Thursday, September 8, 2016

ইরানের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট রুহানি না আহমাদিনেজাদ?

মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ ইরানে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৭ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হতে পারবেন কি না তা নিয়ে ইতোমধ্যে জল্পনাকল্পনা ও বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। ইরানের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এখনো নয় মাস বাকি। তারপরও বিশ্লেষক এবং প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সমর্থকেরা তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হতে পারবেন কি না তা নিয়ে চিন্তাভাবনা ও বিচার-বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। গত বছরের পরমাণুচুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে অবরোধ প্রত্যাহারের ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কট কেটে যাওয়ার আশা করা হলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় জনগণের মধ্যে ব্যাপকতর হতাশা ছড়িয়ে পড়ে রুহানির জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় এবং পশ্চিমাবিরোধী রক্ষণশীল সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা জোরদার হয়। পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিপুল বেতন দেয়া-সংক্রান্ত একটি কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট আরো বেকায়দায় পড়ে যান। পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের আগে রুহানি বলেছিলেন, ‘পরমাণু ইস্যুটি সমাধান করে আমরা অন্যান্য সব সঙ্কটের সমাধান করতে পারব।’ তিনি জনগণের মাঝে অনেক আশাবাদ জাগিয়ে তুলেছিলেন। এরিয়া বার্তা সংস্থার পরিচালক আমির মোহিব্বিয়ান এ কথা বলেন। তিনি নিজেকে একজন বাস্তববাদী মৌলবাদী হিসেবে বর্ণনা করেন। মোহিব্বান মিডলইস্টআইকে বলেন, ‘তার দ্বিতীয় ভুল হলো এ চুক্তি হলো একটি উইন উইন খেলা। জনগণ এখন বলছে, আমাদের পারমাণবিক চুল্লিগুলো বন্ধ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জয়লাভ করেছে। তারা জানতে চায়- চুক্তির মাধ্যমে ইরান কি পেল?
তিনি বলেন, হতে পারে রুহানি হবেন- প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি কেবল এক মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। তার সব পূর্বসূরি আট বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরমাণু চুক্তির ব্যাপারে বেশির ভাগ ইরানি যখন শর্ত পূরণ না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের ইরানের সাথে ব্যবসা পুনরায় শুরু করার ব্যাপারে ধীরগতিতে চলার জন্য চাপ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছে- তখনই রুহানি এবং তার সমর্থকেরা চুক্তি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় এমন বিষয়গুলো থেকে দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের হুমকি দূর করেছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে ইরানভীতি হ্রাস করেছেন। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্ল্ড স্টাডিজ ফ্যাকাল্টির প্রফেসর ফোরাদ ইজাদি বলেন, চুক্তির ফলাফল যদি এ রকমই থাকে তাহলে রুহানিকে পুনরায় নির্বাচিত হতে সমস্যায় পড়তে হবে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি ৫১ শতাংশেরও কম ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছিলেন। ওই নির্বাচনে তিনি ৫০ শতাংশের চেয়ে সামান্য কিছু ভোট বেশি পেয়েছিলেন।’ রুহানির সমর্থকদের যুক্তি হচ্ছে, পরমাণুচুক্তির পর থেকে মাত্র কয়েক মাসে ইরানের অর্থনৈতিক দক্ষতাকে বিচার করা উচিত হবে না। কিন্তু এটা ঠিক, আহমাদিনেজাদের পর তিন বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন রুহানি। উদারপন্থী অর্থনীতিবিদ সাঈদ লিলাজ বলেন, রুহানি ক্ষমতায় আসার সময় মুদ্রাস্ফীতির হার ৪০ শতাংশের বেশি ছিল। জিডিপি এখন পুনরায় ইতিবাচক পর্যায়ে এসেছে এবং শিল্প খাত কাজ করছে। আমরা মুদ্রাস্ফীতি কমানোর জন্য অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং এখন মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশেরও কম। তিনি বলেন, ১৯৯০ সাল থেকে প্রথমবারের মতো মুদ্রাস্ফীতি ডবল ডিজিটে যায়নি।
তবে তিনি স্বীকার করেন, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে আরো অনেক দূর যেতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তেহরানের দক্ষিণাঞ্চল ও কাস্পিয়ান সাগরের নিকটস্থ ছোট্ট শহর আমল পরিদর্শনকারী একজন সাংবাদিক জানান, দোকানদার ও ক্রেতাদের কাছ থেকে খাদ্য ও অন্যান্য জিনিস কেনার জন্য তাদের হাতে খুবই কম অর্থ আছে বলে জানতে পারেন। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অর্থাভাবে কিনতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন। তেহরানের উপকণ্ঠের শহর-ই-রে’র একটি কাপড়ের দোকানের ২৯ বছর বয়সী সেলসম্যান মোহাম্মদ বলেন, প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের সময় যখন মুদ্রাস্ফীতি ছিল, তখন অন্তত বাজার স্থবির ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমি আহমাদিনেজাদকে দুইবার ভোট দিয়েছি। ২০১৩ সালে রুহানিকে ভোট দিয়েছি। আহমাদিনেজাদ প্রার্থী হলে আগামীতে তাকে ভোট দেবো।’ কাস্পিয়ান উপসাগরের সাজাম দারান প্রদেশের বাণিজ্যিক কেন্দ্র আমলে আতিক বলেন, তিনি শিশুদের কাপড় বিক্রির দোকানের নারী সেলসম্যান হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি দেখছেন আমাদের কোনো ক্রেতা নেই।’ তিনি বলেন, সন্ধ্যা ৬টার পর অবস্থা একটু ভালো হতে পারে। কিন্তু সত্যিকার ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের হাতে কেনাকাটার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই। আমি আশা করছিলাম, পরমাণুচুক্তি স্বাক্ষরের পর অবস্থার উন্নতি হবে। আহমাদিনেজাদের সময় থেকে এখন খুব ভালো সময় নয়। তারপরও আমরা সে সময় থেকে বেশি বিক্রি করছি। চাহিদার অভাবে কারখানাগুলোর পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেক্সটাইল প্লান্টের এক মালিক বলেন, তাদের সামর্থ্যরে অর্ধেকেরও কম পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। দেশের অব্যাহত সঙ্কটের একটি অংশ বেকারত্ব।
 বিপুলসংখ্যক যুবক বেকারত্বে ভুগছে। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি জনসংখ্যার বয়স হচ্ছে ৩০ বছরের নিচে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি মন্ত্রী মানসুর মোজামির মতে, ১১ শতাংশ হচ্ছে কাজের বাইরে। তরুণ গ্র্যাজুয়েট ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বেড়ে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রুহানিকে বিব্রত করতে চান। উদারপন্থীরা স্বীকার করেছেন, আহমাদিনেজাদের আট বছরের শাসনকালের শেষ দুই বছর অর্থনীতি অতি মন্দা অবস্থায় ছিল। তার শাসনামলের প্রথম ছয় বছরের কথা স্মরণ করলে বিশেষত তেহরানের বাইরের প্রদেশগুলোতে এ অবস্থার কথা স্মরণ হয়। তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করতেন এবং স্থানীয় লোকদের কাছে তাদের কী প্রয়োজন তা জানতে চাইতেন। তিনি নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, ক্রীড়া ও খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা থেকে সড়ক, ক্লিনিক, খেলার মাঠ ও পাবলিক পার্ক নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। জনগণ দেখতে পেয়েছে বাস্তবে তাদের উপকার হচ্ছে। তার আমলে যে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ছিল তা অনেকে ভুলে গেছে। আহমাদিনেজাদ তার সময়ের মুদ্রাস্ফীতির জন্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে দোষারোপ করেন। এই বসন্তে ইরানের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ইনস্যুরেন্স কোম্পানি সেন্ট্রাল ইন্সুরেন্স অব ইরানের পদস্থ নির্বাহীদের বেতনসংক্রান্ত কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর রুহানি বিব্রত বোধ করেন। কর্মকর্তারা জানান, তারা এক মাসে ২৮ হাজার ৬০০ ডলার বেতন নেন। এটা হচ্ছে ন্যূনতম বেতনের শতভাগ বেশি। ইরানি আইনানুযায়ী কোন নির্বাহী ন্যূনতম বেতনের ৭০ শতাংশের বেশি বেতন নিতে পারেন না। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সভাপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। গত কয়েক সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যান্য কোম্পানি ও ব্যাংকেও নির্বাহীদের অতিরিক্ত বেতন দেয়ার বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ে।
এ সংবাদ রুহানি-বিরোধী সংবাদপত্রগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট কয়েকজন পদস্থ নির্বাহীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেন এবং তাদের বেতন ফেরত দেয়ার আদেশ জারি করেন। এ ঘটনা রুহানির কত বড় ক্ষতি করেছে তা স্পষ্ট নয়। এসব ঘটনার মাধ্যমে অন্তত এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, মিডিয়া এবং সরকারে রুহানিকে বিব্রত করার মতো প্রভাবশালী কণ্ঠ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানি সাংবাদিক অভিযোগ করেন, রুহানির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নেতিবাচক স্টোরিকে সব সময় হাইলাইট করে সরকারের ভাবমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে। অপর দিকে, আহমাদিনেজাদ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসার কথা ভাবছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি পুনরায় দেশ ভ্রমণে ব্যস্ত আছেন এবং আঞ্চলিক সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন। এসব সভায় তার বক্তব্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তা না হওয়ায় এবং পরবর্তী বছরের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু না হওয়ায় তাকে টেলিভিশনে দেখা যাচ্ছে না। আহমাদিনেজাদ তেহরানে জুমার নামাজে যখন অংশ নেন, তখন তাকে ধর্মীয় নেতা এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির পাশে দেখা যায়। আহমাদিনেজাদ আগামীতে রুহানির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠবেন কি না তা কেউ জানে না। অবশ্য নির্বাচন এখনো অনেক দূরে। ইরানের জটিল নির্বাচনী ব্যবস্থায় সব প্রার্থীকে পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্সি এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। তাই আগামী নির্বাচনে কারা প্রার্থী হবেন তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

No comments:

Post a Comment