আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সাদেক খান (চিনু)
নামের সবার অত্যন্ত প্রিয় মানুষটিকে কাছ থেকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনা ও জানার। আমি
ছিলাম চিনু ভাইয়ের স্নেহধন্য। সাদেক খানের ডাক নাম ছিল চিনু। আমার কৈশোরে
কিছু সময় চিনু ভাইয়ের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তখন আমার কাছে মনে
হতো, তার একাধিক ছোট ভাইয়ের মতো আমিও যেন তার আরেকটি ভাই। তার ছোট ভাইয়েরা
ছিল সেন্টু, মিন্টু, মেনন, মনোন ও বাদল। আমি চিনু ভাইয়ের বাবা-মা উভয়ের
স্নেহধন্য ছিলাম। তারা দু’জন আমার স্মৃতিতে অম্লান। চিনু ভাইরা ছোটবেলায়ই
তাদের মাকে হারিয়েছিলেন। বরিশাল জেলা শহরে ১৯৪৪ সাল থেকে কিছু সময় আমাদের ও
চিনু ভাইয়ের দু’টি পরিবার ছিলাম নিকট প্রতিবেশী। আমার বাবা বি ডি
হাবিবুল্লাহ ও চাচা লকীয়তুল্লাহ দু’জনই ছিলেন জেলা জজকোর্টের আইনজীবী।
আমাদের দু’টি বাসা ছিল পাশাপাশি। তার পরই ছিল বিয়ের কাজী মফিজুর রহমানের
বাসা। কাজী সাহেব ছিলেন চিনু ভাইদের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়। তার বাসার পরই
ছিল চিনু ভাইদের বাসাÑ দু’টি দোতলা টিনের ঘর। তখন অবশ্য আমাদের পাড়ার বেশির
ভাগ বাসাই ছিল একতলা টিনের ঘর। মাত্র তিন-চারটি ছিল ইটের পাকা বাড়ি। শহরের
কেন্দ্রস্থলে গির্জা মহল্লার পেরেরা রোড নামের ছোট গলিটিতে সে সময় বেশ
কিছু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের বসবাস ছিল। উল্লেখ্য, পেরেরা নামের
এক ইউরোপীয় জমিদারের নামে ছোট গলিটির নাম হয়েছিল ‘পেরেরা রোড’। এই
গলিটিতেই পেরেরা সাহেব বাস করতেন।
তার বাসস্থান একতলা পাকা বাড়িটি আমরা বড়
হয়েও দেখেছি। পেরেরা রোডে যখন আমরা ছিলাম, তখন সেখানে বেশ কিছু শিক্ষিত
মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের বসবাস ছিল। এলাকাটি জজকোর্ট ও আদালতপাড়ার কাছে
হওয়ায় সেখানে বেশির ভাগই ছিল আইনজীবী পরিবার। ওই পাড়াটিকে অনেকেই উকিলপাড়া
বলে জানত। অবশ্য ওখানে দু-একটি ডাক্তার ও সরকারি-আধা সরকারি কর্মকর্তা ও
কর্মচারী পরিবারও ছিল। চিনু ভাইয়ের বাবা মরহুম আব্দুল জব্বার খান তার
কর্মজীবনের শুরুতে ছিলেন একজন ‘মুনসেফ’ বা নিম্ন আদালতের বিচারক।
পরবর্তীকালে তিনি জেলা জজ ও শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েছিলেন। চাকরি থেকে
অবসরে গিয়ে খান সাহেব মুসলিম লীগ রাজনীতির মাধ্যমে পাকিস্তান জাতীয়
পরিষদের স্পিকার হয়েছিলেন। আমার বাবার সাথে আব্দুল জব্বার খানের আগে থেকেই
ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। বাবার কাছে খান সাহেবের অনেক প্রশংসা শুনেছি। বাবার কাছে
শুনেছি বিচারপতি আব্দুল জব্বার খান ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং
তিনি আইন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে ‘মুনসেফ’ হয়েছিলেন। চিনু ভাই তার
সদাব্যস্ত দীর্ঘ কর্মজীবনে রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা, চলচ্চিত্র
প্রযোজনাসহ অনেক কিছুই করেছেন।
অবশ্য জীবনের শেষ দিকে সাংবাদিকতায় ফিরে
এসেছিলেন। আগেও কোনো এক সময় তিনি সাংবাদিকতায় ছিলেন (দৈনিক সংবাদের সহকারী
সম্পাদক ছিলেন)। তিনি তাদের পরিবারের মালিকানাধীন ইংরেজি ‘সাপ্তাহিক
হলিডে’র উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বাংলা দৈনিক নয়া দিগন্তসহ
একাধিক পত্রিকায় কলাম লিখতেন। চিনু ভাই কলাম লেখার ক্ষেত্রে তার বিষয়
নির্বাচনে রাজনীতিকেই বিশেষ করে বেছে নিয়েছিলেন এবং তার লেখায় জাতীয়তাবাদের
