কোলরিজের (Hertley Coleridge) কথায় 'The
soul of man is larger than sky, deeper than ocean, or the abysmal dark
of the unfathomed center. মানুষের আত্মা হলো আকাশের চেয়েও বৃহৎ। মহাসমুদ্র
অথবা অন্তহীন অন্ধকার গভীর কেন্দ্র থেকেও গভীর। তাই উদারতায় মানুষ এত
বিশাল। ভবিষ্যৎ দর্শনে এত পারঙ্গম। সৃজনশীলতায় এত কৃতবিদ্য। সিদ্ধান্ত
গ্রহণে এত দক্ষ। ব্যক্তি হিসেবে হতে পারে সঙ্কীর্ণ, কৃপণ, হিংসুটে। কিন্তু
সামাজিক প্রাণী হিসেবে, যুগ যুগ ধরে এক সাথে বাস করে অথবা বাস করতে হবে
জেনে সেই সঙ্কীর্ণতা পরিহার করতে শিখেছে। কার্পণ্য বা হিংসুটেপনা ত্যাগ
করতে মানুষই পারে। মনুষ্যত্বের ধর্মই এটা। মানুষের সৃষ্টি তাই আকাশের মতো
উদার হয়। সর্বকল্যাণের উপযোগী হতে তাই হয় গভীর। এ কারণেই যোগ্য নেতৃত্বের
মানস হয় আকাশের মতো প্রসারিত। এ জন্যই যোগ্য নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত হয়
যুগান্তকারী, সদর্থক, কল্যাণময়।
কথাগুলো বলছি এ জন্য যে, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ, যার জন্ম হয়েছে জনগণের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে, হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণের মতো স্বাধীনতার তীর্থক্ষেত্ররূপে, তা আজ সঙ্ঘাতের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত, অনেকটা বাসের অযোগ্য এক জনপদে রূপান্তরিত হয়েছে। হয়ে উঠেছে শান্তিপূর্ণ জীবনের অযোগ্য। এ জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই। প্রধানত দায়ী আমাদের রাজনীতিকেরা। কোনো অভিযোগ না রেখেই বলতে চাই, এটা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্দৈব। ইচ্ছা করলে আমরা এই জনপদকে আবারো পরিণত করতে পারি স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য, শান্তি ও সুখের স্বপ্নরাজ্যে; এ জন্য কোনো ফেরেশতার প্রয়োজন নেই। নেই কোনো ভিন্ন জগতের দেবতার। আমাদের রাজনীতিকেরাই তা পারেন। এ জন্য চাই শুধু এক কল্যাণকামী মন। চাই আকাশের মতো উদার মননশীলতা। চাই মহাসমুদ্রের গভীর সহনশীলতার আশীর্বাদ। এ জন্য প্রয়োজন সংলাপ-আলোচনা-পর্যালোচনার বিস্তীর্ণ সুযোগ।
সংলাপ কিন্তু ক্বচিত সফল হয় যদি তার পূর্বশর্তগুলো পূরণ না হয়। এক. সংলাপকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছাতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয় দেশের দুই জোটের নেতাদের মধ্যে কিঞ্চিত হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। এটি হলো প্রাথমিক শর্ত। দুই. সংলাপ হবে দেনা-পাওনার জন্য। ফলে সংলাপে বসার আগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার মানসিকতা অর্জন করতে হবে। তিন. জেদ সংলাপের মহাশত্রু। জেদ পরিহার করেই যা যৌক্তিক তা মেনে নেয়ার মানসিকতা এ ক্ষেত্রে মণিকাঞ্চনস্বরূপ। সংলাপ হতে হবে, আমরা সবাই জানি, আগামী জাতীয় নির্বাচন কীভাবে সম্পন্ন হবে তা নির্ধারণের জন্য। এটাও আমরা জানি, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়ের ভিত্তিতে, ১৯৯৬ সালে গৃহীত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট নির্দলীয় ব্যবস্থাকে ২০১১ সালের ১০ মে কিছু পর্যবেক্ষণসহ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করার পরে এটাও বলেছেন, রাষ্ট্রের স্বার্থে এবং জনকল্যাণের বিবেচনায় এই নির্দলীয় ব্যবস্থাকে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। দেশের রাজনীতিকেরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার ঝড় চলেছে জোরেশোরে, সারা দেশে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এটিকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে স্ববিরোধী বলে চিহ্নিত করেছেন।
