সংবিধানের
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংসদ সদস্যরা।
গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ
কয়েকজন এমপি রায়ের বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আনিসুল হক
হাইকোর্টের রায়কে ‘সংবিধান পরিপন্থি’ উল্লেখ করে বলেন, আদালতের এই রায়
মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাইকোর্টের এই রায় সংবিধান পরিপন্থি, তাদের এই রায়
দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। ষোড়শ সংবিধান সংশোধন বিল মোটেই অবৈধ নয়, তাদের
কথাও গ্রহণযোগ্য নয়। আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে হাইকোর্টের এই রায়ের
বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করবো। আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী,
আপিল বিভাগে হাইকোর্টের এই রায় টিকবে না।
গতকাল স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে এ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ উত্তপ্ত বিতর্ক চলে। পয়েন্ট অব অর্ডারে বিতর্কের পর আইন প্রণয়ন কার্যাবলীর সময় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়ে আইনমন্ত্রী একটি বিল উত্থাপন করতে গেলে তিনি এমপিদের তোপের মুখে পড়েন। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা নিজ আসনে দাঁড়িয়ে এই বিলের বিরোধিতা করে হৈচৈ করে আইনমন্ত্রীকে বক্তব্য দিতে বাধা দেন। স্পিকার বারবার আইনমন্ত্রীকে তার বক্তব্য শেষ করার সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানালেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তাদের অবস্থানে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদ অধিবেশন থেকে চার মিনিটের জন্য ওয়াক আউট করেন। চার মিনিট পর সংসদে ফিরে এসে বিলটির বিরোধিতা করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলেন, বিচারপতিরা সবই পারেন, নিজেদের বেতন-ভাতা বাড়াতে পারেন না? জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা হীনম্মন্যতার শিকার হবো না, আমরা উদারতা দেখাতে চাই। পরে তীব্র বিরোধিতার মুখেই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক উত্থাপিত “সুপ্রিম কোর্ট জাজেস (রেম্যুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) বিল-২০১৬ কণ্ঠভোটে পাস হয়।
উত্তপ্ত সংসদ
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর এই অনির্ধারিত বিতর্কের সূত্রপাত করেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম। কয়েক দফায় আলোচনায় অংশ নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের তীব্র বিরোধিতা করেন সরকারি দলের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ ও মুজিবুল হক চুন্নু। পরে বিলের ওপর আলোচনাতেও দলের সংসদ সদস্যরা হাইকোর্টের রায়ের তীব্র বিরোধিতা করেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ৩০০ বিধিতে সংসদে বলেন, আদালতের এই রায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাইকোর্টের এই রায় সংবিধান পরিপন্থি। হাইকোর্ট এমন রায় দেয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। ষোড়শ সংবিধান সংশোধনী বিল মোটেই অবৈধ নয় এবং তাদের কথাও গ্রহণযোগ্য নয়। আগামী রবি বা সোমবার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, আপিল বিভাগে হাইকোর্টের এই রায় টিকবে না। আইনমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর সর্বসম্মতভাবে ষোড়শ সংবিধান সংশোধনী আইন পাস করেছি। সেখানে আমাদের মধ্যে কারও কোনো দ্বিমত ছিল না। আজ (বৃহস্পতিবার) হাইকোর্ট ডিভিশনে রায় হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে এটা অবৈধ। যদিও পুরো রায় এখনো হাতে পাইনি। একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা হৈচৈ করে উঠেন। স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, এটাই শেষ সিদ্ধান্ত নয়, এর পরেও আপিল করা যায়। আমরা এখানে যে বিলটা পাস করেছিলাম, সেটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, বিজ্ঞ বিচারপতিদের সম্মান অক্ষুণ্ন থাকে- সেজন্যই এই সংশোধনী করা হয়েছে। কিন্তু উনারা আজ বলে দিলেন এটা অবৈধ! আমি বলছি এটা মোটেই অবৈধ না। তাদের কথা গ্রহণযোগ্যও না।
