মিসরে
‘আরব বসন্ত’ সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। একনায়কতান্ত্রিক,
স্থবির একটি অঞ্চলে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করেছিল গণ-আন্দোলনটি। কেবল
মিসর কিংবা মুসলিম বিশ্বেই ঘটনাটি আলোড়ন সৃষ্টি করেনি, পুরো দুনিয়াতেই তার
ছোঁয়া লেগেছিল। তিউনেশিয়ায় এর সূত্রপাত হলেও হোসনি মোবারকের পতনই ছিল
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু সেই বসন্ত স্থায়ী হয়নি। সামরিক স্বৈরাচার
দেশটিতে আরো কঠোরভাবে চেপে বসেছে। তিন বছর ধরে দেশটির প্রথম
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে বন্দি করে রাখা
হয়েছে। আরো লাখ লাখ লোক কারাগারে নিষ্ঠুর পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। নিহত
হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। আহত হয়েছে আরো অনেক বেশি। মিসরের ‘জানুয়ারি ২৫’
নামে পরিচিত বিপ্লবটিতে মূল ভূমিকা পালন করেছিল মুসলিম ব্রাদারহুড। তাদের
ওপরই চলে আধুনিক ইতিহাসের জঘন্যতম স্ট্রিমরোলার। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের সব
নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। একটি আদর্শের জন্য গঠিত আন্দোলনটিকে
পুরোপুরি শেষ করে দেয়ার সব চেষ্টাই করা হয়েছে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।
ব্রাদারহুডও হাল ছাড়েনি। তবে তারা এখন কী ভাবছে?
কিন্তু কোন পথে তারা ঘুরে
দাঁড়াবে। এ নিয়ে আন্দোলনটির অন্যতম নেতা, সাবেক পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক
সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী আমর দারাগ সম্প্রতি আল-মনিটর নামের একটি পত্রিকাতে
সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি মিসরের ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স টু সাপোর্ট ইলেকট্ররাল
লেজিটিমেসি’রও সদস্য। এতে তিনি অতীতে তাদের আন্দোলন যেসব চ্যালেঞ্জের
মোকাবেলা করেছে, বর্তমানে তারা কোন পথে যাচ্ছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ ভিশন কী,
তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন আবদেল রহমান ইউসুফ।
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সাক্ষাৎকারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে
এখানে তা অনুবাদ করা হলো। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ। আল-মনিটর :
আপনি ব্রাদারহুডের মধ্যকার পুনর্মূল্যায়ন-বিষয়ক কয়েকটি আর্টিক্যাল লিখেছেন।
তবে গ্রুপটি এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সময়ে যেসব ভুল করেছিল, সেগুলো নিয়ে
আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেনি।
আপনি বিষয়টিকে কিভাবে নিচ্ছেন? আমর
দারাগ : আত্ম-পর্যালোচনা একটি স্বাস্থ্যকর-প্রক্রিয়া, বৃহৎ সংগঠনগুলোকে
সময়ে সময়ে অবশ্যই এর মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বিষয়টা সবসময় প্রযোজ্য, তা ক্ষমা
চাওয়া কিংবা গত ২০ বছরে গ্রুপটির কৌশল- যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন। অধিকন্তু
মিসরে যেসব পরিবর্তন- বড় ও ছোট সব ধরনের- হয়েছে কিংবা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে
ব্যাপকভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন হওয়া উচিত। আর এর মাধ্যমেই আমাদের আন্দোলনটিকে
আরো বেগবান, আরো প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও আরো প্রভাবশালী করার পরিকল্পনা
প্রণয়ন করতে পারব। উদাহরণ হিসেবে বলছি, আমি যখন দল-গঠন কার্যক্রমকে
আন্দোলনটির অন্যান্য তৎপরতা থেকে আলাদা করার গুরুত্ব নিয়ে লিখেছি, তখন সেটা
ছিল আত্ম-পর্যালোচনামূলক কাজ। আমি আন্দোলন এবং পার্টির সাথে জনগণের
সম্পর্কের রূপ কেমন হবে তার একটি মডেল প্রস্তাব করেছি। একটি ছিল, দলীয়
(রাজনৈতিক) কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দাওয়াতি (ধর্মীয়) কার্যক্রম ছাপিয়ে যাওয়ার
ফলে যেসব ভুল হয়েছিল সেগুলো এড়ানো।
আল-মনিটর : দাওয়াতি কাজ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিভাবে আলাদা করা যেতে পারে? আইডিয়াটি এবং এর মূল বক্তব্য আমাদের একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?