প্রতি তার বিশ্বাস ও সমর্থন বিশেষভাবে প্রকাশ পেত। চিনু ভাই প্রথম জীবনে
বামপন্থী কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। জীবনের শেষ দিকে
এসে তিনি অনেকের কাছেই বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি
পেয়েছিলেন। আমার সাথে চিনু ভাইয়ের প্রথম পরিচয় হয়েছিল আমার কৈশোরে এবং তার
প্রথম যৌবনে। এখন থেকে প্রায় ছয় যুগ বা ৭২ বছর আগে ১৯৪৩-৪৪ সালে। মাঝখানে
একটা দীর্ঘ সময় আমাদের দু’জনের মধ্যে তেমন একটা যোগাযোগ ছিল না। তখন আমাদের
দু’জনের দেখাসাক্ষাৎ খুব কমই হতো। ছাত্রজীবনের পর সাংবাদিকতার জগতে তার
সাথে আবার যখন দেখা হলো, তখন থেকে তাকে অনেকটাই কাছে পেয়েছি।
শেষের দিকে
বেশ ক’বছর প্রায়ই দেখা হতো, কথা হতো এবং তার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে
আলাপ-আলোচনার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মাঝে মধ্যেই সুযোগ
হতো চিনু ভাইয়ের সাথে বসে সমাজ, রাজনীতি এবং দেশে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে
কথা বলার। ইংরেজি ’৪৭ সালের আগস্টে ভারতের স্বাধীনতা ও পাকিস্তান সৃষ্টির
পর ’৪৮ সালে যখন চিনু ভাই রাজনীতির সাথে বিশেষ করে বামপন্থী, কমিউনিস্ট
রাজনীতির সাথে যুক্ত হলেন তখন আমাদের দু’জনের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য একটা
দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য ওই সময় এক বছরের জন্য মুন্সীগঞ্জ
হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে ’৪৯-এ নবম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম আমার পুরনো
বিদ্যাপীঠ বরিশাল জিলা স্কুলে। এক সময় জানতে পারলাম মুন্সীগঞ্জ হলো, এককালে
তার বাবার কর্মস্থল হলো চিনু ভাইয়ের জন্মস্থান। উল্লেখ্য, আমার জন্মস্থান
আমার নানার কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জে। আমি ’৪৯ সালের শুরুতে বরিশাল ফিরে গিয়ে
জিলা স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম তখন চিনু ভাই তার কলেজ জীবন শুরু করতে
ঢাকা চলে এসেছিলেন।
সেই থেকে বেশ কিছু সময় চিনু ভাই ও আমার মধ্যে যোগাযোগ
অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। হয়তো বা এর একটা কারণ ছিল, চিনু ভাইয়ের কমিউনিস্ট
অর্থাৎ বামপন্থী রাজনীতির বিষয়ে আমার তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। রাষ্ট্র,
সমাজ ও জীবন সম্পর্কে চিনু ভাইয়ের আদর্শগত বিশ্বাস ছিল দৃঢ়, তার লক্ষ্য ছিল
স্থির। লক্ষ করেছি, চিনু ভাই তার স্বভাবসুলভ মিষ্টিমধুর বাচনভঙ্গির
মাধ্যমে তার আদর্শ ও বিশ্বাস কেমন করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত করার
প্রয়াস পেতেন। অনেক সময় বিস্মিত হয়েছি, তিনি কেমন করে তার নিজস্ব বিশেষ
বাকধারায় যুক্তিতর্কের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের মধ্যে প্রত্যয় সৃষ্টি করতে
সক্ষম হতেন। প্রতিপক্ষকে তার নিজের মতে আকর্ষণ করা বা তার মধ্যে বিশ্বাস ও
প্রত্যয় সৃষ্টি করার ব্যাপারে তার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। চিনু ভাই তর্কের
ক্ষেত্রে বাচনভঙ্গিতে ছিলেন মিষ্টিমধুর ও সাবলীল। কিন্তু তার যুক্তির শক্তি
ছিল প্রবল। তিনি তার বিরুদ্ধবাদীদের সহজেই তার প্রতি আকর্ষণ করতে সমর্থ
হতেন। আমার শৈশব-কৈশোর থেকে যখন চিনু ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ও হৃদ্যতা,
তখন থেকেই লক্ষ করেছি তার মধ্যে এক উদার মানসিকতা, গভীর মানবতাবোধ এবং
অমায়িক নিরহঙ্কার প্রকৃতি।
পরে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আবার যখন তার
