সকালের ঝুমবৃষ্টির মধ্যে রওনা হলাম
পাহাড়ের পথ ধরে। পুরোটা পথজুড়ে সবুজ পাহাড় যেন নিজেকে ঢেকে রেখেছে বৃষ্টির
নরম চাদরে। সাজেক যাওয়ার পথে কয়েকবার যাত্রাবিরতি আছে। পথে প্রথম বিরতি
বাঘাইহাট বাজারে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এই পাহাড়ি বাজারের পাশ দিয়ে চলে গেছে
কাচালং নদী। এখানে কিছুক্ষণের বিরতি শেষ করে আবার চলা শুরু। মূলত সাজেকের
ভ্রমণার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে বাঘাইঘাট বাজার থেকে সাজেক
পর্যন্ত সবগুলো জিপকে নিরাপদে পৌঁছে দেন নিরাপত্তাবাহিনীর কর্মীরা।
বাঘাইহাট বাজারের পর গঙ্গারাম মুখ। দু’পাশ থেকে বয়ে আসা দু’টি নদী এক হয়েছে
এখানে। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সর্পিল নদী চলে গেছে বহু দূর। সাজেক
যাওয়ার রাস্তার দু’পাশের বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি ঘর। নীল আকাশের নিচে বিশাল
সমৃদ্ধ বনভূমির সন্ধান পাবেন কেবল সাজেক ভ্যালির পথে। উড়োবাজার,
গঙ্গারামমুথ, নন্দরাম এসব পাহাড়ি পাড়া পেরিয়ে আমাদের দ্বিতীয় যাত্রাবিরতি
মাচালং বাজার। পাশের সীমান্তঘেঁষা ভারত থেকে আসা মাচালং নদীর অববাহিকায় গড়ে
উঠেছে ছোটখাটো বাজার। এই এলাকা সাজেক ইউনিয়নের প্রধান কেন্দ্রস্থল।
পাহাড়ের জুমের ফসল বিক্রি করার আদর্শ স্থান এই মাচালং বাজার। মাচালং বাজার
থেকে সাজেকের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার।
![]() |
| সাজেকে ঠুকতেই চোখে পরবে সাজেক রিসোর্টে |
বন্ধুর পথের দু’পাশেই আকাশচুম্বী
পাহাড়ের বুকে দেখা মিলবে বৃক্ষরাজির। মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন বসতি। নীল আকাশ
আর পাহাড়ে মেঘের গড়াগড়ি দেখতে দেখতেই পৌঁছে যাই মেঘের রাজ্য সাজেকে।
সাজেকের শুরুতেই চোখে পড়বে রুইলুইপাড়া। এটা সাজেক উপত্যকার মূল কেন্দ্র।
রুইলুইপাড়ায় লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। পাড়ার সবগুলো
বাড়ির রঙ লাল-সবুজ। রুইলুইপাড়ায় বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট পাবেন। ফ্রেশ হয়ে
দুপুরের খাবার সেরে ঘুরে আসতে পারবেন হেলিপ্যাড থেকে। বিকেলটা
রুইলুইপাড়াতেই কাটাতে পারবেন। খুব ভোরে উঠেই কংলাকপাড়ায় চলে যাবেন, হেঁটে
যেতে ৩০-৪০ মিনিট লাগবে। কাঁচা রাস্তা এবং কিছুটা পাহাড় আছে, তাই ভালো
গ্রিপ আছে এমন জুতো পরে যাবেন। রুইলুইপাড়ার হেলিপ্যাডের পাশ দিয়ে সোজা
উত্তরে একটি রাস্তা চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরে এগোলেই কংলাকপাড়ায় পৌঁছে
যেতে পারবেন। কংলাক আগে মূলত লুসাই ও পাংখোয়া অধ্যুষিত পাড়া ছিল। এখন
পাংখোয়া নেই বললেই চলে, কিছু লুসাই পরিবার আছে। আর আছে ত্রিপুরা। কংলাক
সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। কংলাকে কারো বাসায় ঢুকতে চাইলে বিনা সঙ্কোচেই
ঢুকতে পারেন, তবে ঢোকার আগে অনুমতি নেয়া ভালো।
![]() |
| সাজেক হ্যালিপ্যাড থেকে রুনময় রিসোর্ট |
চাইলে কংলাক থেকে আরো সামনের
দিকে যেয়ে ঘুরে আসতে পারেন। কিছু দূর গেলে কমলাবাগান দেখতে পাবেন। ঘুরে
এসে দুপুরের আগেই গাড়িতে উঠবেন, আসার পথে বাঘাইহাট এলাকায় হাজাছড়া ঝরনা
দেখে আসবেন। রাস্তা থেকে ১০-১৫ মিনিট হাঁটলেই ঝরনায় যাওয়া যায়। যাওয়ার পথে
তেমন কোনো পাহাড় নেই, তাই যে কেউই যেতে পারে। সময় থাকলে জিপ রিজার্ভ নিয়ে
যেতে পারবেন রিসাং ঝরনায়। ঝরনা থেকে আসার সময় আলুটিলা প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ
দেখে আসবেন। সুড়ঙ্গে ঢোকার জন্য মশাল কিনতে পারবেন ওখান থেকেই, তবে
মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটই সবচেয়ে ভালো, মশালের আলোতে কিছুই দেখা যায় না।
বিকেলে শহরের পাশের জেলা পরিষদ পার্কে পাহাড়, ঝুলন্ত ব্রিজ এবং লেকে
বিকেলটা কাটিয়ে রাতের বাসে ঢাকা। রাতের সব বাস একসাথেই রাত ৯টায় ছাড়ে।
সবগুলো বাসের কাউন্টারই শহরের নারকেলবাগান এলাকায়। যাদের ট্রেকিংয়ের
অভিজ্ঞতা আছে, তারা এক দিন সময় বেশি নিয়ে দীঘিনালার তৈদুছড়া ঝরনা এলাকা
ঘুরে আসতে পারেন, একই এলাকায় বেশ কয়েকটি ঝরনা পাবেন, যাওয়ার ঝিরিপথটাও অনেক
সুন্দর। সকালে রওনা দিলে ফিরতে বিকেল হবে, পুরো পথই হেঁটে যেতে হয়। গাইড
নিতে হবে সাথে, না হয় চিনবেন না। আরো এক দিন বাড়তি সময় থাকলে ঘুরে আসতে
পারেন সিজুক ঝরনা থেকে।



No comments:
Post a Comment