আজ
১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
প্রতি বছর সারা বিশ্বে নানান আয়োজনে এ দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য
হলো ‘স্বাস্থ্যকর জীবন এবং নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের জন্য পরিবার’। ১৯৯৫ সাল
থেকে পুরো বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। জাতিসঙ্ঘ
প্রথম ১৯৯৪ সালকে পরিবার বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। বছর শেষে সার্বিক অবস্থা
বিবেচনা করে জাতিসঙ্ঘ সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার প্রথাকে জিইয়ে রাখতে হলে নিয়মিত
রিমাইন্ডার প্রয়োজন। সে ধারণা থেকেই ১৯৯৫ সাল থেকে পরিবার দিবসের সূচনা
করে। পাশ্চাত্যে পরিবার প্রথা বিলুপ্তির আশঙ্কা থেকেই মূলত পরিবার দিবসের
উৎপত্তি। জাতিসঙ্ঘের পরিবার দিবসের ইতিহাস হিসেবে সে সময়কার পাশ্চাত্য
সমাজে পরিবারগুলো ভেঙে পড়ার কারণকেই মূলত বলা হয়েছে। বৃদ্ধাশ্রমবিরোধী
প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে। প্রতি বছর আমেরিকাতেই এ প্রচারণা বাবদ লাখ লাখ
ডলার খরচ করা হয়। ইউরোপিয়ান সমাজে দুই ধরনের পরিবারই দেখা যায়। আধুনিকতা
যান্ত্রিকতার ছোঁয়া পাওয়া সমাজে পরিবারের প্রাধান্য না থাকলেও ঐতিহ্যবাহী
পরিবারগুলোতে এখনো পারিবারিক রীতিনীতি চোখে পড়ে। বিশেষ করে, ইউরো জোনের
বাইরে থাকা দেশগুলোর সমাজে এখনো অনেক জায়গাতেই পরিবার প্রথা টিকে আছে।
আমাদের বাঙালি সমাজে পরিবারব্যবস্থা অত্যন্ত মজবুত বলে পুরো বিশ্বদরবারে
বাঙালি সমাজের আলাদা সুনাম রয়েছে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় যুগের দোহাইয়ে
চাপা পড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের পরিবারব্যবস্থা।
এককালে যৌথ পরিবার বা
বৃহৎ পরিবারই বাঙালি পরিবারের মুখ্য বৈশিষ্ট্য ছিল। বাবা-মা ভাই-বোন,
চাচা-চাচী, ফুফু, দাদা-দাদী সবাইকে নিয়েই পরিবার গঠিত হতো। এভাবেই শিশুদেরও
শেখানো হতো। এরা সবাই নিজের লোক। আপনার পরিবার। আগে শিশুদের পরিবারের
সদস্য সংখ্যা জিজ্ঞেস করলে উত্তর আট-দশজনের কম হতো না। কিন্তু ইদানীং
শিশুরা তা বলছে না। তারা বলছে পরিবার মানে আমি, বাবা ও মা। ক্ষেত্রবিশেষে
দু-এক ভাইবোন। কিন্তু দাদা-দাদী, চাচা-ফুফু এরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই
অনুপস্থিত। বাসায় এদের উপস্থিতি থাকলেও মেহমান হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।
অর্থাৎ বাইরের লোক। কারণ তারা যে পরিবারভুক্ত সেটা শিশুরা জানছেই না। আর না
জানার কারণ তাদের বাবা-মায়েরাই সেটা মানছে না। সময়ের সাথে নগরায়নের ফলে
ধীরে ধীরে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে যেতে শুরু করে। তার জায়গায় স্থান করে নেয়
ুদ্র পরিবার। যোৗথ পরিবারের স্থান সীমাবদ্ধ থাকে কেবল গ্রামে মফস্বলে।
আজকাল গ্রামেও আর তেমনভাবে যৌথ পরিবার চোখে পড়ে না। সত্যিই কি যৌথ পরিবারের
আবেদন আর নেই? যৌথ পরিবার প্রথাটিকে জাদুঘরে পাঠানোর সময় কি হয়ে গেছে?
