Wednesday, August 31, 2016

তনুর পথেই কি আফসানা? by মানিক মুনতাসির

বছর তিনেক আগে আমার গ্রামের এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আমাকে বলেছিলেন, ‘অপরাধীর শাস্তি হবে, নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হবে না, ফরিয়াদী বিচার পাবে-এসব বেশ পুরনো কথা, এখন আর এসব আশা করে লাভ নেই। তবে যুদ্ধাপরাধীর বিচার আর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার অবশ্য আশা জাগিয়েছে, আমার আগের কথা সেদিক থেকে ঠিক নয়’। কিন্তু কুমিল্লার কলেজ ছাত্রী তনুর পরিবার কি আদৌ বিচার পাবে? নাকি আমরা বেমালুম ভুলে যাব যে, তনু নামের কাউকে হত্যা করা হয়নি। কিংবা এই নামের কেউ কোনো দিন পৃথিবীতে আসেনি। অবশ্য ইতোমধ্যে আমরা ভুলেও গিয়েছি তাকে। কেননা ইস্যুর তো আর শেষ নেই।
সত্যিই ঐ মুক্তিযোদ্ধার প্রথম কথা ভুল প্রমাণিত হয়েছে, যুদ্ধাপরাধী আর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হওয়ায়। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু হত্যার কয়েকটি ঘটনার তড়িৎ বিচার প্রক্রিয়াও মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু কুমিল্লার কলেজ ছাত্রী তনু আর ঠাকুরগাঁওয়ের মেয়ে আফসানা, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু, নারায়ণগঞ্চের সাত খুন ছাড়াও সাংবাদিক, অধ্যাপক, ব্লগার, প্রকাশক হত্যার ঘটনা মানুষের সে আশায় গুড়ে বালি ছিটিয়ে দিয়েছে। গত দুই বা তিন বছরে একটার পর একটা হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কিন্তু সুরাহা হয়নি বেশিরভাগেরই। না-ধরা পড়েছে খুনি, না-জানা গেছে হত্যার রহস্য। হত্যার কারণ সম্পর্কেও কিছু জানা যায়নি। সবকিছুই যেন ঘোলাটে।
এবার আসি ঠাকুরগাঁয়ের মেয়ে ঢাকার মিরপুরের সাইক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রী ফেরদৌস আফসানার কথায়। মানলাম আফসানা আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু এর পেছনে কারও কোনো প্ররোচনা ছিল কি-না, সেটা কি তদন্ত হওয়া উচিত নয়? এ ছাড়া আফসানা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সে বাড়ির মালিক বলছেন, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান ওরফে রবিনও সে বাড়িতে মাঝে মাঝে থাকতেন। অর্থাৎ তারা দুজনে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। আচ্ছা একবার ভাবুন তো আপনার স্ত্রী যদি আত্মহত্যা করেন, তাহলে পুলিশ সবার আগে কাকে সন্দেহ করবেন। আফসানার ক্ষেত্রে কি সেটা হচ্ছে, না হয়েছে। হ্যাঁ, মেনে নিলাম তারা বিয়ে করেননি। কিন্তু তারা এক সাথে থাকতেন কি-না বা থাকলে কেন থাকতেন, এসবের কি তদন্ত হওয়া উচিত নয়? আফসানার লাশ যারা হাসপাতালে নিয়ে এলেন তারা আসলে তার বন্ধু নাকি ঘাতক? তারা কি আদৌ দেশে আছেন। নাকি কারো সহায়তায় নিরাপদে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
আর একটা বিষয় খুবই অবাক করার মতো, যেখানে হাবিবুরের বাবা বলেছেন আইন অনুযায়ী তার ছেলে যদি অপরাধী প্রমাণিত হয়, তাহলে তিনি তা মেনে নেবেন। অথচ আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এখন পর্যন্ত তাকে ধরতেই পারলেন না। এমন কি তার অবস্থান পর্যস্ত ট্রেস করতে পারলেন না। হায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। হায় দেশের আইন আদালত।