মন্ত্রী বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, এটা কোনোভাবেই অবৈধ নয়। আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। বিচার বিভাগ স্বাধীন। তাই আপিল করলে এই রায় গ্রহণযোগ্য হবে না। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আগামী রবি সোমবারের মধ্যে আপিল করবো। আমরা শুধু আইন প্রণয়ন করি না, আমরা যে আইন করি তা শ্রদ্ধা করি। আমরা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র সহ্য করবো না।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমাদের জাতীয় সংসদ সার্বভৌম। অথচ হাইকোর্টের রায়ে আমরা হতবাক ও বিস্মিত হয়েছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে আমরা এ দেশকে স্বাধীন করেছি, লাখো মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছে। অথচ হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, মূল সংবিধানে বিচারপতির অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের কাছে ছিল, কিন্তু সেটি ছিল ইতিহাসের একটি দুর্ঘটনা! আমরা বিচারপতি নিয়োগ দিই, তারাই আমাদেরকে, মূল সংবিধানকে বলেন ইতিহাসের দুর্ঘটনা! আমরা ক্ষমতায় রয়েছি বলেই অনেকে বিচারপতি হতে পেরেছেন। তিনি বলেন, সংসদের কোনো আইন যদি হাইকোর্ট বাতিল করে তবে এটা হবে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। এটা হতে দেয়া যায় না। আমরা আশা করি আপিল বিভাগ থেকে ন্যায়বিচার পাব। পাস হওয়া আইন বাতিল করা হলে সংসদের সার্বভৌম কোথায় থাকে? এটি বেশি চলতে দেয়া যায় না, এর শেষ হওয়া উচিত। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই সংবিধান রচিত হয়। ১৯৭২ সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসন করার ক্ষমতা এই সংসদেরই ছিল। আমরা যেটা আইন তৈরি করি, ওনারা (বিচারপতি) সেটা কার্যকর করেন। আইনের বাইরে গিয়ে কারও কোনো কিছু করা ঠিক না। তাহলে সীমানা লঙ্ঘন হয়। হাইকোর্টের রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না সেটা খুঁজে দেখতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা নাগরিককে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। সে বিচারপতি হোক, রাষ্ট্রপতিই হোক। রাষ্ট্রপতিও যদি অপরাধ করে তাঁরও বিচার সংসদ করতে পারে। তিনি বলেন, সংসদ হচ্ছে জনগণের সার্বভৌম অধিকারের প্রতীক। এই সংসদ যদি রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে, তাহলে বিচারপতিদের পারবে না কেন? এই সংসদে আইন পাস করেই তো তাদের ওখানে বসিয়েছি। আইনবহির্ভূত কোনো বিচার করার জন্য ওখানে পাঠানো হয় নাই। তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধি এবং জনগণের শক্তি সংসদকে অকার্যকর এবং ধ্বংস করার জন্য কোনো অশুভ শক্তি আইনের দোহাই দিয়ে আইনবহির্ভূত কাজ করছে। যারা এই আইন এবং সংবিধানবহির্ভূত কাজ করছে তাদেরকেও বিচার করতে এই সংসদ থেকে আইন করার দরকার। মাঝে মাঝে শুনি কোনো কোনো বিচারপতি এই সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে কটূক্তি করেন। বিচারপতিরা বিচারপতির জায়গায় থাকবেন। সংসদ সদস্যরা সংসদের জায়গায় থাকবেন। কিন্তু এমপিদের কটূক্তি করা কোনোভাবেই বাঞ্ছনীয় নয়। ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কোনো উক্তি করলে, আর সেটি যেই করুক, তাকেও আইনের আওতায় আনার দাবি করছি। ১৯৭২ সালের সংবিধান রক্তে অর্জিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংবিধানকে যারা চ্যালেঞ্জ করে, তারা যেন পাকিস্তানে চলে যায়। ওই আইয়ুব-ইয়াহিয়ার যুগে চলে যায়। ৭২ সালের সংবিধানের দাড়ি, কমা, সেমিকোলন বাদ দেয়ার অধিকার কারও নেই। বিচারপতিদের উদ্দেশে শেখ সেলিম বলেন, আপনারা বাড়াবাড়ি করবেন না। সংসদকে অকার্যকর করে, সংসদকে নস্যাত করে যদি কোনো অশুভ শক্তির সঙ্গে হাত মেলান, তাহলে জনগণ সময়মতো আপনাদের জবাব দেবে।
জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, এই সংসদ স্বাধীন ও সার্বভৌম। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এই সংসদ গঠিত। এই জাতীয় সংসদে ষোড়শ সংবিধান (সংশোধন) আইন পাস হয়। এতে প্রমাণিত সত্য সাপেক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যদের ভোট এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে কোনো বিচারপতিকে অপসারণ করা যাবে। বাহাত্তরের সংবিধানেই এই বিষয়টি ছিল। এই সংসদের মান-মর্যাদা দেখার দায়িত্ব স্পিকারের। এই সংসদ স্বাধীন ও সার্বভৌম। এভাবে চললে সংসদের কোনো মান-মর্যাদা থাকবে না।
জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, এই বাংলাদেশ হাজারো সমস্যা কাটিয়ে সারা পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। সেই বাংলাদেশকে ঘিরে দেশে-বিদেশে নানারকম ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করছি। যারা বিচার বিভাগকে প্রতিনিধিত্ব করছেন তারা ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন কি না জানি না। ইচ্ছাকৃতভাবে এমন রায় দিয়ে একটি সংঘাত পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে, যা সত্যিই অনভিপ্রেত। সংসদ সদস্য ও সংসদকে অবমাননা করলে আর কিছুই থাকে না। সংসদে ছোট করে দেখলে তা বিপদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যই দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই সংসদ হচ্ছে সার্বভৌম। প্রথমেই বলেছিলাম ষড়যন্ত্রের কথা। আমি দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করছি- আপনি (প্রধান বিচারপতি) যেমন বলেছেন আমরা অজ্ঞ, কিন্তু আপনার মতো বিজ্ঞ মানুষটি এটা জানেন না। তাহলে এই বিতর্ক উত্থাপন করছেন কেন? ইচ্ছাকৃতভাবে যেখানে আপনারা কথা বলতে পারতেন, পার্টিসিপেট করতে পারতেন, কিন্তু আপনারা সেখানে পার্টিসিপেট না করে চট করে একটি রায় দিচ্ছেন। এই রায় দেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি সংঘাত সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন। যা একান্তই অনভিপ্রেত। তিনি বলেন, সংসদকে অমর্যাদা করলে সংসদ সদস্যদের অমর্যাদা করলে আসলে কিছুই থাকে না। সংসদ সদস্যদের ছোট করে দেখলে বিপদ যেটা হতে তার এটাও একটি বিপদের লক্ষণ এবং আমরা কেউ যেন ভুলে না যাই। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার যুদ্ধে সমস্ত বিশ্ব একবাক্যে বাঙালির যুদ্ধটি মেনে নিয়েছে। কারণ ওই যুদ্ধের পিছনে শুধু বন্দুক ছিল না, একটি সংসদের রায় ছিল। এই জায়গাটাই আমরা বারবার ভুলে যাই।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন ভারত, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাজ্যে যদি বিচারপতিদের ইমপিচমেন্ট থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশে থাকতে পারবে না কেন? রাষ্ট্রপতিকে যদি সংসদ ইমপিচ করতে পারে, একজন বিচারপতিকে অসদাচরণের জন্য ইমপিচ করতে পারবে না- এটা কেমন কথা? উচ্চ আদালত রাষ্ট্রের ভেতরে নাকি বাইরে? তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান। সুপ্রিম কোর্ট যা বলবে তাই করবো, নাকি জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করবো- এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই।
জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অর্গান আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ। আইনসভা থেকে আমরা আইন তৈরি করি এবং কার-কত শক্তি নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয়, কিছু দিন আগে ষোড়শ সংশোধনী আইন-২০১৪ নামে যে আইনটি পাস করলাম, যেটি গেজেট আকারে প্রকাশ হয়েছে, হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি কোর্ট এটি অবৈধ ঘোষণা করেছে। তাহলে আমরা যে আইন পাস করি, সেটি কি অবৈধ আইন হয়? এটি আমার জানার দরকার আছে। যে আইন পাস করি এভাবে যদি একটার পর একটা অবৈধ ঘোষণা হতে থাকে, তাহলে আইনসভার মর্যাদা থাকে না।
বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিলেও বিরোধিতা ও ওয়াক আউট
বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিল অধিবেশনে উত্থাপনকালে তোপের মুখে পড়েন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই বিলের উত্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করে নিজ আসনে দাঁড়িয়ে হৈচৈ করেন। একপর্যায়ে ৫টা ৪০ মিনিটে কিছু সময়ের জন্য প্রতীকী ওয়াক আউট করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখেই শেষে কণ্ঠভোটে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করে আইনমন্ত্রীর উত্থাপিত “সুপ্রিম কোর্ট জাজেস (রেম্যুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) বিল-২০১৬ পাস হয়। বিলটির বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, কেন সংসদে বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বাড়াতে হবে, তারা কী নিজেরা নিজেদের বেতন-ভাতা বাড়াতে পারে না? বিচারপতিরা যদি সংসদের ওপর এত খবরদারি করতে পারেন, তবে আমরা উদারতা দেখাব কেন? তিনি বলেন, যুদ্ধের মাধ্যমে এদেশকে স্বাধীন করে বাহাত্তরের সংবিধান পেয়েছি। হাইকোর্টের এই রায় পুরো সংসদ ও ১৬ কোটি জনগণের জন্য অবমাননাকর। তাই এই রায় স্থগিত না হওয়া পর্যন্ত বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিল স্থগিত করা হোক। তিনি বলেন, যে সংসদ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ ও অপসারণ করতে পারে, একটি সরকারকে অবৈধ করতে পারে, তবে কেন একজন বিচারপতিকে কিছু করতে পারবে না?
জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, আজকে হাইকোর্ট যেভাবে রায় দিয়ে সংবিধানের সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন, সেই হিসেবে ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসার ব্যাপারেও কোনো রায় দিতে পারেন। তখন সরকার কী করবে? এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ কেন ব্যবস্থা নিতে পারলো না, অ্যাটর্নি জেনারেল কেন হাইকোর্টে হারলেন? এখন বলছেন আপিল বিভাগে যাবেন, সেটাও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা হীনম্মন্যতার শিকার হবো না, আমরা উদারতা দেখাতে চাই। আর এটা কোনো ব্যক্তির জন্য নয়, প্রতিষ্ঠানের জন্য। বিচারপতিরা সবই করেন, বলেন- কিন্তু নিজেদের বেতন-ভাতা ঠিক করতে পারেন না। সেটি সংসদকেই করতে হয়। তিনি বলেন, আদালত থেকে যে রায় দেয়া হয়েছে তা সংবিধান পরিপন্থি। এমন রায় দেয়ার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের নেই। তিনি বলেন, বিচারপতিরা অবিবেচক হতে পারেন, কিন্তু এ সংসদ অবিবেচক নয়। বিচারপতিরা তাদের রায় যাই লিখুক না কেন, আমরা আইন প্রণয়ন করতে পারি। আমরা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত। হীনম্মন্যতার কথা ভুলে গিয়ে আমরা যে উদারতা দেখাতে পারি, তার প্রমাণ দেব। পাসকৃত বিলে প্রধান বিচারপতির বেতন বৃদ্ধি করে এক লাখ ১০ হাজার টাকা, আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বেতন এক লাখ ৫ হাজার টাকা এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের বেতন বৃদ্ধি করে ৯৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
গতকাল স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে এ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ উত্তপ্ত বিতর্ক চলে। পয়েন্ট অব অর্ডারে বিতর্কের পর আইন প্রণয়ন কার্যাবলীর সময় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়ে আইনমন্ত্রী একটি বিল উত্থাপন করতে গেলে তিনি এমপিদের তোপের মুখে পড়েন। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা নিজ আসনে দাঁড়িয়ে এই বিলের বিরোধিতা করে হৈচৈ করে আইনমন্ত্রীকে বক্তব্য দিতে বাধা দেন। স্পিকার বারবার আইনমন্ত্রীকে তার বক্তব্য শেষ করার সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানালেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তাদের অবস্থানে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদ অধিবেশন থেকে চার মিনিটের জন্য ওয়াক আউট করেন। চার মিনিট পর সংসদে ফিরে এসে বিলটির বিরোধিতা করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলেন, বিচারপতিরা সবই পারেন, নিজেদের বেতন-ভাতা বাড়াতে পারেন না? জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা হীনম্মন্যতার শিকার হবো না, আমরা উদারতা দেখাতে চাই। পরে তীব্র বিরোধিতার মুখেই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক উত্থাপিত “সুপ্রিম কোর্ট জাজেস (রেম্যুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) বিল-২০১৬ কণ্ঠভোটে পাস হয়।
উত্তপ্ত সংসদ
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর এই অনির্ধারিত বিতর্কের সূত্রপাত করেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম। কয়েক দফায় আলোচনায় অংশ নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের তীব্র বিরোধিতা করেন সরকারি দলের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ ও মুজিবুল হক চুন্নু। পরে বিলের ওপর আলোচনাতেও দলের সংসদ সদস্যরা হাইকোর্টের রায়ের তীব্র বিরোধিতা করেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ৩০০ বিধিতে সংসদে বলেন, আদালতের এই রায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাইকোর্টের এই রায় সংবিধান পরিপন্থি। হাইকোর্ট এমন রায় দেয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। ষোড়শ সংবিধান সংশোধনী বিল মোটেই অবৈধ নয় এবং তাদের কথাও গ্রহণযোগ্য নয়। আগামী রবি