Saturday, May 28, 2016

কন্যা শিশুর নৈতিকতায় পরিবারের ভূমিকা

সায়মা বেগমের বাড়ির টেলিভিশন নষ্ট হয়ে গেছে। বাড়িতে মেকানিক এসেছেন। বললেন, টিভিটা পুরনো। ম্যাডাম এটা পুরনো হয়ে গেছে বদলে ফেলুন। সায়েমা বেগম বললেন, বললেই তো বদলানো যায় না রঙিন টিভির তো অনেক দাম। মেকানিক পুরনো টিভিটি সারিয়ে, বিদায় নিলেন। মেকানিক ছেলেটি চলে যেতেই সায়েমা বেগমের মেয়ে দশ বছরের রুবিনা রাগে ফেটে পড়লো। মা তুমি বললে কেন যে টিভির দাম অনেক। ছেলেটি আমাদের গরীব ভাবলো না? সায়েমা বেগম উত্তর দিলেন, তাতে কি, আমাদের তো চোর ভাবেনি। অসৎ ভাবেনি। আমরা সৎ পথে আয় করি। তাই আমরা চট করেই একটি টিভি কিনতে পারি না। শিশুমন সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক 'সাদা কাগজের মতো বলে সহজেই পরিবেশের ছাপ পড়তে থাকে। আর সেভাবেই শিশুর ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। সে জন্যই প্রতিদিনের ব্যবহার ও আচার আচরণের মধ্য দিয়েই শিশুদের কোনটা ভাল কোনটা মন্দ শেখাতে হবে। অর্থাৎ নৈতিকতা শেখাতে হবে। শিশুকে জানা, শিশুমনকে জানা এবং শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মা তাকে যেভাবে শেখাবে সে সেভাবেই তা আত্মস্থ করবে। শিশুর কাছে মা প্রধান আনন্দের উৎস। তারপর বাবা। মাতৃক্রোড় শিশুর নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করে। অতি শৈশবকাল হতেই মায়ের মমতা শিশুমনে গভীর প্রত্যয় তৈরি করে। শৈশবে মায়ের অনুপস্থিতি অবহেলা শিশুর মানসিক বিকাশকে ব্যাহত করে।
শিশু আত্মবিশ্বাস হারাতে থাকে। তাই মা-কে শিশুর প্রতি শৈশব থেকেই যতœশীল হতে হবে। মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, একজন মা যা বলবে তা পরিবারের অন্য দশ জন বললেও হবে না। মাকে শিশুরা বিরাট মহিরুহ মনে করে। পরিবার প্রথম পাঠশালা। বাবা-মা প্রধান শিক্ষক। তাদের সন্তানের প্রতি নিবিড় দৃষ্টি দিতে হয়, স্নেহ-বাৎসল্যে তাদের হয়ে উঠতে হয় ‘পাওয়ার প্যারেন্টস’। এ ক্ষেত্রে কন্যা সন্তানের জন্য তাদের আরো বেশি মনোযোগ দিতে হয়। কন্যা সন্তানের জন্য দিতে হয় বাড়তি মনোযোগ। মা যদি স্বশিক্ষিত হন তাহলে কন্যা শিশু আদর্শ সন্তান রূপে গড়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। পরিবারে ছোটরা বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ছোটদের প্রতি বড়রা আন্তরিক হলে তা থেকেই শিশুরা গুণাবলি অর্জন করবে। মাকে এ বিষয়ে সজাগ হতে হবে। জীবনের শুরুতেই শিশু তথা কন্যা শিশুকে ধর্মীয় অনুশাসনের বিষয়ে সম্যক ধারণা দিতে হবে। প্রত্যেক ধর্মেই নৈতিকতার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশিকাও রয়েছে।
কন্যা শিশুর নৈতিকতা-শিক্ষার শুরু বাড়ির আঙ্গিনা থেকে। বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে সঙ্গে গৃহকর্মিদেরও যাতে তারা শ্রদ্ধা-সহনশীলতার মন নিয়ে গ্রহণ করে তা শিক্ষা দিতে হবে। প্রায়শই পত্রিকায় দেখা যায় গৃহকর্মি নির্যাতনে শুধু বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা জড়িত নয়। বাড়ির শিশুরাও জড়িত। রাজধানীর বাড্ডায় হালিমা আক্তার (১১) নামে এক গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে একই পরিবারের ৩ সদস্যকে গত ৩০ জানুয়ারি আটক করে বাড্ডা থানা পুলিশ। আটককৃতরা হলেন গৃহকর্তা তোফাজ্জল হোসেন, তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার ও তার মেয়ে মুক্তা। বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টের ৮নং রোডের ৩৫নং বাড়ি থেকে তাদের আটক করা হয়। বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমএ জলিল জানান, খবর পেয়ে ওই বাড়ি থেকে আহত অবস্থায় গৃহকর্মী হালিমা আক্তারকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় বাড়ির ৩ সদস্যকে আটক করা হয়। পরিবারের কন্যাকে ধর্মীয় রীতিনীতি, নৈতিকতা, সততা এসব বিষয় শেখাতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সকলকেই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কন্যা শিশুর দেহ-মনের পূর্ণ বিকাশের জন্য আনন্দ, ভালোবাসা ও সমঝোতাপূর্ণ পরিবেশে তাকে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। শিক্ষকের সঙ্গে কন্যা শিশুর সম্পর্ক হতে হবে শ্রদ্ধার। কন্যা শিশুকে বোঝাতে হবে ‘তুমি তোমার বাবা মাকে যেমন শ্রদ্ধা করো তেমনি তুমি তোমার শিক্ষককেও শ্রদ্ধা করবে। ’ কন্যা শিশুকে পোশাক সম্পর্কেও ইতিবাচক পরামর্শ দিতে হবে। পোশাক পরিচ্ছদে শালীনতা বজায় রাখার বিষয়েও শিক্ষা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মে পোশাকের মাহাত্ম্য এর প্রসঙ্গে আনা যেতে পারে। এমন কোনও পোশাক পড়া যাবেনা যা অশালীন।
অশালীন পোশাক একজন মেয়েকে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইভটিজাররা পোশাকের খোলামেলার বিষয়টির সুযোগ নেয়। শালীন পোশাকেও যে মেয়েদের সুন্দর দেখায় তা খুব ছোট বেলা থেকেই শিশুর মনে এ বদ্ধমূল ধারণা দিতে হবে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের কারণে পাশ্চাত্য ও পার্শ্ববর্তী দেশের সংস্কৃতি আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। যার নেতিবাচক প্রভাব শিশুদের ওপর পড়ছে। শিশুরা বিশেষ করে কন্যা শিশুরা তা অনুসরণ করছে বেশি। শিশুদের কথায় চাল -চলনে সেসব দেশের প্রভাব পড়ছে। ফলে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি ম্লান হচ্ছে। তাই কন্যা শিশুকে নিজ দেশের ভাষা ও পোশাক সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। নিজেদের স্বকীয়তা তুলে ধরতে হবে। ফ্যাশন ডিজাইনার মাহিন খান বলেন, আমাদের দেশে রয়েছে রং এর প্রাচুর্য্য। এ রংকে পোশাকে আনলেই তার বিশিষ্টতা অন্য যে কোন দেশের ফ্যাশনকে পিছনে ফেলবে। নৈতিক শিক্ষা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে প্রশংসাও করতে হবে। শিশুর অকৃতকার্যতার বিষয়গুলো বড় করে তুলে ধরলে শিশু হীনমন্যতায় ভুগবে। তাই মাকে পিছিয়ে পড়া শিশুর সাথে অধিক ঘনিষ্ট হতে হবে। তাকে আশ্বাস দিয়ে সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মা হবেন সহনশীল, মায়ের এই আচরণের প্রভাব পড়বে শিশুর ওপর। শিশুর মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য উপদেশমূলক ও শিক্ষামূলক গল্প-ছড়া শোনানো যেতে পারে।

No comments:

Post a Comment