আমর দারাগ : দু’টি মূল বিষয় অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রথমত, ইসলাম একই সাথে সর্বব্যাপ্ত এবং সর্বসাধারণের ধর্ম। এটা ধর্ম ও রাষ্ট্রযন্ত্র উভয়টাই। সব ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং সেইসাথে জীবনের সব বিভাগের ব্যাপারে এর স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। একই সাথে ওইসব দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন ব্যাপকমাত্রায় নমনীয়তা রয়েছে, যা যুগ বা জাতি-নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তার মানে এই নয়, এই বিশ্বাসের সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বাসটির সাথে সম্পর্কিত সব বিষয়ে তদারকি করতেই হবে। আমার মূল কথা এখানেই : ইসলাম ব্যাপকভিত্তিক ধর্ম হলেও এর সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই বহুত্ববাদী হতে হবে, কারণ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এত বেশি বিশেষায়িত হয়ে গেছে যে, কারো একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়।
আল-মনিটর : দৈনন্দিন কার্যক্রমে আপনি কিভাবে এটা প্রয়োগ করবেন? (মিসরীয়) সমাজে কিভাবে আন্দোলনটির আদর্শ ভূমিকার ধারণাটি লালন করবেন?
আমর দারাগ : প্রস্তাবটির অনিবার্য বিষয় হলো, মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্যদের জন্য মিসরীয় জনগণের সবার মধ্যে কাজ করার অবকাশ থাকতে হবে। কারণ, কোনো গ্র“পের পক্ষে একই সাথে সমাজে মিলেমিশে থাকবে, আবার রাজনৈতিকভাবে জনসংখ্যার একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে- তা স্পষ্টভাবেই অসম্ভব। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়েছে। ব্রাদারহুড (পার্টির) রাজনৈতিক কৌশলের ভুলগুলো কাঁধে নিয়েছে, যদিও বাস্তবতা হলো ব্রাদারহুডের সমর্থন পেয়ে পার্টি উপকৃত হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে আদর্শ পরিস্থিতি হলো, ব্রাদারহুড সামাজিক এবং অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয়াদিতে আরো বেশি মনোনিবেশ করবে, আর প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক জীবনবিষয়ক ব্যাপারগুলো [রাজনৈতিক] প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রাদারহুডের কোনো সদস্য যদি রাজনৈতিক জীবনে কিংবা পার্লামেন্টে প্রবেশ করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তবে তিনি রাজনৈতিক দলে প্রবেশ করার সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু ব্রাদারহুড নিজে কোনো পার্টি হবে না, তাতে এমন কিছু থাকবে না, যাতে একে রাজনৈতিক শাখা হিসেবে অভিহিত করা যায়। এটা করা হলে গ্রুপটি সমাজে তার আগের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
আল-মনিটর : এর মানে কি এই যে, ‘ইসলামই সমাধান’ স্লোগান এখানো ব্রাদারহুডের স্লোগান, কিংবা আপনি কি মনে করেন, ব্রাদারহুডকে অবশ্যই এর ঊর্ধ্বে উঠতেই হবে? কেন?
আমর দারাগ : হ্যাঁ, এটা এখনো ব্রাদারহুডের সমাধান। ‘ইসলামই সমাধান’- এই স্লোগানটি নিয়ে কেউ বিতর্ক করতে পারে না। কারণ ইসলাম ব্যাপকভিত্তিক ধর্ম, এটা আমাদের সামনে আসা অনেক সমস্যার সমাধান ধারণ করে আছে। তবে এই স্লোগান বাস্তবায়ন করার জন্য কোন্ (বিশেষ) কৌশল বা হাতিয়ার যথাযথ, তা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। আল-মনিটর : কিন্তু অনেকে বিশ্বাস করেন, ব্রাদারহুড এই স্লোগানের আওতায় কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। আমর দারাগ : মূলনীতি বা স্লোগানের বৈধতা পরিবর্তনের বিষয়বস্তু নয়, কারণ এগুলো
আল-মনিটর : দাওয়াতি কাজ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিভাবে আলাদা করা যেতে পারে? আইডিয়াটি এবং এর মূল বক্তব্য আমাদের একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?