বা সোমবার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, আপিল বিভাগে হাইকোর্টের এই রায় টিকবে না। আইনমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর সর্বসম্মতভাবে ষোড়শ সংবিধান সংশোধনী আইন পাস করেছি। সেখানে আমাদের মধ্যে কারও কোনো দ্বিমত ছিল না। আজ (বৃহস্পতিবার) হাইকোর্ট ডিভিশনে রায় হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে এটা অবৈধ। যদিও পুরো রায় এখনো হাতে পাইনি। একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা হৈচৈ করে উঠেন। স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, এটাই শেষ সিদ্ধান্ত নয়, এর পরেও আপিল করা যায়। আমরা এখানে যে বিলটা পাস করেছিলাম, সেটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, বিজ্ঞ বিচারপতিদের সম্মান অক্ষুণ্ন থাকে- সেজন্যই এই সংশোধনী করা হয়েছে। কিন্তু উনারা আজ বলে দিলেন এটা অবৈধ! আমি বলছি এটা মোটেই অবৈধ না। তাদের কথা গ্রহণযোগ্যও না।
মন্ত্রী বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, এটা কোনোভাবেই অবৈধ নয়। আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। বিচার বিভাগ স্বাধীন। তাই আপিল করলে এই রায় গ্রহণযোগ্য হবে না। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আগামী রবি সোমবারের মধ্যে আপিল করবো। আমরা শুধু আইন প্রণয়ন করি না, আমরা যে আইন করি তা শ্রদ্ধা করি। আমরা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র সহ্য করবো না।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমাদের জাতীয় সংসদ সার্বভৌম। অথচ হাইকোর্টের রায়ে আমরা হতবাক ও বিস্মিত হয়েছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে আমরা এ দেশকে স্বাধীন করেছি, লাখো মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছে। অথচ হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, মূল সংবিধানে বিচারপতির অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের কাছে ছিল, কিন্তু সেটি ছিল ইতিহাসের একটি দুর্ঘটনা! আমরা বিচারপতি নিয়োগ দিই, তারাই আমাদেরকে, মূল সংবিধানকে বলেন ইতিহাসের দুর্ঘটনা! আমরা ক্ষমতায় রয়েছি বলেই অনেকে বিচারপতি হতে পেরেছেন। তিনি বলেন, সংসদের কোনো আইন যদি হাইকোর্ট বাতিল করে তবে এটা হবে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। এটা হতে দেয়া যায় না। আমরা আশা করি আপিল বিভাগ থেকে ন্যায়বিচার পাব। পাস হওয়া আইন বাতিল করা হলে সংসদের সার্বভৌম কোথায় থাকে? এটি বেশি চলতে দেয়া যায় না, এর শেষ হওয়া উচিত। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই সংবিধান রচিত হয়। ১৯৭২ সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসন করার ক্ষমতা এই সংসদেরই ছিল। আমরা যেটা আইন তৈরি করি, ওনারা (বিচারপতি) সেটা কার্যকর করেন। আইনের বাইরে গিয়ে কারও কোনো কিছু করা ঠিক না। তাহলে সীমানা লঙ্ঘন হয়। হাইকোর্টের রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না সেটা খুঁজে দেখতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা নাগরিককে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। সে বিচারপতি হোক, রাষ্ট্রপতিই হোক। রাষ্ট্রপতিও যদি অপরাধ করে তাঁরও বিচার সংসদ করতে পারে। তিনি বলেন, সংসদ হচ্ছে জনগণের সার্বভৌম অধিকারের প্রতীক। এই সংসদ যদি রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে, তাহলে বিচারপতিদের পারবে না কেন? এই সংসদে আইন পাস করেই তো তাদের ওখানে বসিয়েছি। আইনবহির্ভূত কোনো বিচার করার জন্য ওখানে পাঠানো হয় নাই। তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধি এবং জনগণের শক্তি সংসদকে অকার্যকর এবং ধ্বংস করার জন্য কোনো অশুভ শক্তি আইনের দোহাই দিয়ে আইনবহির্ভূত কাজ করছে। যারা এই আইন এবং সংবিধানবহির্ভূত কাজ করছে তাদেরকেও বিচার করতে এই সংসদ থেকে আইন করার দরকার। মাঝে মাঝে শুনি কোনো কোনো বিচারপতি এই সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে কটূক্তি করেন। বিচারপতিরা বিচারপতির জায়গায় থাকবেন। সংসদ সদস্যরা সংসদের জায়গায় থাকবেন। কিন্তু এমপিদের কটূক্তি করা কোনোভাবেই বাঞ্ছনীয় নয়। ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কোনো উক্তি করলে, আর সেটি যেই করুক, তাকেও আইনের আওতায় আনার দাবি করছি। ১৯৭২ সালের সংবিধান রক্তে অর্জিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংবিধানকে যারা চ্যালেঞ্জ করে, তারা যেন পাকিস্তানে চলে যায়। ওই আইয়ুব-ইয়াহিয়ার যুগে চলে যায়। ৭২ সালের সংবিধানের দাড়ি, কমা, সেমিকোলন বাদ দেয়ার অধিকার কারও নেই। বিচারপতিদের উদ্দেশে শেখ সেলিম বলেন, আপনারা বাড়াবাড়ি করবেন না। সংসদকে অকার্যকর করে, সংসদকে নস্যাত করে যদি কোনো অশুভ শক্তির সঙ্গে হাত মেলান, তাহলে জনগণ সময়মতো আপনাদের জবাব দেবে।
জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, এই সংসদ স্বাধীন ও সার্বভৌম। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এই সংসদ গঠিত। এই জাতীয় সংসদে ষোড়শ সংবিধান (সংশোধন) আইন পাস হয়। এতে প্রমাণিত সত্য সাপেক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যদের ভোট এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে কোনো বিচারপতিকে অপসারণ করা যাবে। বাহাত্তরের সংবিধানেই এই বিষয়টি ছিল। এই সংসদের মান-মর্যাদা দেখার দায়িত্ব স্পিকারের। এই সংসদ স্বাধীন ও সার্বভৌম। এভাবে চললে সংসদের কোনো মান-মর্যাদা থাকবে না।
জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, এই বাংলাদেশ হাজারো সমস্যা কাটিয়ে সারা পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। সেই বাংলাদেশকে ঘিরে দেশে-বিদেশে নানারকম ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করছি। যারা বিচার বিভাগকে প্রতিনিধিত্ব করছেন তারা ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন কি না জানি না। ইচ্ছাকৃতভাবে এমন রায় দিয়ে একটি সংঘাত পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে, যা সত্যিই অনভিপ্রেত। সংসদ সদস্য ও সংসদকে অবমাননা করলে আর কিছুই থাকে না। সংসদে ছোট করে দেখলে তা বিপদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যই দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই সংসদ হচ্ছে সার্বভৌম। প্রথমেই বলেছিলাম ষড়যন্ত্রের কথা। আমি দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করছি- আপনি (প্রধান বিচারপতি) যেমন বলেছেন আমরা অজ্ঞ, কিন্তু আপনার মতো বিজ্ঞ মানুষটি এটা জানেন না। তাহলে এই বিতর্ক উত্থাপন করছেন কেন? ইচ্ছাকৃতভাবে যেখানে আপনারা কথা বলতে পারতেন, পার্টিসিপেট করতে পারতেন, কিন্তু আপনারা সেখানে পার্টিসিপেট না করে চট করে একটি রায় দিচ্ছেন। এই রায় দেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি সংঘাত সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন। যা একান্তই অনভিপ্রেত। তিনি বলেন, সংসদকে অমর্যাদা করলে সংসদ সদস্যদের অমর্যাদা করলে আসলে কিছুই থাকে না। সংসদ সদস্যদের ছোট করে দেখলে বিপদ যেটা হতে তার এটাও একটি বিপদের লক্ষণ এবং আমরা কেউ যেন ভুলে না যাই। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার যুদ্ধে সমস্ত বিশ্ব একবাক্যে বাঙালির যুদ্ধটি মেনে নিয়েছে। কারণ ওই যুদ্ধের পিছনে শুধু বন্দুক ছিল না, একটি সংসদের রায় ছিল। এই জায়গাটাই আমরা বারবার ভুলে যাই।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন ভারত, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাজ্যে যদি বিচারপতিদের ইমপিচমেন্ট থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশে থাকতে পারবে না কেন? রাষ্ট্রপতিকে যদি সংসদ ইমপিচ করতে পারে, একজন বিচারপতিকে অসদাচরণের জন্য ইমপিচ করতে পারবে না- এটা কেমন কথা? উচ্চ আদালত রাষ্ট্রের ভেতরে নাকি বাইরে? তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান। সুপ্রিম কোর্ট যা বলবে তাই করবো, নাকি জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করবো- এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই।
জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অর্গান আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ। আইনসভা থেকে আমরা আইন তৈরি করি এবং কার-কত শক্তি নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয়, কিছু দিন আগে ষোড়শ সংশোধনী আইন-২০১৪ নামে যে আইনটি পাস করলাম, যেটি গেজেট আকারে প্রকাশ হয়েছে, হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি কোর্ট এটি অবৈধ ঘোষণা করেছে। তাহলে আমরা যে আইন পাস করি, সেটি কি অবৈধ আইন হয়? এটি আমার জানার দরকার আছে। যে আইন পাস করি এভাবে যদি একটার পর একটা অবৈধ ঘোষণা হতে থাকে, তাহলে আইনসভার মর্যাদা থাকে না।
বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিলেও বিরোধিতা ও ওয়াক আউট
বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিল অধিবেশনে উত্থাপনকালে তোপের মুখে পড়েন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই বিলের উত্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করে নিজ আসনে দাঁড়িয়ে হৈচৈ করেন। একপর্যায়ে ৫টা ৪০ মিনিটে কিছু সময়ের জন্য প্রতীকী ওয়াক আউট করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখেই শেষে কণ্ঠভোটে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করে আইনমন্ত্রীর উত্থাপিত “সুপ্রিম কোর্ট জাজেস (রেম্যুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) বিল-২০১৬ পাস হয়। বিলটির বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, কেন সংসদে বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বাড়াতে হবে, তারা কী নিজেরা নিজেদের বেতন-ভাতা বাড়াতে পারে না? বিচারপতিরা যদি সংসদের ওপর এত খবরদারি করতে পারেন, তবে আমরা উদারতা দেখাব কেন? তিনি বলেন, যুদ্ধের মাধ্যমে এদেশকে স্বাধীন করে বাহাত্তরের সংবিধান পেয়েছি। হাইকোর্টের এই রায় পুরো সংসদ ও ১৬ কোটি জনগণের জন্য অবমাননাকর। তাই এই রায় স্থগিত না হওয়া পর্যন্ত বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিল স্থগিত করা হোক। তিনি বলেন, যে সংসদ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ ও অপসারণ করতে পারে, একটি সরকারকে অবৈধ করতে পারে, তবে কেন একজন বিচারপতিকে কিছু করতে পারবে না?
জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, আজকে হাইকোর্ট যেভাবে রায় দিয়ে সংবিধানের সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন, সেই হিসেবে ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসার ব্যাপারেও কোনো রায় দিতে পারেন। তখন সরকার কী করবে? এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ কেন ব্যবস্থা নিতে পারলো না, অ্যাটর্নি জেনারেল কেন হাইকোর্টে হারলেন? এখন বলছেন আপিল বিভাগে যাবেন, সেটাও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা হীনম্মন্যতার শিকার হবো না, আমরা উদারতা দেখাতে চাই। আর এটা কোনো ব্যক্তির জন্য নয়, প্রতিষ্ঠানের জন্য। বিচারপতিরা সবই করেন, বলেন- কিন্তু নিজেদের বেতন-ভাতা ঠিক করতে পারেন না। সেটি সংসদকেই করতে হয়। তিনি বলেন, আদালত থেকে যে রায় দেয়া হয়েছে তা সংবিধান পরিপন্থি। এমন রায় দেয়ার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের নেই। তিনি বলেন, বিচারপতিরা অবিবেচক হতে পারেন, কিন্তু এ সংসদ অবিবেচক নয়। বিচারপতিরা তাদের রায় যাই লিখুক না কেন, আমরা আইন প্রণয়ন করতে পারি। আমরা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত। হীনম্মন্যতার কথা ভুলে গিয়ে আমরা যে উদারতা দেখাতে পারি, তার প্রমাণ দেব। পাসকৃত বিলে প্রধান বিচারপতির বেতন বৃদ্ধি করে এক লাখ ১০ হাজার টাকা, আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বেতন এক লাখ ৫ হাজার টাকা এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের বেতন বৃদ্ধি করে ৯৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।

No comments:
Post a Comment