![]() |
| দেবপ্রিয় বিশ্বাস |
২০১৫ সালের আগস্ট মাসের কথা। সে সময়
পরিবারের সঙ্গে আমি ছিলাম নিউইয়র্কে, পরিচিত এক স্বজনের বাসায়।
যুক্তরাষ্ট্রে এটাই আমার প্রথম যাওয়া। নিউইয়র্কে এক সপ্তাহ কাটিয়ে দিয়েছি,
অথচ প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে আমার ক্লাস শুরু হতে তখনো এক সপ্তাহ বাকি।
এর আগে প্রিন্সটনে কখনো যাওয়া হয়নি, শুধু ইন্টারনেটে ছবি দেখেছি আর
বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগান শুনেছি। নিজের ক্যাম্পাসে পা রাখতে আমার আর তর
সইছিল না। বাবাকে বলে শেষ পর্যন্ত রাজি করালাম। প্রায় আড়াই ঘণ্টার ট্রেন
যাত্রা শেষে অবশেষে পৌঁছালাম প্রিন্সটনের ক্যাম্পাসে। সঙ্গে বাবা আর আমার
ছোট ভাই। নিউ জার্সির প্রিন্সটন শহরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। ট্রেন
এসে ক্যাম্পাসের কাছেই থামে। প্রিন্সটনের বুকে পা ফেলতেই একটা শান্তিঘেরা
পরিবেশে হারিয়ে গেলাম। নিউইয়র্কের মতো ঘিঞ্জি শহর না, এখানে অনেক খোলামেলা
জায়গা। চারপাশটা গাছ-গাছালি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।
যত হাঁটছি, তত
একেকটা দুর্গের মতো চমৎকার ভবন দেখছি। বিশাল ক্যাম্পাসে উদ্দেশ্যহীনভাবে
হাঁটতে হাঁটতে আমরা ন্যাসো স্ট্রিটে পৌঁছালাম, যেখানে আছে প্রিন্সটন
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রবেশপথ ‘ফিটয্র্যান্ডলফ গেট’। গেটের ওপারে ন্যাসো
হল, প্রিন্সটনের সবচেয়ে পুরোনো ভবন। আগে কখনো না এলেও ইন্টারনেটে
পড়াশোনা করে প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আগেই অনেকখানি জেনে নিয়েছিলাম।
তাই আমি এটাও জানতাম যে ফিটয্র্যান্ডলফ গেটকে জড়িয়ে একটা উপকথা আছে।
কোনো ছাত্র যদি স্নাতক হওয়ার আগে এই গেট ব্যবহার করে, তাহলে তার স্নাতক
ডিগ্রি পেতে বিলম্ব হবে। এই ভয়ে আমি আর গেটের ওপারে পা ফেলার সাহস
পাচ্ছিলাম না। ওদিকে আমার বাবা আর ভাই দুজন লাফাতে লাফাতে গেট পার হয়ে গেছে
ন্যাসো হল কাছে থেকে দেখতে। আর আমি গেটের এপারে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কী
করব বুঝে পাচ্ছি না। উপকথা হোক আর যা-ই হোক, গেট পার হওয়ার সাহস হচ্ছিল
না। পাছে যদি স্নাতক ডিগ্রিটাই হাত থেকে ফসকে যায়! কিন্তু ক্যাম্পাস না
দেখে চলে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ইতিমধ্যে আমার ছোট ভাই আমাকে নিয়ে
হাসাহাসি করছিল, আর আমি ক্যাম্পাসে ঢোকার বিকল্প উপায় ভাবছিলাম।
প্রায়
৫-১০ মিনিট ওখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকার পর বাবা খেয়াল করলেন যে ঠিক ২০
কদম দূরেই আরেকটা ছোট গেট আছে ক্যাম্পাসে ঢোকার জন্য। আমি স্বস্তির শ্বাস
ফেলে সেই ছোট্ট গেট দিয়ে ঢুকে শেষ পর্যন্ত ন্যাসো হলের কাছে গেলাম। এমন
চমৎকার অনুভূতি এর আগে খুব কম পেয়েছি। আমার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়কে যে
প্রথম দেখাতেই এতটা ভালোবেসে ফেলব, আগে ভাবিনি। ন্যাসো হলের সামনে আমরা
প্রাণভরে ছবি তুললাম, বিশ্রাম নিলাম। তারপর ক্যাম্পাসের অন্যান্য জায়গা
ঘুরে বেড়ালাম। গ্রীষ্মের ছুটি চলছিল বলে ক্যাম্পাসে তখন মানুষ কম। কিন্তু
দারুণ স্থাপত্য আর চমৎকার ভাস্কর্যগুলো তো ছুটি নেয়নি! বিশ্ববিদ্যালয়ের
পরিবেশ দেখেই মন জুড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে আমাদের কলেজের ডিনের সঙ্গেও দেখা
হয়ে গেল। তিনি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে প্রিন্সটনে স্বাগত জানালেন। যতক্ষণ না
হাঁটতে হাঁটতে আমাদের পা ব্যথা হয়ে গেল আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, ততক্ষণ আমরা
শুধু প্রিন্সটনে ঘুরলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম দিনটা একটু অদ্ভুত।
দিনটা আমি কখনো ভুলব না। এই জায়গাটা যে আগামী চার বছরের জন্য আমার নিবাস
হবে, সেদিন ভাবতেই ভালো লাগছিল। সেই ভালোবাসা এখনো ম্লান হয়নি।
দেবপ্রিয় বিশ্বাস
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি
দেবপ্রিয় বিশ্বাস
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি

No comments:
Post a Comment