আমর দারাগ : দু’টি মূল বিষয় অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রথমত, ইসলাম একই সাথে সর্বব্যাপ্ত এবং সর্বসাধারণের ধর্ম। এটা ধর্ম ও রাষ্ট্রযন্ত্র উভয়টাই। সব ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং সেইসাথে জীবনের সব বিভাগের ব্যাপারে এর স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। একই সাথে ওইসব দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন ব্যাপকমাত্রায় নমনীয়তা রয়েছে, যা যুগ বা জাতি-নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তার মানে এই নয়, এই বিশ্বাসের সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বাসটির সাথে সম্পর্কিত সব বিষয়ে তদারকি করতেই হবে। আমার মূল কথা এখানেই : ইসলাম ব্যাপকভিত্তিক ধর্ম হলেও এর সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই বহুত্ববাদী হতে হবে, কারণ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এত বেশি বিশেষায়িত হয়ে গেছে যে, কারো একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়।
আল-মনিটর : দৈনন্দিন কার্যক্রমে আপনি কিভাবে এটা প্রয়োগ করবেন? (মিসরীয়) সমাজে কিভাবে আন্দোলনটির আদর্শ ভূমিকার ধারণাটি লালন করবেন?
আমর দারাগ : প্রস্তাবটির অনিবার্য বিষয় হলো, মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্যদের জন্য মিসরীয় জনগণের সবার মধ্যে কাজ করার অবকাশ থাকতে হবে। কারণ, কোনো গ্র“পের পক্ষে একই সাথে সমাজে মিলেমিশে থাকবে, আবার রাজনৈতিকভাবে জনসংখ্যার একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে- তা স্পষ্টভাবেই অসম্ভব। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়েছে। ব্রাদারহুড (পার্টির) রাজনৈতিক কৌশলের ভুলগুলো কাঁধে নিয়েছে, যদিও বাস্তবতা হলো ব্রাদারহুডের সমর্থন পেয়ে পার্টি উপকৃত হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে আদর্শ পরিস্থিতি হলো, ব্রাদারহুড সামাজিক এবং অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয়াদিতে আরো বেশি মনোনিবেশ করবে, আর প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক জীবনবিষয়ক ব্যাপারগুলো [রাজনৈতিক] প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রাদারহুডের কোনো সদস্য যদি রাজনৈতিক জীবনে কিংবা পার্লামেন্টে প্রবেশ করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তবে তিনি রাজনৈতিক দলে প্রবেশ করার সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু ব্রাদারহুড নিজে কোনো পার্টি হবে না, তাতে এমন কিছু থাকবে না, যাতে একে রাজনৈতিক শাখা হিসেবে অভিহিত করা যায়। এটা করা হলে গ্রুপটি সমাজে তার আগের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
আল-মনিটর : এর মানে কি এই যে, ‘ইসলামই সমাধান’ স্লোগান এখানো ব্রাদারহুডের স্লোগান, কিংবা আপনি কি মনে করেন, ব্রাদারহুডকে অবশ্যই এর ঊর্ধ্বে উঠতেই হবে? কেন?
আমর দারাগ : হ্যাঁ, এটা এখনো ব্রাদারহুডের সমাধান। ‘ইসলামই সমাধান’- এই স্লোগানটি নিয়ে কেউ বিতর্ক করতে পারে না। কারণ ইসলাম ব্যাপকভিত্তিক ধর্ম, এটা আমাদের সামনে আসা অনেক সমস্যার সমাধান ধারণ করে আছে। তবে এই স্লোগান বাস্তবায়ন করার জন্য কোন্ (বিশেষ) কৌশল বা হাতিয়ার যথাযথ, তা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। আল-মনিটর : কিন্তু অনেকে বিশ্বাস করেন, ব্রাদারহুড এই স্লোগানের আওতায় কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। আমর দারাগ : মূলনীতি বা স্লোগানের বৈধতা পরিবর্তনের বিষয়বস্তু নয়, কারণ এগুলো
বাস্তবায়ন করার
দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা সফল হয়েছেন কিংবা ব্যর্থ হয়েছেন। মিসরে ইসলাম
কিংবা বৈধতার উৎসের সাথে পুরোপুরি সম্পর্কহীন কিছু বলা কারো পক্ষেই সম্ভব
নয়। সাধারণভাবে বলা যায়, ব্রাদারহুডকে অবশ্যই কৌশল এবং এর প্রশাসনিক ধরনের
ক্ষেত্র এবং এর পাশাপাশি সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক মাত্রায়
আত্ম-পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে তারা একে এমন একটি সংগঠনে পরিণত করতে পারে,
যা সময়ের প্রকৃতি এবং তাদের সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারে।
এর অনেক বিষয় আছে, এখন মতবিনিময় চলছে, যা আমার মতে, অনিবার্যভাবেই
গ্রুপটিকে আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত করবে, তারা পেশাদার ও
সাফল্যের সাথে সামাজিক এবং অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত দায়দায়িত্ব যথাযথভাবে
পালন করতে পারবে। (চলবে)

No comments:
Post a Comment