Sunday, May 8, 2016

আওয়ামী লীগ কি আছে আওয়ামী লীগেই? by আবুল মোমেন

বেশ কয়েক বছর আগে একটি সেমিনারে দেশের একজন খ্যাতনামা বাম বুদ্ধিজীবীর বক্তব্যের পরে বলতে ইচ্ছে করেছিল—যতই সমালোচনা করুন, সত্য হচ্ছে, দেশ থেকে যদি আজ আওয়ামী লীগ নামের দলটি লুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে অনেক উদার মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে আপনার পক্ষেও প্রাণে বাঁচা কঠিন হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মান্ধ শক্তি বুদ্ধিজীবী নিধনের নীলনকশার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তার আগেই দখলদার পাকিস্তানের পরাজয় হয়েছিল এবং দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছিল। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সেই আরব্ধ কাজ তারা সহজেই সম্পন্ন করবে। এরপরে অনেক দিন গত হয়েছে। এ সময়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তি ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ খুঁজে ফিরেছে এবং ২০০১-এ সাময়িকভাবে ক্ষমতায় এসেও ছিল। এদিকে পঁচাত্তরে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে আওয়ামী লীগও পথ খুঁজেছে ক্ষমতায় ফেরার। রাজনৈতিক দল জানে, দেশের ও মানুষের জন্য কিছু করতে হলে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়োজন। এই ভাবনার মধ্যে তেমন ভুল নেই। ক্ষমতায় ফেরার অভিযানে নেমে আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব উপলব্ধি করেন এ দেশের জনগণের শিক্ষা ও চেতনার যে মান, তাতে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি আঁকড়ে থাকলে চলবে না। তদুপরি দলের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের সমালোচনার প্রধান অস্ত্রই হলো ধর্ম, সমালোচনার মূল বক্তব্য—আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ইসলাম ধর্ম থাকবে না। প্রতিপক্ষ এমন প্রচারণাও চালিয়ে লাভবান হতো যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি হবে। তৎকালীন একজন জেলা প্রশাসক আমাকে বলেছিলেন, একবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন নির্বাচনী জনসভায় একদিকে কোরআন এবং অন্যদিকে গীতা রেখে সমবেত শ্রোতার উদ্দেশে বলেছিলেন, আপনারা কোরআন চান, নাকি গীতা? কোরআন চাইলে বিএনপিকে ভোট দিতে হবে, নৌকায় ভোট দিলে কোরআন পাঠ বন্ধ হয়ে গীতা পাঠ করতে হবে। এটি ধর্মভিত্তিক প্রচারণার একটি চরম দৃষ্টান্ত। এর সঙ্গে অবশ্যই ভারত-বিরোধিতার রাজনীতিও যুক্ত ছিল। ১৯৯১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের মূলে ফলাফল সম্পর্কে তাদের অতি আত্মবিশ্বাস ও প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে অবমূল্যায়নের ত্রুটি ধরা যাবে। কিন্তু বিএনপির অনুকূলে অধিকাংশের ভোট দেওয়ার পেছনে কাজ করেছিল সেই ধর্মের কার্ড। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের কার্ড খেলে এই প্রচারণা ঠেকাতে পারেনি। পরবর্তী দুই দশক ধরে আওয়ামী লীগ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের মূল অস্ত্র অকার্যকর করে দেওয়ার ব্রত পালন করেছে। সে কাজে কৌশল হলো প্রতিপক্ষের অস্ত্র দিয়েই তাদের ঘায়েল করা। ’৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হওয়ার পর দলটির নেতৃত্ব ক্ষমতায় যাওয়ার গুরুত্ব এত বেশি বলে মনে করলেন যে মাঠপর্যায়ের মূল প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ঘায়েল করার জন্য পতিত স্বৈরাচারের সহযোগিতা এবং রাজনীতিতে আদর্শিক প্রতিপক্ষ জামায়াতের সহানুভূতি নিয়ে ক্ষমতায় যেতে আপত্তি হয়নি। সেই