কথাগুলো বলছি এ জন্য যে, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ, যার জন্ম হয়েছে জনগণের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে, হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণের মতো স্বাধীনতার তীর্থক্ষেত্ররূপে, তা আজ সঙ্ঘাতের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত, অনেকটা বাসের অযোগ্য এক জনপদে রূপান্তরিত হয়েছে। হয়ে উঠেছে শান্তিপূর্ণ জীবনের অযোগ্য। এ জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই। প্রধানত দায়ী আমাদের রাজনীতিকেরা। কোনো অভিযোগ না রেখেই বলতে চাই, এটা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্দৈব। ইচ্ছা করলে আমরা এই জনপদকে আবারো পরিণত করতে পারি স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য, শান্তি ও সুখের স্বপ্নরাজ্যে; এ জন্য কোনো ফেরেশতার প্রয়োজন নেই। নেই কোনো ভিন্ন জগতের দেবতার। আমাদের রাজনীতিকেরাই তা পারেন। এ জন্য চাই শুধু এক কল্যাণকামী মন। চাই আকাশের মতো উদার মননশীলতা। চাই মহাসমুদ্রের গভীর সহনশীলতার আশীর্বাদ। এ জন্য প্রয়োজন সংলাপ-আলোচনা-পর্যালোচনার বিস্তীর্ণ সুযোগ।
সংলাপ কিন্তু ক্বচিত সফল হয় যদি তার পূর্বশর্তগুলো পূরণ না হয়। এক. সংলাপকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছাতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয় দেশের দুই জোটের নেতাদের মধ্যে কিঞ্চিত হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। এটি হলো প্রাথমিক শর্ত। দুই. সংলাপ হবে দেনা-পাওনার জন্য। ফলে সংলাপে বসার আগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার মানসিকতা অর্জন করতে হবে। তিন. জেদ সংলাপের মহাশত্রু। জেদ পরিহার করেই যা যৌক্তিক তা মেনে নেয়ার মানসিকতা এ ক্ষেত্রে মণিকাঞ্চনস্বরূপ। সংলাপ হতে হবে, আমরা সবাই জানি, আগামী জাতীয় নির্বাচন কীভাবে সম্পন্ন হবে তা নির্ধারণের জন্য। এটাও আমরা জানি, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়ের ভিত্তিতে, ১৯৯৬ সালে গৃহীত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট নির্দলীয় ব্যবস্থাকে ২০১১ সালের ১০ মে কিছু পর্যবেক্ষণসহ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করার পরে এটাও বলেছেন, রাষ্ট্রের স্বার্থে এবং জনকল্যাণের বিবেচনায় এই নির্দলীয় ব্যবস্থাকে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। দেশের রাজনীতিকেরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার ঝড় চলেছে জোরেশোরে, সারা দেশে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এটিকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে স্ববিরোধী বলে চিহ্নিত করেছেন।
এমনকি আরো জানা গেছে, আপিল
বিভাগের সব বিচারপতি এ বিষয়ে একমত হতে পারেননি। সংখ্যাধিক্যের জোরে প্রধান
বিচারপতি এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। অনেকের আশঙ্কা, এই রায়
বাংলাদেশে সৃষ্টি করবে এমন এক সমস্যা যাতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পর্যন্ত
অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই সিদ্ধান্ত যদি কার্যকর করা সম্ভব না হয়, তা হলে
ক্ষমতাসীন জোট এবং প্রধান বিরোধী জোটের মধ্যে গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তীকালীন
নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থা তৈরি হোক যা দেশে সুষ্ঠু, অবাধ এবং
গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে সক্ষম। তা না হলে যে গণতন্ত্রের জনদাবির
প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল তা অর্থহীন হয়ে পড়বে এবং
দেশে অস্থিতিশীলতা স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
এ প্রসঙ্গে David Forsythe যা বলেছেন তা উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, এ বিশ্বে মানবকল্যাণের জন্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালতের দিকে কেউ তাকিয়ে থাকেনি। জনগণই নিজেদের উদ্যোগে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করে তা সম্পন্ন করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপারথাইট (Apartheid) বা বর্ণবাদ নিশ্চিহ্ন হয়েছে কোনো আদালতের রায়ের মাধ্যমে নয়। বার্লিনের যে দেয়াল জার্মানিকে দীর্ঘ দিন বিভক্ত করে রেখেছিল, তাও ভেঙে ফেলা হয়েছে জনগণের দ্বারা; কোনো আদালতের রায়ের