আমার মনে আরেকটি প্রশ্ন বার বার উঁকি দিচ্ছে, যার উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তা হলো- যারা আফসানার লাশ হাসপাতালে নিয়ে আসলেন। তারা কারা? যদি তারা বন্ধু হয়ে থাকেন তাহলে তো আফসানাকে সহায়তা করার কথা। কিন্তু তারা কি সেটা করেছেন? আফসানার লাশের যে ছবিটি বিভিন্ন অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে, তাতে তার গলায় একটা কালো দাগ রয়েছে। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। হ্যাঁ আমি মানলাম তিনি আত্মহত্যা করেছেন। গলায় যেহেতু দাগ রয়েছে তাহলে, হয়তো তিনি ফাঁসিতে ঝুলেছিলেন নিজে নিজেই। তাহলে আত্মহত্যার পর তার লাশটা রশি থেকে কে নামাল? কেন নামাল? আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া এ কাজ কি আর কেউ করতে পারে। এই প্রমাণটাই কি যথেষ্ট নয় যে তাকে কেউ না কেউ হত্যা করেছেন। ঘাতক হয়তো তার ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধুরূপী পিশাচ। হয়তো তারাই ঘাতক যারা আফসানার লাশ হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। আর আফসানা যদি আত্মহত্যাই করে থাকেন তাহলে তার কথিত বন্ধুরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে লাশ রেখে পালিয়ে গেল কেন? এ কেমন বন্ধু যে আরেক বন্ধুকে মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়ে গেল। তাহলে তারাই ঘাতক হতে পারে তা কি আমরা ভাবতে পারি না। এ ছাড়া আফসানার শরীরে বিষক্রিয়া হয়েছিল কি-না বা তিনি বিষাক্ত কিছু খেয়েছিলেন কি-না, সেটাও তো বলছে না ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন।
আরেকটি প্রশ্ন মনে মনে ভাবুন তো, আফসানা একজন মন্ত্রী-সাবেক মন্ত্রী কিংবা কোনো শিল্পপতি পরিবারের মেয়ে। কিন্তু এভাবে রহস্যজনক বা অরহস্যজনকভাবে তার অপমৃত্যু হলো। তখন আমার পুলিশ বন্ধুরা কি বসে থাকতেন। অবশ্য আফসানার বেলায় যে তারা বসে আছেন এ কথা আমি বলব না। কেননা পুলিশ তো তাদেরকে খুঁজছে, যারা আফসানাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না। এ কথা হয়তো বলাই যায়, খুনিরা অবশ্যই ধরা পড়তেন, যদি আফসানা কোনো প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে হতেন। আর আফসানা আত্মহত্যা করেননি সেটাও হয়তো প্রতিষ্ঠিত হতো। দুর্ভাগ্য তার পরিবার প্রভাবশালী নয়।
আরেকটি কথা না বললেই নয়, তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রথম তিন দিন তেমন কোনো মিডিয়ায় কাভারেজ পায়নি। তারপর অবশ্য দেশের সব পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন ফলাওভাবে তনু হত্যার ঘটনা তুলে ধরে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তনু ইস্যু পত্রিকার প্রথম পাতা থেকে শেষে পাতা এবং পরবর্তীতে ভেতরের পাতায় চলে গেছে। আফসানার ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির লক্ষণ আমার চোখে পড়েছে। প্রথম দুদিন তিনি ছিলেন অজ্ঞাত। পরে কোনো কোনো পত্রিকা সিঙ্গেল কলাম আর বড় ছবি দিয়ে কাভারেজ দিয়েছে। মাত্র এক বা দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে আফসানার খবর পত্রিকার পাতায় নেই বললেই চলে। শুধু তাই নয়, আইন শৃঙ্খলাবাহিনী আফসানার কোনো বন্ধুকেও এখনও খুঁজে পায়নি। গ্রেফতার তো অনেক পরের বিষয়, এখন পর্যন্ত কাউকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে বলে মনে হয় না।
>>>প্রিয়.কম।মানিক মুনতাসির: সাংবাদিক।

No comments:

Post a Comment