সান্নিধ্য পেয়েছি, তখনো লক্ষ করেছি চিনু ভাইয়ের সেসব মানবিক গুণের কোনো
পরিবর্তন হয়নি। তার ব্যক্তিগত চরিত্রের ওই বিশেষ দিকটি তাকে তার শেষ জীবনেও
উজ্জ্বল ও ভাস্বর করে রেখেছিল। চিনু ভাইয়ের আচরণ ও ব্যবহার এবং তার
মিষ্টিমধুর বাচনভঙ্গির সাথে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। তিনি অন্যের
মন-মেজাজ বুঝে তাদের সাথে যথাযথ আচরণ করতেন। কোনো বিশেষ অবস্থায় কী করা বা
কী বলা উচিত বা কোনটি সঙ্গত বা কোনটি অসঙ্গত, তা উপলব্ধি করার ব্যাপারে তার
ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। ফলে তার প্রতিপক্ষ তার যুক্তি অনেক সময়ই সহজে গ্রহণ
করত। চিনু ভাই নামের ওই সহজ সরল মানুষটিকে আমার কাছে অনেক সময়ই অত্যন্ত
কৌশলী মনে হয়েছে। তার চরিত্রে ও মননে ছিল কোন্টি, কর্তব্য আর কোনটি কর্তব্য
নয়, তা নির্ণয়ের এক অসামান্য ক্ষমতা। ইংরেজ শাসনের অবসানে যখন ধর্মীয়
সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি রাষ্ট্রের সৃষ্টি
হয়েছিল, তখন যুবক বয়সী সাদেক খান ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতায় দৃঢ়বিশ্বাসী।
তাই
তিনি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বলিষ্ঠভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছিলেন। একজন
বিশ্বাসী কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে চিনু ভাইয়ের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
স্বাভাবিকভাবেই ছিল উদার ও অসাম্প্রদায়িক এবং তিনি ছিলেন সর্বপ্রকার
গোঁড়ামি থেকে মুক্ত। চিনু ভাইয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাংবাদিকতা এবং
সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ও তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আনুগত্যের
ক্ষেত্রে কোনো এক সময় বিশেষ পরিবর্তনের কথা অনেকেই অনেক সময়
আলোচনা-সমালোচনা করে থাকেন। তারা ওই পরিবর্তনকে তার চরিত্রের দুর্বলতা বলেও
চিহ্নিত করতে প্রয়াস পান। চিনু ভাইয়ের ওইসব সমালোচকের যুক্তি খণ্ডন করতে
চেষ্টা করব না। তবে আমার প্রায়ই মনে হয়েছে, চিনু ভাই চেয়েছিলেন দেশের
মঙ্গল, মানুষের কল্যাণ ও সমাজের সার্বিক উন্নয়ন। তার মূল লক্ষ্যে পৌঁছার
উদ্দেশ্যে তার মত ও পথে আমরা কোনো কোনো সময় কিছু বৈপরীত্য ও পরিবর্তন লক্ষ
করি। তার সমালোচকেরা চিনু ভাইকে যেভাবে দেখবেন আমি এবং আমরা অর্থাৎ তার
ভক্তরা, যারা তাকে ভালোবেসেছি, শ্রদ্ধা করতে শিখেছি; তারা তাকে হয়তো একই
দৃষ্টিতে দেখব না।
তাই চিনু ভাইয়ের ওপর আজকের এ লেখাটি এই বলে শেষ করতে চাই
যে, সবার সাদেক খান এবং আমার ও আমাদের চিনু ভাই ছিলেন বড় মনের একজন মানুষ,
বহুগুণে গুণান্বিত এক বিশাল ব্যক্তিত্ব। তার চরিত্রের দৃঢ়তা ও মনের উদারতা
আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি নিজেকে মনে করি, চিনু ভাইয়ের একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত।
[অনুজপ্রতিম সাংবাদিক সহকর্মী আব্দুর রহমান খান ১৬ মে আমাকে প্রথম চিনু
ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ জানালেন। শুনলাম, চিনু ভাই সকালে বাথরুমে অজ্ঞান হয়ে
পড়ে গিয়েছিলেন। আপনজনেরা যখন তাকে দেখতে পেলেন, তখন তিনি মৃত। তাকে অবশ্য
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু চিনু ভাই আর ফিরে এলেন না।] চিনু
ভাইয়ের মহাপ্রয়াণে আমার বলতে ইচ্ছে হয়, ‘চিনু ভাই! তোমার এখন বেঁচে থাকা বড়
প্রয়োজন ছিল। তোমাকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের বড়ই প্রয়োজন।’

No comments:
Post a Comment