থেকে আমাদের মূল রাজনীতিতে আদর্শের গুরুত্ব হারিয়ে যেতে থাকে। রাজনীতিতে আদর্শকে রক্ষা করতে করণীয় ছিল সমাজ পরিবর্তন—সে তো সবারই জানা। সবাই জানি, ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে এ দেশে শিক্ষিত নাগরিক সমাজে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। ষাটের দশকে সমাজতান্ত্রিক সমাজ কায়েমের স্বপ্ন তার পালে হাওয়া দিয়েছিল আর তখনই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি ও তার অনুষঙ্গী সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের আন্দোলন একে বেগবান করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিবর্তনকেই আমাদের নেতৃত্ব চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে গণ্য করেছিলেন। ফলে স্বাধীনতার পরে সামাজিক রূপান্তরের সচেতন কাজ স্থগিত হয়ে গেল। যাঁদের এ কাজের মূল কারিগর হওয়ার কথা—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিক, পেশাজীবী—তাঁরাও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রসাদ পেতে প্রতিযোগিতায় নামলেন, ক্ষমতার রাজনীতির খেয়োখেয়িতে জড়িয়ে মূল কাজে ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলেন। এটা অন্তত দুই দশকে ক্রমান্বয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয় অর্জনের তিন বছরের মাথায় প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্র ও হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সমাজমানসকে আরও পেছনে ঠেলার কাজ শুরু করেছিল। বলা বাহুল্য, পরিবর্তন ও প্রগতির প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য তারা প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে ধর্মকে। জিয়া ও এরশাদ এবং তাঁদের সৃষ্ট রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এ কাজে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের ঢাল হিসেবে কাজে লাগিয়ে জামায়াত ও ধর্মান্ধ শক্তি নিজেদের অবস্থান সমাজে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করেছে। সমাজে এই শক্তি বৃদ্ধিতে পেট্রোডলারে সমৃদ্ধ আরব বিশ্ব দ্বিবিধ ভূমিকা পালন করেছে। একদিকে আমাদের সমাজের নিম্নবর্গের বিশাল অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষকে তাদের সংস্কৃতিতে প্রভাবিত করেছে আর অন্যদিকে ওয়াহাবি পন্থার জঙ্গি ইসলাম প্রচারে এ দেশে টাকা ঢেলেছে। তার ওপর ১৯৯০ সাল নাগাদ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের ফলে এ দেশে সমাজ পরিবর্তনের শেষ আদর্শিক রাজনৈতিক ধারাও বিলীন হয়ে পড়ে। বিপরীতে বাজার অর্থনীতির প্রভাবে নাগরিক সমাজে ভোগবাদী প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রবণতা কেবল আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে। এই ক্রান্তিকালে নাগরিক সমাজ বৈষয়িকভাবে বিকশিত হয়েছে, তার ভোগের ক্ষমতা ও চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু হারিয়েছে সৃজনশীলতা ও প্রকৃত আধ্যাত্মিক চেতনা এবং সেই সঙ্গে আতঙ্কবোধ ও শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ। এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে আমাদের সমাজ না হলো আরব ও বৃহত্তর পারস্যের ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক দর্শনের সঙ্গে পরিচিত, না পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের দর্শন ও তত্ত্বের চর্চায় আগ্রহী। আমরা হয়ে পড়লাম পরগাছার মতো, পশ্চিম এবং আরব বিশ্ব উভয়ের। ফলে এ দেশের সমাজমানসে একধরনের বিভ্রান্তিকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ভোগবাদিতার