Saturday, May 14, 2016

দলীয় ইউপি নির্বাচন আইন বাতিল হোক by মিজানুর রহমান খান

৬৮ জনের প্রাণহানি ঘটে যাওয়া চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি ও সামগ্রিক ধ্যানধারণাকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। অবস্থা সম্ভবত এতটাই শোচনীয় যে এখনই যদি আবার দলের টিকিটের পরিবর্তে নির্দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা হয়, তাহলেও আর আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া কঠিন হবে। যদিও এটা ঠিক যে গ্রামীণ মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা এমনিতেও ভেঙে পড়ার উপক্রম বা যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তথাকথিত দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোথাও কোথাও ধসে পড়া মূল্যবোধের কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে কাজ করেছে। যদিও আমরা এই পরিস্থিতির জন্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করে থাকি, কারণ, তারাই নির্বাচনটা পরিচালনা করছে, কিন্তু এর মূল দায় সরকারি দলের সেসব রাজনীতিককেই দেব, যাঁরা ব্রিটেন ও ভারতের উদাহরণ দেখিয়ে স্থানীয় সরকারে দলীয় মনোনয়ন ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন।
তাঁদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ—তাঁরা যেন এখনই তাঁদের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করতে বসেন। আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয় যে দলীয় ভিত্তিতে মনোনয়ন ব্যবস্থায় যদি গোপন ব্যালট পদ্ধতি অনুসরণ করা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বলে বিবেচিত না হয়, তাহলে দ্রুতই আগের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া উচিত। একই সঙ্গে এটাও বলব যে ন্যূনতম নৈতিকতা এবং দলীয় শৃঙ্খলা যদি তৃণমূলে রক্ষা করে চলা সম্ভব না হয়, তাহলে তা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য সুখকর বা নিরাপদ মনে করার সুযোগ থাকে না। চার পর্বের ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক করায়ত্ত করা নিয়ে যেভাবে টাকার খেলা চলেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে তা প্রকারান্তরে দুর্নীতির সামাজিকীকরণকে তীব্র করেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। কথা ছিল সদস্য নির্বাচন হবে আগের মতো নির্দলীয় ভিত্তিতে। কিন্তু সেখানেও দলীয় প্রভাব ও টাকার খেলা মুখ্য হয়ে উঠেছে। নির্বাচন করতে টাকা লাগে না। টাকা লাগে মনোনয়ন কিনতে। আর এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অলিখিতভাবে কার্টেল বা জোট তৈরি করা হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে প্যানেল।
যশোরের সদ্য নির্বাচিত একজন চেয়ারম্যান সরাসরি কবুল করেছেন এই বলে যে ‘আমার প্যানেলে আসতে মেম্বারদের এক লাখ করে টাকা দিতে হয়েছে। এতেই টাকা জোগাড় হয়ে গেছে।’ এবারের নির্বাচনে এ ধরনের কতগুলো নতুন অপরাধ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এর প্রতিকার করার মতো কোনো সিভিল সংস্থা আমাদের অবশিষ্ট নেই। এটা নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা বিচার বিভাগ করতে পারবে না। কারণ, এর সপক্ষে কোনো রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নেই। এটা সরকারি দল থেকে নেই। বিরোধী দল থেকেও নেই। বিএনপি যারা মাজা ভেঙে গেছে, তারাও কোথাও নৈতিকতা বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি নেয়নি, তারাও প্রত্যাশামাফিক স্রোতে গা ভাসিয়েছে। সে কারণে মনোনয়ন-বাণিজ্য তাদের ‘গৃহবিবাদকে’ আরও উসকে দিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বিচক্ষণ সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান সরল স্বীকারোক্তি করেছেন যে ‘নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে গেছে। এটা কমবেশি সব দলেই হচ্ছে।’ তাঁর এই মন্তব্য এই প্রশ্নকে সামনে আনছে যে এই অবস্থা কে কবে কীভাবে বদলাবে। কিংবা এটা বদলের আদৌ আর দরকার আছে কি না। আমরা মনে রাখব, এটা কেবল কোনো একটি সংস্থার কাজ হতে পারে না।
