Tuesday, May 3, 2016

এগিয়ে থাকতে, চাই গবেষণা by মো. সাইফুল্লাহ

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে মিলবে গবেষণার রসদ। স্বপ্ন নিয়ে’র
আয়োজনে মডেল হয়েছেন সুদীপ্ত, সাবা, লাবিবা, অপূর্ব ও সানজিদা
গত বছর এইচএসবিসি-প্রথম আলো আয়োজিত ভাষা প্রতিযোগে প্রশ্নটা করেছিল সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী। ‘গবেষণা শব্দটা ভাঙলে আমরা পাই গো+এষণা। গো মানে গরু। আর এষণা মানে খোঁজা। গরু খোঁজার সঙ্গে গবেষণার কী সম্পর্ক?’ উৎসবে উপস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মহাম্মদ দানিউল হক মজা করেই প্রশ্নটার উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদারা ছিলেন কৃষক। কৃষিকাজে ব্যবহৃত গবাদিপশু তাঁদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। গরু খোঁজা তাঁদের জন্য গবেষণার শামিল। গবেষণা করতে হলে তোমাকেও যে গরুই খুঁজতে হবে তা নয়। তোমার জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ, তুমি তা-ই খোঁজো।’ অধ্যাপক দানিউল হকের বার্তাটা অবশ্য দেশের অনেক শিক্ষার্থীর কানে আগেই পৌঁছে গেছে। তাঁরা জানেন, শিক্ষাজীবনে গবেষণার গুরুত্ব অনেক। অধিকাংশ বিষয়েই স্নাতক পেরোতে হলে গবেষণা করতে হয়, গবেষণাপত্র লিখতে হয়। তবে এর গুরুত্ব কি শুধুই স্নাতকের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ? তা নয়। স্নাতক পর্যায়ের শেষে চমৎকার সব গবেষণাপত্র লিখে, এর সুবাদে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ভালো মানের বৃত্তি পাচ্ছেন ভিনদেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বিভিন্ন জার্নালেও ছাপা হচ্ছে তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ। উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে থাকতে হলে গবেষণা যে খুব জরুরি, সেটা অনেক শিক্ষার্থীই জানেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর মনজুর বলছিলেন, পুরোদমে গবেষণা করতে হয় মূলত পিএইচডি করতে গেলে। স্নাতক পর্যায়ের পড়ালেখায় গবেষণাকে অন্তর্ভুক্ত করার মূল উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীদের এর কৌশলটা শেখানো। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজ শুরু করা উচিত। বলছিলেন, ‘কোনো একটা বিষয়ে রিসার্চের জন্য যা যা দরকার, সেটা খুঁজে বের করাও কিন্তু একটা আর্ট। অনেক তথ্য থেকে যেটুকু প্রয়োজন, সেটা খুঁজতে গিয়েই শিক্ষার্থীদের একটা ভালো চর্চা হয়ে যায়। কীভাবে রিপোর্ট লিখতে হয়, রেফারেন্স ব্যবহার করতে হয়—এসব শিক্ষা ভবিষ্যতে অনেক কাজে লাগে।’
স্নাতক পর্যায়েই ভালো মানের কোনো জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলে কিংবা কোনো সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপনের সুযোগ পেলে তো কথাই নেই! উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে যায় অনেকখানি। আমাদের আশপাশে এমন উদাহরণ কম নেই। স্বপ্ন নিয়ের পাতায়ই বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের গবেষণার সাফল্যের খবর ছাপা হয়েছে। এই তো কয়েক দিন আগে, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব লেদার টেকনোলজিস্ট অ্যান্ড কেমিস্ট সোসাইটিসের ঠিকানায় নিজের গবেষণাপত্র পাঠিয়ে ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড-২০১৬ জিতেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহরুখ নূর-এ-তমাল। আবার পদার্থবিদ্যা জগতের মর্যাদাপূর্ণ জার্নাল অ্যানালেন ডার ফিজিকের প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিল বুয়েটের একদল শিক্ষার্থীর গবেষণা প্রবন্ধ। বিশেষ করে প্রকৌশলবিদ্যার শিক্ষার্থীরা নিয়মিতই নিজেদের গবেষণার খবর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে পৌঁছে দিচ্ছেন। তানভীর মনজুর বলছিলেন, ‘আমাদের বলে দিতে হয় না, শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বিভিন্ন গবেষণার বিষয় নিয়ে আমাদের কাছে আসে। গুগলের কল্যাণে ওরাই খুঁজে নিতে পারে, কোথায় কীভাবে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা যায়। ফেসবুকে শিক্ষার্থীদের কিছু গ্রুপ আছে। এসব গ্রুপের মাধ্যমেই ওরা সব খবরাখবর রাখে।’
‘চমকপ্রদ কোনো বিষয়ে গবেষণা থাকলে অনেক সময় স্নাতকোত্তর না করেও পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া যায়। আমাদের দেশেও এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন, যাঁরা পিএইচডি করছেন, কিন্তু তাঁদের মাস্টার্স ডিগ্রি নেই।’ গবেষণার আরও একটা সম্ভাবনার কথা জানালেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের সহযোগী অধ্যাপক সুমন রহমান। এত গেল ‘একাডেমিক’ সুবিধার কথা। কিন্তু গবেষণা করার আনন্দটা আসলে কোথায়? জানতে চেয়েছিলাম সুমন রহমানের কাছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমত আমার চারপাশের জগৎ পর্যালোচনা করে আমি যা ভাবছি, তার গুরুত্ব বইয়ে যা পড়ছি তার চেয়ে কম নয়—এই উপলব্ধির একটা আনন্দ আছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজের অভিজ্ঞতার জগৎকে সম্মান করতে পারে। দ্বিতীয়ত, রিসার্চ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা চিন্তাশক্তির স্বাধীনতাটা উপভোগ করে। আনন্দটা এখানেই।’

No comments:

Post a Comment