সঙ্গে আড়ম্বরপূর্ণ ধর্মাচারের সহাবস্থান চলছে। পরিণতিতে ধর্মের আচার পালনের ব্যাপকতার মধ্যেও ধর্মীয় নৈতিকতাকে পাত্তা না দিয়ে উল্টো পাল্লা দিয়ে সমাজে মিথ্যাচার, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণসহ অপরাধ ব্যাপকভাবে বেড়ে চলেছে। এর কারণ সারা বিশ্বের মানুষ আজ তার আদত মনুষ্যধর্মের বা মনুষ্যত্বের গভীর সংকটে পড়েছে। এটি আত্মিক সংকট এবং ব্যাপক অর্থে সংস্কৃতির সংকট। এটি আমাদের দেশেরও মৌলিক সংকট, এখানে গভীর ও তীব্র হয়ে বসছে তার কামড়। আমরা লক্ষ করছি, এই আত্মিক সংকটকালে দেশে দেশে ধর্মীয় কট্টরপন্থার উদ্ভব ঘটেছে এবং সংকটাপন্ন বিভ্রান্ত মানুষ ধর্মের আশ্রয় নিতে গিয়ে কট্টরপন্থার কবলে পড়ছে, যা পরিণতিতে আত্মিক ও সাংস্কৃতিক সংকটকে আরও ব্যাপক ও তীব্র করে তুলছে। ধর্মের নামে ভয় ও ঘৃণা, হত্যা ও ধ্বংসের চর্চা চলছে। ভক্তি ও আত্মনিবেদনে, মানবপ্রেম ও গঠনমূলক কাজ, যা যেকোনো ধর্মের মূল কথা, তাকে উপেক্ষা ও প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এ এক অদ্ভুত সময়, জীবনানন্দীয় ভাষায়—অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা। এভাবে জ্ঞানহীন অন্ধদের কাল চলছে আজ। এর মধ্যে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে। এই প্রথম সামরিক বাহিনী ও দেশের তরুণ সমাজের সমর্থন অর্জনে সক্ষম হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী এ দল। এ বিজয়ে নিশ্চয় সহায়ক হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার ‘অপবাদ’ ঘোচাতে তাদের দীর্ঘ প্রয়াসের সাফল্য। এবারে শেখ হাসিনা অনেক পরিণত রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রনেতা হিসেবে সুকৌশলী। তিনি মনোযোগ দিয়েছেন ক্ষমতা সংহত করার দিকে, তা সব সময় গণতান্ত্রিক পথে বা বিধিমোতাবেক অর্জিত না হলেও। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে জামায়াত ও ধর্মান্ধ শক্তি বিতাড়িত হলো। কিন্তু হিসাবটা এতই সহজ ও সরল নয় বলেই মনে হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হলেও জামায়াত ও তাদের সহযোগীরা সমাজকে প্রভাবিত করে কবজা করে এনেছে। অর্থাৎ সেক্যুলার শক্তি হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে ও রাখতে গিয়ে গোটা সমাজ তার উদার মানবতাবাদী সংস্কৃতিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ধর্মান্ধ শক্তির প্রতি ক্ষমতাবান আওয়ামী লীগ আজ অনেক নমনীয়, কখনো কখনো আপসকামী। চলমান মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো বকেয়া ইস্যু, কিন্তু বর্তমানে ঘটমান মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে সরকারের ভূমিকা কি বেশ নমনীয়, প্রায় অকার্যকর নয়? দুই যুগ আগে আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন যে কথাটা সহজেই শোনাতে পেরেছিলাম দলটির সমালোচককে, আজ বোধ হয় তা একজন সচেতন সমর্থককে শুনিয়েও আশ্বস্ত করতে পারা যাবে না। এ এক অদ্ভুত কাল, আওয়ামী লীগ দারুণভাবে ক্ষমতাবান এবং সেই আওয়ামী লীগই করুণভাবে ক্ষমতাহীন! ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় পড়েছিলাম বিনু স্বপ্নে দেখেছিল কলকাতা শহর নড়তে নড়তে চলছে এবং আজগুবি ওলটপালট সব কাণ্ড ঘটছে, তবে শেষ পর্যন্ত বিনুর ঘুম ভাঙে স্বস্তির সঙ্গে: নাহ, ‘কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই।’। কিন্তু আমাদের দুঃস্বপ্ন কি কাটবে? সংশয় গভীর বলে জেগে জেগেও তাই অস্বস্তিকর প্রশ্নটি রাখতে হচ্ছে: আওয়ামী লীগ কি আছে আওয়ামী লীগেই?
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

No comments:

Post a Comment