।
মজার ব্যাপার হলো এর দু’টি ধারারই নিজস্ব কিছু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। যেন প্রত্যেকেই আপন মহিমায় ভাস্বর। কানাডা সীমান্তের হর্স শু প্রপাতের উচ্চতা বা গভীরতা ৫৩ মিটার। প্রশস্ততা ৭৯২ মিটার। এর প্রবাহের গতিবেগ। হর্স শু অংশ দিয়েই নায়াগ্রার ৯০ শতাংশ পানি প্রবাহিত হয়। আমেরিকান সীমান্তের লুনা প্রপাতেরর উচ্চতা প্রায় ২১ মিটার। প্রশস্ততা ৩২৩ মিটার। নায়াগ্রার পানিপ্রবাহের গতিবেগ সেকেন্ডে দুই লাখ বারো হাজার ঘনফুট।
এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নায়াগ্রা উপভোগের মওসুম। এ সময় দু’দেশই সমঝোতার মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ সময় পানির গতিবেগ সেকেন্ডে এক লাখ ঘনফুটে নামানো হয় এবং সন্ধ্যার পর আরো কমিয়ে পঞ্চাশ হাজার ঘনফুট করা হয়। আমেরিকান সীমান্ত থেকে নায়াগ্রা প্রপাতের পেছন অংশ দেখা যায়। কানাডা সীমান্তেই সামনে থেকে এটির পূর্ণ রূপ দেখা যায়। প্রতিটি জলপ্রপাতের পানি আছড়ে পড়লেই ফেনার সৃষ্টি হয়। নিচে থাকা পাথরের ক্যালসিয়াম কার্বোনেট এর কারণ। তবে এত উঁচু থেকে ফেনা অতটা পরিষ্কার বোঝা যায় না। নায়াগ্রা এদিক থেকেও ব্যতিক্রম। এর ফেনা বিশাল আকার ধারণ করে এবং তাতে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে অপরূপ মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করে। এটি আবিষ্কারের দিক থেকে সব থেকে প্রাচীন জলপ্রপাত। ১৮ শতকের শুরু থেকেই এতে পর্যটক আসতে শুরু করে।

No comments:

Post a Comment