Monday, May 2, 2016

নির্দলীয় ট্রেড ইউনিয়ন চাই by ওয়াজেদুল ইসলাম খান

মে দিবস আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষ উদ্যাপন এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শিকাগোর এই ঐতিহাসিক ঘটনাটির স্মরণে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে দিনটি নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও ১ মে জাতীয় ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৩০ বছর আগে মে দিবসের বিজয় সূচিত হলেও আমাদের দেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি, শোভন কর্মপরিবেশ, আট ঘণ্টা শ্রমসহ শ্রম আইন স্বীকৃত অনেক অধিকারের জন্য এখনো লড়াই করতে হচ্ছে। এখনো বাঁচার মতো মজুরি, আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ নানা সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা থেকে অনেকে বঞ্চিত। বিরাষ্ট্রীয়করণ ও লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে দেশের বৃহৎ বৃহৎ শিল্প-কলকারখানা বন্ধ বা বিক্রি করে দেওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এখন বেকার। বাংলাদেশের শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র গার্মেন্টস, পরিবহন, শিপ ব্রেকিং, চাতালসহ অসংগঠিত খাতগুলোর শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরি দিয়ে কাজ করানো হয়। বিভিন্ন খাতে শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। বৈষম্যের প্রতিবাদে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) নব্বইয়ের দশকে স্থায়ী মজুরি কমিশন গঠন করে সব শ্রমিকের জন্য জাতীয় ন্যূনতম বেতন স্কেল নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছে। আজকের পরিপ্রেক্ষিতে এই দাবি আরও যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত না হওয়ায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগও পান না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নির্ভর করতে হয় মর্জির ওপর। ওভারটাইম ভাতা না দিয়েই এসব শ্রমিককে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করতে বাধ্য করা হয়। সমকাজে সমমজুরি নেই, নারী-পুরুষের মজুরিবৈষম্য বিদ্যমান। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সুরক্ষা নেই বললেই চলে। শ্রমিকের হাতের ছোঁয়া ব্যতীত কোনো কিছু তৈরি করা সম্ভব নয়। শ্রমিককে দিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করানো হয়। বিনিময়ে তাঁদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হয়। শ্রমিক-কর্মচারীরা যেহেতু কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে মূল্যবান শক্তি, তাই তাঁদের উপেক্ষা করলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, শ্রমিকদের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা হয়। শ্রমিক-কর্মচারীদের হাত টাকার চেয়েও অনেক শক্তিশালী। সেই শক্তিকে অভুক্ত, বঞ্চিত ও অসুস্থ রেখে উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। এটা মালিকদের বুঝতে হবে, শ্রমিকদের আস্থায় নিয়ে তাঁদের সমস্যার সমাধান এবং ন্যায্য হিস্যা দিয়েই শিল্প বিকাশ বা উন্নয়নের কথা মালিকদের ভাবতে হবে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের শিল্প পুঁজির ৮০ শতাংশের ওপর শিল্প-কলকারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি মালিকানায় ছিল। সেগুলোর প্রায় ১০০ ভাগ শ্রমিক ছিলেন সংগঠিত। আশির দশকের শুরুতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে ৭৭টি জুট মিল ছিল। ১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করার পর ৩৪টি জুট মিল বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। বিরাষ্ট্রীয়করণসহ শ্রমিক স্বার্থবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা রুখে দাঁড়ান। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টার সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি গণতন্ত্রের দাবিতে সারা দেশে ব্যাপক গণ–আন্দোলন গড়ে ওঠে। সরকার স্কপের দাবির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়। ১৯৮৪ সালের ২১ মে শ্রম আইনের কিছু পরিবর্তনসহ দুই মাসের সমপরিমাণ গ্র্যাচুইটিসহ অন্যান্য দাবি মেনে নেওয়া হয়েছিল, যা বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বিরাষ্ট্রীয়করণ-বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। আন্দোলনের মুখে সরকারের বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই সংগঠিত শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ সামরিক শাসনের ফলে সামাজিক মূল্যবোধগুলোও ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। তারই প্রভাবে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ক্রমেই স্বধর্মচ্যুত হয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পরও সুস্থ রাজনীতির পরিবর্তে চলছে ক্ষমতা ও আধিপত্য নিয়ে দলাদলি। সংঘবদ্ধ পীড়ন ও অন্যায় পথে অর্থ আহরণের পথ ধরেছে একশ্রেণির অসৎ ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব। ফলে একদিকে ক্ষুণ্ন হচ্ছে শ্রমিক স্বার্থ, অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে সাধারণের মধ্যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্য থেকে ক্রমান্বয়ে সরে গিয়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়কে আরও কঠিন করে দিয়েছে। শ্রমিক আন্দোলন ও সংগঠনের বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে প্রকৃত শ্রমিক সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আদর্শিক মানসিকতা নিয়ে শ্রকিদের মধ্যে কাজ করতে হবে। রাজনীতি যার যার, শ্রমিক স্বার্থে একাকার—এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দলীয় প্রভাবমুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠিত করে বিপ্লবী ধারায় শ্রমিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে মালিকদের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্য ও সংগ্রাম শ্রমিক আন্দোলনের বড় শক্তি, এই শক্তির কাছে স্বৈরশাসকেরাও মাথা নত করেছে। শোষণ প্রতিরোধে, ন্যায্য দাবি আদায়ের অন্যতম পথই হলো শ্রমিকের ঐক্য ও সংগ্রাম।
ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

No comments:

Post a Comment