নির্বাচন কমিশন এটা তখনই করতে পারবে যদি নির্বাচনী খেলোয়াড়েরা তাদের কাছে সেই ভূমিকাটা আশা করে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে সেই ভূমিকা তেমনভাবে আশা করে না। তার বড় প্রমাণ তারা আমাদের এটা মানতে বাধ্য করছে যে মনোনয়ন-বাণিজ্য চলছে ও চলবে। কমবেশি নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু নীতিগত অবস্থান হলো এটা চলবে। সেই গৌরব ও অহংকারদীপ্ত নৌকা আর নৌকা নেই। আজ তা অন্য রকম, যেকোনো মূল্যে বিজয়ের প্রতীকের অমর্যাদায় নামানো হয়েছে। মূল দলই যদি না চায় তাহলে এর মর্যাদা কেন সাংবিধানিক সংস্থা একে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারবে না। দেশে যখন যেখানে যে নির্বাচনই হোক মনোনয়ন কিনতে টাকা লাগবে। এই অঙ্ক ক্রমাগতভাবে কমবে না, বরং বাড়ার আশঙ্কাটাই করতে হবে। বাড়তে বাড়তে আকাশ ছুঁবে। আওয়ামী লীগ এসে সংবিধানে নতুন করে সমাজতন্ত্র লিখেছিল। কিন্তু কাজের সঙ্গে তার তুলনা বড় কম। উঠতি ধনিক ও লুটেরা শ্রেণির ক্ষমতায়ন ঘটাচ্ছে মনোনয়ন-বাণিজ্য। এমন এক নেতৃত্বের উত্থান ঘটছে, যারা দলের দুর্দিনে কি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় লুকিয়ে যাবে। বিএনপির সাংগঠনিক দুরবস্থার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েও তার একটা পাঠ নেওয়া চলে। বিএনপির ছায়ায় বেড়ে ওঠা লুটেরা নেতৃত্ব দলের দুর্দিনে কোনো কাজে আসছে না। তারা সমাজে কোনো আবেদন তৈরি করতে পারছে না। কারণ, মানুষ তাদের চেনে। তাদের নেতৃত্ব মেনেছিল বলে তাদের জনগণ শ্রদ্ধা করবে, সেটা হয় না। এখন বাস্তবেও আমরা তাই দেখি।
আমরা তাই এটা বুঝতে অক্ষম, মনোনয়ন-বাণিজ্যনির্ভর একটি সামাজিক নেতৃত্ব দিয়ে কী করে দীর্ঘ মেয়াদে একটি উদারনৈতিক সমাজ তৈরির সংগ্রামকে বেগবান করা সম্ভব হবে। ‘দি হিন্দু’ ৯ মে এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে একটি জরুরি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চালিয়ে নিতে সরকারের প্রশংসা করেছে। কিন্তু তারা বলছে, উদারনৈতিক কর্মীদের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে সরকার ব্যর্থ। তার কারণ সম্ভবত তারা যদি এসবে জড়িতদের গ্রেপ্তার বা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়, তাহলে ইসলামপন্থীদের দ্বারা তারা আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। সেই ভয় থেকে সরকার বিরত থাকছে। তাহলেই প্রশ্ন আমরা অগ্রসর হব কী করে। ‘হিন্দু’র এই ধারণা সঠিক হলে আমরা সামাজিক নেতৃত্ব কী করে তৈরি হচ্ছে সেদিকে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারি না। কারণ, নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা এমন একটি সামাজিক বাতাবরণ বা পরিবেশ তৈরি করে দেবেন, সরকারি প্রশাসন যাকে উপেক্ষা করতে পারবে না। মনোনয়ন-বাণিজ্যনির্ভর ‘আমাদের লোক’ আর অবাধ নির্বাচননির্ভর ‘আমাদের লোক’রা তো একই রকম আচরণ করবে না। বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরে বাস করলেও এখন পর্যন্ত গ্রাম-বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই বাংলাদেশের সমাজের সুর ও সিম্ফনি নির্ধারণ করে থাকে। আর সেখানে ইউপি নির্বাচন একটা বিস্বাদের জন্ম দিয়েছে। কোনো বৈরী পরিবেশ মোকাবিলায় গ্রামীণ বাংলার মনোনয়নের উঠতি ফড়িয়া নেতৃত্ব তেমন কোনো কাজে দেবে বলে ধরে নেওয়া কঠিন।
স্বীকার করতে হবে যে তৃণমূলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাপকাঠি পেয়েও তা হাতছাড়া হয়ে গেল। পরিস্থিতির কতটা অবনতি ঘটলে পরে একজন মন্ত্রী বলতে পারেন যে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অন্তত ২৫-৩০টি অভিযোগ খুব সিরিয়াসলি আওয়ামী লীগ খতিয়ে দেখছে। কিন্তু ধরে নেওয়া যায় এটা অরণ্যে রোদন হতে বাধ্য। এই ধরনের তদন্ত আঁতুড়ঘরেই মারা গেলে অবাক হব না। মন্ত্রীপ্রবর নিজেই বলেছেন, ‘জিনিসগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে প্রমাণ করা কঠিন!’ অবশ্য সূক্ষ্ম বিষয় বড় করে দেখতেই মাইক্রোস্কোপের আবিষ্কার ঘটেছিল। কেউ ভয় পেলে তার পক্ষে মাইক্রোস্কোপে চোখ স্থির করা সম্ভব হয় না। ‘দি হিন্দু’ পরামর্শ দিয়েছে যে রাইটস অ্যাকটিভিস্টদের মধ্যে যারা মাঠে আছে সরকারের উচিত হবে তাদের গলা চড়িয়ে সমর্থন দেওয়া। কিন্তু সে জন্য প্রশাসনিক নয়, দরকার বর্ধিত রাজনৈতিক সামর্থ্য। একতরফা সংসদ নির্বাচন সেই সামর্থ্য বাড়ায়নি, এবারের মনোনয়ন বাণিজ্যনির্ভর অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকারের নির্বাচনও তা বাড়ায়নি। শেষ করব এই সুপারিশ রেখে যে, যা হওয়ার হয়েছে। এখনই ঘোষণা দেওয়া হোক যে দলীয় মনোনয়নে আর ইউপি নির্বাচন হবে না। এই আইন বাতিল চাই।

No comments:

Post a Comment