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবার ছোট হলেই সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করা যাবে, এ
ধারণাটি মোটেও ঠিক নয়। বরং একই পরিবারে অনেকগুলো মানুষ থাকার ফলে শিশুর
ভেতর সব ধরনের মানুষের প্রতি সহনশীলতা তৈরি হয়। আন্তরিকতা বাড়ে।
আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি হয় না।
সমাজবিজ্ঞানী রাশেদা ইরশাদ বলেন, ‘আমরা অনেক
ভাইবোন। তার ওপর আমাদের বিশাল পরিবার ছিল। তার পরও আজ আমরা সবাই যার যার
অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। আমরা তো বখে যাইনি বা অপ্রতিষ্ঠিত নই! আমার মা সব দিক
সামলে আমাদেরও মানুষ করেছেন। ফলে আমরা বোনেরাও ওই মানসিকতা নিয়েই বড়
হয়েছি। কথনোই বড় পরিবারকে বোঝা মনে হয়নি।’ পরিবার প্রথা বিলুপ্ত হওয়া মানব
সভ্যতার জন্যই বিরাট হুমকি। পরিবারই মানব সভ্যতার সূতিকাগার। এ কারণেই
পরিবারকে সমাজের একক বলা হয়। এককটিই ভঙ্গুর হয়ে গেলে সমাজ বিনষ্ট হবে।
বিশৃঙ্খল হবে। পরিবারই মানুষকে শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়। সহনশীলতা শেখায়।
ভাগাভাগি করতে শেখায়। স্বার্থপরতা রোধ করে। আজকাল সমাজে যে অসহযোগিতার
চর্চা দেখা যাচ্ছে, তার কারণ হিসেবেও পরিবারব্যবস্থাই এসে পড়ে। শিশু বয়স
থেকে একলা থাকতে থাকতে ব্যক্তির ভেতর এক ধরনের স্বার্থপরতা জন্মায়। আমার
আমিত্বটাই তার কাছে মুখ্য থাকে। কারণ সে জানে না ভাগাভাগির আনন্দ। ত্যাগের
মহত্ত্ব। শাসন না পেয়ে হয়ে ওঠে স্বেচ্ছাচারী। আজকের তরুণ প্রজন্মের বখে
যাওয়ার কারণ খুঁজলে দেখা যাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অন্তঃসারশূন্য পারিবারিক
পরিবেশই এর জন্য দায়ী। যৌথ পরিবারে অনেক সদস্য থাকায় শিশু প্রতিপালন থেকে
শুরু করে আপদ-বিপদে সব অবস্থায় সহযোগিতা পাওয়া যায়।
চাকরিজীবী মায়েদের
সন্তানদের আজ ডে কেয়ার সেন্টারে পাঠাতে হচ্ছে, নয়তো কাজের লোকের কাছে
দেখাশোনার ভার ছাড়তে হচ্ছে। যেখানে শিশুরা শিখতে পারছে না কোনো শিষ্টাচার,
কোনো দায়িত্ববোধ। যৌথ পরিবার হলে দাদী, নানী, ফুফু, খালা ইত্যাদি লোকেরাই
শিশুটিকে দেখাশোনা করতে পারত মায়ের অনুপস্থিতিতে। যাদের শিশুরা হোমে যায়
না, তারা বাড়িতে একা থেকে থেকে একসময় অসামাজিকতায় ভোগে। যেটা তার ভবিষ্যৎই
অন্ধকার করে দেয়। অনেক পরিবারেই স্বামীকে বিদেশবিভুঁইয়ে পেশাগত কারণে
অবস্থান করতে হয়। সে ক্ষেত্রে বাড়ির একমাত্র পুরুষ লোকটির অনুপস্থিতিতে
স্ত্রী-সন্তানকে পড়তে হয় বিপাকে। নিজের দায়িত্বের পাশাপাশি পুরুষালি সব
দায়িত্বও পালন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সুষ্ঠুভাবে কোনোটিই পালন
হয় না। হলেও সেখানে ভালোবাসার চেয়ে যান্ত্রিকতাই বেশি জায়গা নিয়ে নেয়।
নিরাপত্তাজনিত সমস্যা তো আছেই। যৌথ পরিবারগুলোতে যা হয় না। বাবা না থাকলেও
চাচা, মামা, ভাই অনেক দায়িত্ববান লোক থাকে যাদের দ্বারা সাময়িক সমস্যাগুলো
মিটে যায়। শহুরে জীবনে একক পরিবারের আধিক্যে যৌথ পরিবার বিলুপ্ত প্রায়।
কিন্তু বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়েও সুখ সমৃদ্ধির পূর্ণতা কি অর্জন
হচ্ছে?
বেসরকারি সমীক্ষা বলে তালাকের পরিমাণ বেড়েছে গত দশ বছরে। অর্থাৎ একক
পরিবার গঠন করেও সুখশান্তির অভাব রয়েই যাচ্ছে। একক পরিবারও ভেঙে যাচ্ছে।
গঠিত হচ্ছে নতুন পরিভাষা। সিঙ্গেল মাদার ফ্যামিলি। বা সিঙ্গেল ফাদার
ফ্যামিলি। যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবার। সেটাও রূপান্তরিত হচ্ছে সিঙ্গেল
মাদার ফ্যামিলি, অর্থাৎ একক অভিভাবক পরিবারে। এর কারণ সমাজবিজ্ঞানীরা মনে
করেন, অসহনশীলতা ও অবাধ স্বাধীনতার বিস্তার। যৌথ পরিবার হারিয়ে যাওয়াই এর
মূল কারণ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝামেলা হলে একক পরিবারে সমঝোতা করাবার মতো
কেউ থাকে না। ফলে আবেগের বশে ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। এভাবে চলতে থাকলে
এক সময় একক অভিভাবকের পরিভাষাও বাদ হয়ে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে চরম
বিপর্যয়।
বৃদ্ধি পাবে ভাসমান মানুষের সংখ্যা। ফলে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি
পায়। যৌথ পরিবারের সব দিক ভালো হবে এমন কোনো কথা নেই। কিছু ব্যতিক্রম আছে
অবশ্যই। আবার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। অনেক সময়েই নিজেকে সন্তানকে
অনেক ত্যাগ করতে হয়। বঞ্চনা বৈষম্য সহ্য করে নিতে হয়। কিছু হারাতেও হয়। তবে
যুগ যুগ ধরে যৌথ পরিবার প্রথার ফলে সৃষ্ট অশান্তি, ত্যাগ, সমঝোতা, বঞ্চনা,
বৈষম্য যতটা না মন্দ ফল দিয়েছে তার চেয়ে ঢের বেশি কল্যাণকর ফল দিয়েছে। সব
অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় রূপদান করতে চাইলে মানুষ একসময় স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে।
সমাজে স্বেচ্ছাচারিতা বেড়ে গেলে সমাজে ভাঙন নিশ্চিত। সমাজের ভাঙন রোধ করতে
চাইলে কিছুটা আগল পায়ে জড়ানো খারাপ নয়।

No comments:
Post a Comment