ফলে নয়। ইউরোপ থেকে কমিউনিজম বিতাড়িত হয়েছে জনস্বার্থে, জনগণের দ্বারা, কোনো আদালতের রায়ে নয়। শাহের আমলে ইরানে জননির্যাতনের যে কলাকৌশল ছিল, তা নির্মূল হয় জনতার রুদ্ররোষে; কোনো আদালতের রায়ে নয়। লাতিন আমেরিকায় এল সালভাদরে নাগরিকদের হত্যার জন্য সুসংগঠিত ডেথ স্কোয়াডগুলোর অবসান ঘটেছে জাগ্রত জনতার সংগ্রামের ফলে। এমনকি, যে মুক্তিযুদ্ধের ফসল হলো স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, তারও সূচনা হয়েছিল কোনো আদালতের রায়ে নয়। এসব কারণে সংলাপের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিলুপ্ত হয়েছে, তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অথবা জাতীয় সরকার অথবা নির্বাচন পরিচালনা পরিষদ অথবা অন্য যেকোনো নামে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে David Forsythe যা বলেছেন তা উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, এ বিশ্বে মানবকল্যাণের জন্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালতের দিকে কেউ তাকিয়ে থাকেনি। জনগণই নিজেদের উদ্যোগে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করে তা সম্পন্ন করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপারথাইট (Apartheid) বা বর্ণবাদ নিশ্চিহ্ন হয়েছে কোনো আদালতের রায়ের মাধ্যমে নয়। বার্লিনের যে দেয়াল জার্মানিকে দীর্ঘ দিন বিভক্ত করে রেখেছিল, তাও ভেঙে ফেলা হয়েছে জনগণের দ্বারা; কোনো আদালতের রায়ের ফলে নয়। ইউরোপ থেকে কমিউনিজম বিতাড়িত হয়েছে জনস্বার্থে, জনগণের দ্বারা, কোনো আদালতের রায়ে নয়। শাহের আমলে ইরানে জননির্যাতনের যে কলাকৌশল ছিল, তা নির্মূল হয় জনতার রুদ্ররোষে; কোনো আদালতের রায়ে নয়। লাতিন আমেরিকায় এল সালভাদরে নাগরিকদের হত্যার জন্য সুসংগঠিত ডেথ স্কোয়াডগুলোর অবসান ঘটেছে জাগ্রত জনতার সংগ্রামের ফলে। এমনকি, যে মুক্তিযুদ্ধের ফসল হলো স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, তারও সূচনা হয়েছিল কোনো আদালতের রায়ে নয়। এসব কারণে সংলাপের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিলুপ্ত হয়েছে, তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অথবা জাতীয় সরকার অথবা নির্বাচন পরিচালনা পরিষদ অথবা অন্য যেকোনো নামে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দেশে
বর্তমানে যে দু’টি রাজনৈতিক জোট বিদ্যমান তাদের পারস্পরিক বিদ্বেষ,
অনাস্থা, অবিশ্বাস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য
জাতীয় পর্যায়ে সৃষ্টি হতে হবে নিরপেক্ষতার এক প্রতীক (A symbol of
neutrality) অথবা পক্ষপাতহীন এক ব্যবস্থা (A system of impartiality)।
প্রথমে এই দাবি ছিল শুধু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের। এখন এই দাবি জনগণের,
বিশিষ্টজনদের, বুদ্ধিজীবী মহলের। এই দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচন অনুষ্ঠান
হবে এক প্রহসন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পর্যন্ত তা পরিব্যাপ্ত হয়েছে। এরও
কারণ আছে। যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, তাদের নির্ভর করতে হবে দেশের
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর এবং তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষমতাসীনদের
দলীয়করণের ফসল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক এবং এই বাহিনীতেও রয়েছে
বিশেষ এলাকার বিশেষ দলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দলীয় কর্মী। দুর্নীতি দমন
কমিশনের চেয়ারম্যান নিজেই বলেছেন, এটি দন্তনখরহীন এক সংগঠন। মানবাধিকার
কমিশনের চেয়ারম্যান নিজেই বলেছেন, দেশে আইনের শাসন নেই এবং মানবাধিকার
লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে চলছে অহরহ। তাই বলি, দুই জোটের নেতাদের মধ্যে সংলাপ হোক।
সংলাপের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসুক সর্বজনগ্রাহ্য একটা সমাধান।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
No comments:
Post a Comment